kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিএনপির বৃহত্তর ঐক্যের তোড়জোড় বন্ধ

এনাম আবেদীন   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বিএনপির বৃহত্তর ঐক্যের তোড়জোড় বন্ধ

চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রস্তাবিত বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য নিয়ে কৌশলগত কারণে বিএনপি আপাতত আর তোড়জোড় করবে না। এ-সংক্রান্ত সব তৎপরতা বন্ধ রেখে দলটি সুবিধাজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকবে।

দলটির নেতারা বলছেন, ‘ঐক্যের জন্য বর্তমান সময় সুবিধাজনক নয়’ বলে প্রগতিশীল দলগুলোর পক্ষ থেকে তাঁদের ‘বিশেষ বার্তা’ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, দৃশ্যমান হয়ে এখন সরকারের বিরুদ্ধে জোট বাঁধার সময় আসেনি। তবে বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হলে আপনা-আপনি জোট হয়ে যাবে বলে বিএনপিকে জানিয়েছেন দলগুলোর নেতারা।

সূত্রমতে, অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনার সূত্র ধরে প্রগতিশীল দলগুলোর পক্ষ থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনকে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে একমঞ্চে উঠেও কোনো লাভ হবে না। বরং এতে দলগুলোর সরকারের রোষানলে পড়ার আশঙ্কা আছে।

সূত্রমতে, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সঙ্গে বৈঠকের পর বিএনপি আর এগোয়নি। এরপর আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বসার কথা ছিল। এ প্রশ্নে গত আগস্টে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আবদুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে রবের বৈঠকও হয়। কিন্তু দলীয় ফোরামে আলোচনার কথা বলে তখন রব কিছুটা সময় নেন। তবে ওই উদ্যোগ থেমে গেছে।

সূত্রের দাবি, জেএসডির পক্ষ থেকে আরো ‘সময় নিয়ে’ বৃহত্তর জোট গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বিএনপিকে। বলা হয়েছে, চায়ের আমন্ত্রণ রক্ষা করে কেবল বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে বৈঠকে বসলেই জোট হবে না। এর জন্য অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি লাগবে। ঐক্যের প্রশ্নে  বৈঠকের ব্যাপারে খালেদা জিয়ার আগ্রহের কথা গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন এবং বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকেও জানানো হয়। তবে কামাল হোসেনের মনোভাব এখনো ইতিবাচক নয় বলে বিএনপি জেনেছে। কারণ তিনি তৃতীয় রাজনৈতিক ধারা নিয়ে তৎপর।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও জেএসডি ছাড়াও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারা এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে বৃহত্তর জোট গঠন করতে চায় বিএনপি।

খালেদা জিয়ার নির্দেশে প্রগতিশীল বলে পরিচিত দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে গত আগস্ট মাসে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। এর আগে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এ প্রশ্নে ‘গ্রাউন্ড ওয়ার্ক’ করে পরিবেশ অনেকটা এগিয়ে দেন গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। আর এরই সূত্র ধরে গত ৪ আগস্ট বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী চায়ের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় পরের বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল জেএসডির সঙ্গে।

জানতে চাইলে আ স ম রব কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং তিনি চায়ের আমন্ত্রণ দিলে সেখানে না যাওয়ার কারণ নেই। কিন্তু ওই দাওয়াতের রাজনৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন আছে। সুতরাং সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে যাতে কার্যকর কিছু হয় এমন পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকা ভালো।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপি জাতীয় ঐক্যের কথা বলছে। আমরাও তা বলছি। এ ছাড়া আমি বহুদিন ধরে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে তৃতীয় একটি ধারা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। এ বাস্তবতায় জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে উঠতে পারে। তবে এ জন্য কিছুটা সময় লাগবে। ’     

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপির নিজেরই কিছু ঠিক নেই। তারা কোনো কিছুই গুছিয়ে করতে পারে না। আমি মনে করেছি, বৃহত্তর ঐক্য করলে তাতে গণতন্ত্র ও দেশের জন্য ভালো হবে। কিন্তু এ কাজ বিএনপি নিজে করতে না পারলে অন্যের আর দোষ কী?’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কাদের সিদ্দিকীর পর আ স ম রবের সঙ্গে তাদের বৈঠক করা উচিত ছিল। কিন্তু তারা তা পারেনি। আমাকে বলুক, এক দিনের মধ্যে বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেব। ’

গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘খালেদা জিয়া চায়ের আমন্ত্রণ দেবেন কি না এ ব্যাপারে বিএনপির পক্ষ থেকে গণফোরামের কোনো নেতার সঙ্গে আলাপ করা হয়নি। ওই ধরনের প্রস্তাব এলে তখন আমরা দেখব। ’ তিনি বলেন, “আমরা তৃতীয় একটি ধারার লক্ষ্যে ঐকমত্যে পৌঁছাতে সব রাজনৈতিক দলের কাছে ‘আপিল’ করেছি। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়। ”

ঐক্যের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ঐক্য প্রশ্নে কাজ এখনো চলছে। তবে নানা কারণে ধারাবাহিক বৈঠক অনুষ্ঠানটি বিলম্বিত হচ্ছে। ঈদের পরে আবার নতুন উদ্যোমে এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে বিকল্প ধারার একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, খালেদা জিয়া চায়ের আমন্ত্রণ জানালে দলটি তাতে সাড়া দেবে। তবে চূড়ান্ত ঐক্যে বা সমঝোতার প্রশ্নে এ দলটির কিছু শর্ত রয়েছে।

দলটির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, বিএনপির প্রতি তাঁদের আস্থা কম হলেও কৌশলগত কারণে তাঁরা আওয়ামী লীগের পক্ষে যেতে পারবেন না। শীর্ষপর্যায়ের এক নেতা উদাহরণ দিয়ে বলেন, সংসদ ভবন এলাকা থেকে জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগকে কিছুতেই বিকল্প ধারা সমর্থন করতে পারে না। কারণ এ দলটির বর্তমান সভাপতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ছিলেন। ফলে সবদিক বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত সরকারের বিরোধী শক্তির সঙ্গেই বিকল্প ধারাকে থাকতে হবে।

জানতে চাইলে দলটির সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি বৃহত্তর বা জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে প্রকৃতপক্ষে কী করতে চায়, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। তবে দলটির চেয়ারপারসন আমন্ত্রণ জানালে সেখানে না যাওয়ার কিছু নেই। কারণ এর আগেও একাধিকবার তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ’ তিনি বলেন, বৃহত্তর ঐক্য করতে হলে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকতে হবে।


মন্তব্য