kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাবুল আক্তারের গন্তব্য কোথায়?

ওমর ফারুক, ঢাকা ও এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বাবুল আক্তারের গন্তব্য কোথায়?

দুর্বৃত্তের গুলি আর ছুরিকাঘাতে মারা গেছেন স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। সেই শোক কাটার আগেই চাকরিচ্যুত হলেন পুলিশের এসপি বাবুল আক্তার।

পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করাকে চাকরিচ্যুতির কারণ বলা হলেও বাবুল আক্তার বলছেন, তিনি স্বেচ্ছায় এটি করেননি। ফলে স্ত্রী হত্যায় জড়িয়ে যাচ্ছেন বাবুল—এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে পুলিশ। কিন্তু তাঁকে গ্রেপ্তার না করে চাকরিচ্যুতিতে জন্ম নিয়েছে নানা প্রশ্ন আর সন্দেহ।

বাবুলকে কি গ্রেপ্তার করা হবে? বাবুল কি চাপের মুখে বা নিজেকে রক্ষায় বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন? এ ধরনের প্রশ্নের জবাব মিলছে না কারো কাছেই। মিতু হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কমিশনার ইকবাল বাহার কিংবা মিতু হত্যা মামলার বাদী সদ্য সাবেক হওয়া পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার—তিন পক্ষই মুখে কুলুপ এঁটেছে। তবে বাবুলের শ্বশুর ও শাশুড়ি দাবি করেছেন বাবুলকে ফাঁসানো হচ্ছে। জোর করে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এখন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত বা চাকরি ফিরে পেতে আইনের আশ্রয় নিলেই তাঁকে কোনো আসামির মুখ দিয়ে ‘হুকুমের আসামি’ বানানো হবে। তাঁরা এখন বাবুলকে গ্রেপ্তারের আশঙ্কা করছেন।

বাংলাদেশ পুলিশের একসময়ের ‘আইকন’ খ্যাত বাবুল আক্তার এখন পুলিশ নন। তাঁর চাকরির সময়ে সরকারের কাছে পাওয়া দেনা-পাওনার হিসাব শেষ পর্যায়ে। চট্টগ্রাম নগর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ঢাকার পুলিশ সদর দপ্তরে সেই হিসাবও পাঠানো হয়েছে কয়েক সপ্তাহ আগেই।

চাকরি আর স্ত্রী-সংসারের পাট আপাতত চুকেছে বাবুল আক্তারের। তবে নগরের ওআর নিজাম রোডের যে ফ্ল্যাটে মিতুর সংসার ছিল, সেই ফ্ল্যাটটি এখনো আগের মতোই আছে। যেভাবে ৫ জুন সকালে মাহিরকে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার আগে রেখেছিলেন মিতু। মাঝখানে ফ্ল্যাটের জিনিসপত্রে ধুলোর আস্তরণ পড়েছে শুধু। বাবুল চট্টগ্রামে আসেননি। মিতুর স্মৃতিময় ফ্ল্যাটে স্বামী বাবুলের পদচিহ্নও পড়েনি। একইভাবে সন্তানদের পদচিহ্নও পড়েনি ওই ফ্ল্যাটে।

বাবুলের গন্তব্য কোথায়—এমন প্রশ্নের জবাব জানতে ফোন করা হয়েছিল বাবুল আক্তারকে। গতকাল বুধবার বিকেলে তাঁকে ফোন করা হলেও তিনি অন্য প্রান্ত থেকে সাড়া দেননি। এ কারণে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। বাবুলকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে কারাগারই তাঁর গন্তব্য হবে কি না, জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘বাবুল আক্তার মামলার বাদী। তাঁকে গ্রেপ্তারের প্রশ্ন কেন আসছে?’ মিতু হত্যাকাণ্ডে বাবুল আক্তার জড়িত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলার তদন্ত পর্যায়ে এখনো আমি তেমন কিছু পাইনি। ’ বাবুল আক্তার তাঁর স্ত্রী মিতু হত্যায় জড়িত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার গত মঙ্গলবারও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মিতু হত্যায় বাবুল জড়িত, এমন তথ্য এখনো পুলিশ পায়নি।

তাহলে বাবুলের চাকরি গেল কেন? পুলিশ কর্মকর্তাদের সোজা উত্তর, ‘বাবুল আক্তারের সই করা পদত্যাগপত্রের কারণেই চাকরি গেছে। ’ বাবুল নিজেই দাবি করেছেন, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি এবং পদত্যাগপত্র ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি পৃথক একটি আবেদনও করেছিলেন সরকারের কাছে। এমতাবস্থায় পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশের ডিআইজি (মিডিয়া) এ কে এম শহিদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাবুল আক্তারের পদত্যাগপত্র সরকার গ্রহণ করেছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে সরকার গেজেট প্রকাশ করেছে। ’ এর বাইরে অন্য কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি রাজি হননি।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় বাবুল : গত মঙ্গলবার বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ খবর তিনি মিডিয়ার মাধ্যমে ওই দিন বিকেলেই জানতে পারেন। জেনে যাওয়ার পর বাবুল আক্তার মর্মাহত হয়েছেন বলে তাঁর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। তিনি আশা করেছিলেন তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের আবেদনটি গ্রহণ করা হবে। কিন্তু সেটি না হয়ে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় বাবুল আক্তারের শ্বশুরবাড়ি গিয়ে দেখা গেছে সুনসান নীরবতা। কথা বলার জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে পাশের বাড়ির একজনকে পাওয়া যায়। তিনি গিয়ে জানালা দিয়ে বাবুল আক্তারের শাশুড়ি শাহীদা মোশাররফকে ডেকে দেন। দরজা খোলার পর দেখা যায় শাহীদা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। জানতে চাইলে তিনি জানান, বাবুল আক্তার বাসায় নেই। বাবুলের শ্বশুর মোশাররফ হোসেনও বাইরে। শাহীদা জানান, মঙ্গলবার রাতে বাসায় ফিরলেও বাবুল তেমন কোনো কথা বলেননি। গতকাল সকালে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করার জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়ে তখনো ফেরেননি (অবশ্য এ প্রতিবেদক ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর সন্ধ্যায় বাবুল বাসায় ফিরেছেন বলে জানা গেছে)। এক প্রশ্নের জবাবে শাহীদা মোশাররফ জানান, বাবুল পুলিশে চাকরি করতেন। যে বেতন পেতেন তাই দিয়ে সংসার চালাতেন। টাকা জমাতে পারতেন না। এখন তাঁর চাকরিটা চলে গেছে। ভবিষ্যতে তিনি কী করবেন তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছেন। একদিকে দুই সন্তান, অন্যদিকে মিতু হত্যা—এর ওপর চাকরি চলে যাওয়ায় বাবুল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন বলে জানান তিনি।

বাবুল আমার ছেলে : বাবুল আক্তারের শাশুড়ি জানান, ২০০০ সালে মিতুর নানা ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ওই সময় তিনি নাতনি জামাই দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। বাবুলের বাবা পুলিশে চাকরি করতেন, মিতুর বাবাও ছিলেন পুলিশ। এ কারণে আগে থেকেই পরিচয় ছিল দুই পরিবারের। এর পরই বাবুল ও মিতুর আংটি পরানো হয়। তবে বিয়ে হওয়ার আগেই মিতুর নানা মারা যান। বিয়ের সময় বাবুল আক্তার স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। শাহীদা মোশাররফ বলেন, ‘বিয়ের পর থেকেই বাবুকে (বাবুলকে এ নামে ডাকেন তিনি) আমার জামাই নয়, ছেলে হিসেবে জানি। সেও আমাকে শাশুড়ি নয়, মা হিসেবে জানে। বাবুল আর মিতুর মধ্যে যে সুসম্পর্ক দেখেছি সেটা যে কারো হিংসা হওয়ার মতো। সেই বাবুকে আজ যদি কেউ বলে সে মিতুকে হত্যা করেছে, সেটা বিশ্বাস করি না। বাবু মিতুকে কোনোভাবেই হত্যা করতে পারে না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘বাবুল যদি মিতুকে ঢাকায় বসে চট্টগ্রামে হত্যা করতে পারে তাহলে সে তো বিদেশে বসেও করতে পারত। এই হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগেই তো সে চীনে গিয়েছিল। এর আগে সে এক বছর মিশনে ছিল। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দুনিয়ার সবাই বললেও আমি বিশ্বাস করি না আমার বাবু আমার মিতুকে হত্যা করতে পারে। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন আশঙ্কা হয় মুছার মুখ দিয়ে বলানো হবে বাবু মিতুকে হত্যা করেছে। এমন বলিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে বলে আমাদের কাছে মনে হয়। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা কার সঙ্গে লড়ব? আমরা সাধারণ মানুষ। ’

কাঁদতেও পারি না : বাবুল আক্তারের শাশুড়ি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মেয়ে খুন হয়েছে। দুটো নাতি চোখের সামনে তার মাকে খুঁজে বেড়ায়। বাবুলের চাকরি চলে গেল। সারাক্ষণ কাঁদে বাবুল। এসব দেখে কষ্টে বুক ফেটে যায়। নিজে চেষ্টা করি না কাঁদতে। কিন্তু কান্না ধরে রাখা সম্ভব হয় না। যখন নীরবে কাঁদতে থাকি সেই কান্না বাবুলের সন্তানদের চোখে পড়লে তারাও কান্না শুরু করে। ’ তিনি জানান, মঙ্গলবার রাতে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বাবুলকে চাকরি থেকে অব্যাহতির সংবাদ ব্রেকিং নিউজ হিসেবে দেখাচ্ছিল। বাবুলের ছেলে ব্রেকিং নিউজ পড়তে পারে। সে ওই নিউজ পড়ে অনেক কান্নাকাটি করেছে। তিনি বলেন, ‘এ শিশুর প্রশ্নের কী জবাব দেব আমরা? কী জবাব আমাদের কাছে আছে?’

পরবর্তী পদক্ষেপ কী : গত মঙ্গলবার বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাবুল আক্তারকে অব্যাহতি দিয়ে আদেশ জারি করা হয়। সেই আদেশের কপি সেদিন বিকেলেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। বাবুল আক্তারকে অব্যাহতি দেওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—এ নিয়ে মঙ্গলবার বিকেল থেকেই আলোচনা শুরু হয়। গতকালও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা গেছে তাঁকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে গতকাল কেউ মুখ খুলতে চাননি।

বাবুলকে বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে : বাবুল আক্তারের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের একজন বলেন, ‘বাবুল স্যারকে হয়তো বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। তিনি বিদেশে চলে যাওয়ার পর মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হতে পারে। আমরা এমনটা আঁচ করতে পারছি। ’ সেই অর্থে বাবুল আক্তারের পরবর্তী গন্তব্য বিদেশ। বাবুল আক্তার আসলেই বিদেশ চলে যাচ্ছেন কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরও বাবুল আক্তারের কাছে পাওয়া যায়নি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে।


মন্তব্য