kalerkantho


নির্বাচনের আগে ঐক্য চায় আ. লীগ

সম্মেলনের আগেই দলে ফিরছেন বহিষ্কৃতরা

তৈমুর ফারুক তুষার   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সম্মেলনের আগেই দলে ফিরছেন বহিষ্কৃতরা

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী নেতাকর্মীদের প্রতি অবশেষে নমনীয় হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বিগত সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বহিষ্কৃতদের দলে ফেরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলকে ঐক্যবদ্ধ করতেই এমন সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে উপলক্ষ হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনকে। বহিষ্কৃত যেসব নেতাকর্মী কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে আবেদন করবেন তাদের বহিষ্কারাদেশ জাতীয় সম্মেলনের আগেই প্রত্যাহার করা হবে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলো কালের কণ্ঠকে এমনটা জানিয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের এক যৌথ সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বহিষ্কৃতদের দলে ফেরানোর সিদ্ধান্ত দেন। তিনি বহিষ্কৃত নেতাদের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা মূল্যায়ন করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার পক্ষে মত দেন।

যৌথ সভায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তাঁদের মধ্যে অনেক সিনিয়র নেতা আছেন। অনেকেই দলকে দীর্ঘদিন সার্ভিস দিয়েছেন। সম্মেলন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় উৎসব। তাঁরা এখানে অংশ নেওয়ার অধিকার রাখেন। অনেকের আবেগ এত বেশি যে সম্মেলনে অংশ নিতে না পারলে আত্মহত্যা করবেন। ফলে তাঁদের শাস্তি প্রত্যাহার করতে হবে। ’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় নেতারা নিজের দল ভারী করতে গিয়ে বিভিন্ন দল থেকে লোক যোগদান করাচ্ছে। এরা দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থেকে অভ্যন্তরীণ হানাহানি বাড়াচ্ছে। তাদের হাতে আমার পুরনো নেতাকর্মীরা জীবন দেবে, এটা হতে পারে না। এর চেয়ে আমাদের পুরনো যেসব নেতাকর্মী ছোটখাটো ভুলত্রুটি করেছে, তাদের ক্ষমা করে দিয়ে দলে ফেরানোই ভালো। ’

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সভাপতির মন অনেক বিশাল। তিনি দলের নেতাদের ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে আবার রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছেন, যেন তারা দলে ভূমিকা রাখতে পারে। ’

কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘ঠিক কোন পর্যায়ে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হবে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। সভায় আলোচনাটা উঠেছিল ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির বহিষ্কৃতদের প্রসঙ্গে। দলীয় সভাপতি মহানগর প্রসঙ্গেই বলেছেন, আমাদের বহু পুরনো নেতা রয়েছেন। এমনও নেতা আছেন, কাউন্সিলে উপস্থিত হতে না পারলে আত্মহত্যা করবেন। ফলে কাউন্সিলের আগেই তাঁদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করতে হবে। ’

আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মুহম্মদ ফারুক খান বলেন, ‘যাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে তাঁদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছেন। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি নমনীয় হয়েছেন। যাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে তাঁরা যদি এখন তা প্রত্যাহারের আবেদন করেন তাহলে দল তা বিবেচনা করবে। ’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানের একটি প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ খুনখারাবি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বহিষ্কৃতদের দলে ফেরানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সিদ্ধান্তের পেছনে আওয়ামী লীগের ২০তম কাউন্সিলসহ সার্বিক আরো কিছু বিষয় যুক্ত আছে। ’

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, বিগত স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত অনেক নেতারই আওয়ামী লীগের জন্য বহু ত্যাগ আছে। অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা বহু প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে আসছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলে দলকে বিজয়ী করতে তাঁদের সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজন হবে। এ জন্য তাঁদের দলে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন দূরদর্শী নেতা শেখ হাসিনা। তিনি এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনকে উপলক্ষ হিসেবে নিয়েছেন।

সূত্র মতে, বর্তমান সরকারের মেয়াদ আছে আর দুই বছর চার মাস। এই নির্বাচন বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হবে না। ফলে সেখানে জয়লাভ করতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্য জরুরি। এমনিতেই টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কারণে দলের অভ্যন্তরে নানা বিষয় নিয়ে অনেকের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তার ওপর প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কারণে তৃণমূল পর্যায়েও দলের মধ্যে তীব্র বিভাজন তৈরি হয়েছে। এটা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এই বিভাজন কমাতে এখনই উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ ছিল আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। মঙ্গলবার বহিষ্কৃতদের দলে ফেরানোর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সেই তাগিদের প্রতিফলন ঘটেছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী মনোনয়ন দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে পারেনি দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়। দলের অনেকেই নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নির্বাচন করে জয়লাভ করেছেন। আবার নৌকা প্রতীক পেয়েও অনেকের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। ফলে সব বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে দলের ক্ষতি হবে, এটাই বাস্তবতা। ’


মন্তব্য