kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


১০ টাকা দরে চাল বিতরণ উদ্বোধন

দুস্থ শব্দ চিরতরে বিদায় করতে চাই : প্রধানমন্ত্রী

আব্দুল খালেক ফারুক, কুড়িগ্রাম   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দুস্থ শব্দ চিরতরে বিদায় করতে চাই : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা দুস্থদের সাহায্য দিচ্ছি। কিন্তু দুস্থ মানুষ, দুস্থ থাকুন—সেটা আমরা আর চাই না।

সেটা থেকে মুক্তি মিলছে এখন। আমরা চাই দুস্থ শব্দটাকেই চিরতরে বিদেয় করে দিতে। ’ তিনি বলেন, ‘একজন মানুষও যেন না খেয়ে না থাকে, সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। ’ ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’র আওতায় ১০ টাকা দরে প্রতি কেজি চাল বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে গতকাল বুধবার কুড়িগ্রামে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার থানাহাট এইউ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে হতদরিদ্র মানুষের মাঝে ১০ টাকা দরে ৩০ কেজি করে চাল ও কার্ড বিতরণের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে এই ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’ উদ্বোধন করেন। কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।

খাদ্য মন্ত্রণালয় ও কুড়িগ্রাম জেলা  প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, আওয়ামী লীগ নেতা খালেদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত হোসেন সরকার বীরবিক্রম।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ। তিনি দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করেছি বলেই আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। রংপুর অঞ্চলসহ দেশে আর কোনো দিন দুর্ভিক্ষ হবে না। মঙ্গা থাকবে না। একজন মানুষও যেন না খেয়ে না থাকে, সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। তাই হতদরিদ্রদের ১০ টাকা কেজি দরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে ৩০ কেজি করে চাল দিচ্ছি। ’

শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর দল জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্যই রাজনীতি করে, নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা রাজনীতি করি দেশের মানুষের জন্য, নিজেদের জন্য নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে জনগণকে দিতে। আর অন্যরা ক্ষমতায় আসে নিতে, নিজেদের আখের গোছাতে। এ সময় সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চিলমারীর স্থানীয় গৃহহীন জনগণকে সরকারি উদ্যোগে ঘরবাড়ি তৈরি করে দিতে জেলা প্রশাসনকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ প্রদান করেন।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘এই চিলমারীতে অনেকবার এসেছি। পায়ে হেঁটে প্রত্যন্ত এলাকায় গেছি। মানুষের দুঃখ-কষ্ট কাছ থেকে দেখেছি। সেই দুঃখ দূর করার জন্য চেষ্টা করে গেছি। চিলমারী-কুড়িগ্রাম মঙ্গাপীড়িত এলাকা বলে অনেক দুর্নাম শুনতে হয়েছে। আমার প্রতিজ্ঞা ছিল রংপুর অঞ্চলকে মঙ্গার অভিশাপ থেকে রক্ষা করা। আল্লাহর রহমতে আমরা তা করতে পেরেছি। কুড়িগ্রামে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ’

প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামায়াত জোটকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের উসকানিদাতা বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের যুবসমাজ আমাদের সম্পদ। তারা যাতে বিপথে না যায়, জঙ্গি ও মাদকাসক্ত না হয় এ জন্য বাবা-মা, শিক্ষক, নির্বাচিত প্রতিনিধি—সবার কাছে আবেদন, আপনাদের সন্তানরা কে কোথায় যায় সে ব্যাপারে নজর রাখুন। তাদের কথা শুনুন। ’

যারা অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসে তারা কখনো প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে ন্যায্য পাওনা আদায় করতে পারে না—এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে বিশাল সমুদ্র এলাকা বাড়িয়েছি। ছিটমহল বিনিময় করেছি। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করেছি। অথচ খালেদা জিয়া ভারতে গিয়ে এসব কথা নাকি বলতে ভুলে গেছেন। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এসে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছি। এখন ছিটমহলবাসীর ঘর আছে কি না, খাদ্য, পোশাক আছে কি না, তার খোঁজ নিয়ে তাদের উন্নত জীবনধারণের ব্যবস্থা নিচ্ছি। ’ তিনি বলেন, ‘চিলমারী বন্দরের পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করা হবে। চিলমারী থেকে পায়রা সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা হবে। রেললাইন আরো উন্নত করে রেল যোগাযোগ চালু করা হবে। ’

প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদ্যাপন করা হবে উল্লেখ করে বলেন, ‘২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ে তুলব। এটাই আমাদের লক্ষ্য। ’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে দিতে। কিছু নিতে নয়। আওয়ামী লীগের হাতকে শক্তিশালী করুন। আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সমবেত হোন।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কুড়িগ্রাম-৩ আসনের এমপি এ কে এম মাঈদুল ইসলাম মুকুল, কুড়িগ্রাম-৪ আসনের এমপি রুহুল আমিন, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি অ্যাডভোকেট সফুরা বেগম, চিলমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুছ সরকার, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. জাফর আলী, চিলমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুছ সরকার প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রী সকাল ১১টায় সভাস্থলে উপস্থিত হন। এর আগে তিনি হেলিকপ্টারযোগে চিলমারী হেলিপ্যাডে অবতরণ করেন। ব্যাপক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্য দিয়ে এক কিলোমিটার দূরে সভাস্থলে আসেন। এ সময় পথে পথে হাজার হাজার মানুষ তাঁকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমায়। হাত নেড়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানায়। ভোর থেকে রৌমারী, রাজিবপুর, উলিপুর, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, ভূরুঙ্গামারী, বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়া, রাজারহাট ও কুড়িগ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে এক নজর দেখতে অপেক্ষা করে। অনুষ্ঠান শেষে দুপুর পৌনে ২টার দিকে তিনি হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।

মন্ত্রীদের বক্তব্য : অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী চুয়াত্তরের চিলমারীর আলোচিত জাল পরা সেই বাসন্তীর কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি ছিল একটি ষড়যন্ত্র। কারণ মানসিক প্রতিবন্ধী বাসন্তীকে জাল পরিয়ে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকারকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী কখনো মিথ্যা বলেন না। এর প্রমাণ হচ্ছে ১০ টাকায় স্বল্পমূল্যের চাল বিতরণ।

সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, রংপুর অঞ্চলের মঙ্গা এখন জাদুঘরে। এ কৃতিত্ব শেখ হাসিনার। আওয়ামী লীগের প্রতিশ্রুতি ছিল ১০ টাকায় চাল খাওয়াবে। তখন খালেদা বলেছিলেন জনগণের সঙ্গে ঠাট্টা। তিনি খাদ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন ১০ টাকার একটি রেশন কার্ড খালেদা জিয়াকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। তাহলে তিনি বুঝবেন, হাসিনা মিথ্যা বলেন না।

সভাপতির বক্তব্যে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. কামরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের নেওয়া সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর অন্যান্য কর্মসূচির সঙ্গে যোগ হলো খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি। ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’—এই স্লোগান সামনে রেখে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কাজ চলছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা এমপি জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বলে বক্তব্য শেষ করেন। এর পরই আবার বলেন, ‘আমি এরশাদের দল জাতীয় পার্টি করি। আমার দলের প্রেসিডেন্ট এরশাদ। এরশাদ দীর্ঘজীবী হোক। ’ এ সময় উপস্থিত সবাই হেসে ওঠে।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি : এই কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্র জনগণ কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে ১০ টাকা নির্ধারিত মূল্যে চাল পাবে। বছরের যেসব সময়ে ক্ষেতখামারে কাজ থাকে না—এমন পাঁচ মাস যথাক্রমে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, মার্চ ও এপ্রিলে সরকারের এই খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চলবে। প্রায় ৫০ লাখ মানুষ এই কর্মসূচির সুবিধাভোগী হবে। হতদরিদ্র ছাড়াও প্রতিবন্ধী, বিধবা এবং বিবাহবিচ্ছেদের শিকার নারীরা এই সুবিধাভোগী হবেন। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চলতি অর্থবছরে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করা হবে।


মন্তব্য