kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

কোরবানির মূল ভরসা দেশি গরু

মাংসে ভয় কম

তৌফিক মারুফ ও মোশতাক আহমদ   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মাংসে ভয় কম

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গরু নিয়ে ঢাকা আসছেন বেপারিরা। ট্রলার থেকে পশু নামানোর দৃশ্যটি বুড়িগঙ্গার পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের। ছবি : লুৎফর রহমান

কোরবানির চাহিদার তুলনায় এবার দেশে বেশি পরিমাণে পশু মজুদ আছে। গত বছর ৯৬ লাখ ৩৫ হাজার পশু কোরবানি করা হয়েছিল।

এবার চাহিদা রয়েছে এক কোটির মতো। তার বিপরীতে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ হাটে তোলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে এক কোটি ১৪ লাখ ৭৫ হাজার পশু। এর সবটাই দেশে উৎপাদিত। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। সেই তথ্যের সূত্র ধরেই আশার কথা শুনিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এবার যেহেতু হাটে দেশি পশুর চালান বেশি থাকবে তাই স্টেরয়েড বা হরমোন দিয়ে কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশু বিশেষ করে গরুর সংখ্যা কম হবে। সে ক্ষেত্রে এসব পশুর মাংসও হবে তুলনামূলক নিরাপদ।  

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্টেরয়েড বা হরমোন প্রয়োগ করলেও শারীরিক গঠন প্রক্রিয়ার কারণেই বিদেশি জাতের গরুর মতো দেশি গরু দ্রুত সময়ের মধ্যে ফুলেফেঁপে উঠতে পারে না বা মোটা হয় না। দেশি গরু উচ্চমাত্রার স্টেরয়েড বা হরমোন সহ্য করতে পারে না। এমনকি তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঝুঁকিও বেশি। তাই ব্যবসায়ীরা লাভের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কায় দেশি গরুকে অবৈধ পন্থায় মোটাতাজা করার চেষ্টা করে না। তাই কোরবানির জন্য দেশি গরুকে বিদেশি জাতের গরুর তুলনায় নিরাপদ বলা যায়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, আসন্ন কোরবানির ঈদে দেশে উৎপাদিত পশু দিয়েই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। এক কোটির ওপরে গরু, মহিষ ও ছাগল, ভেড়া রয়েছে। আর চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অবৈধ ও ক্ষতিকর উপায়ে পশু মোটাতাজাকরণ রোধে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা। এবার গতবারের চেয়ে বেশি টিম হাটবাজার মনিটরিংয়ে থাকবে। তারা হাটে অসুস্থ গরু আলাদা করে নিয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা দেবে।

সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আন্তমন্ত্রণালয় সভায় জানানো হয়, এবার সারা দেশের মাঠপর্যায় থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে ৪৪ লাখ গরু ও মহিষ কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে হৃষ্টপুষ্ট গরু-মহিষের সংখ্যা ৩৩ লাখ। এ ছাড়া ছাগল ও ভেড়া রয়েছে আরো ৭০ লাখ। গত বছর কোরবানি করা পশুর চামড়ার সংখ্যা হিসাব করে দেখা গেছে, ৯৬ লাখ ৩৫ হাজার পশু কোরবানি হয়েছিল। এবার যেহেতু এক কোটির ওপরে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া রয়েছে তাই বিদেশি পশু না এলেও সংকট হবে না। দামও থাকতে পারে নাগালের মধ্যেই।

গত ২৮ আগস্ট একই মন্ত্রণালয়ের আরেক সভায় নিষিদ্ধ স্টেরয়েড দিয়ে মোটাতাজা করা যেসব পশু হাটে আনা হবে সেগুলো আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়। সভায় বলা হয়, আলাদা রাখার পাশাপাশি সম্ভব হলে এসব পশু চিকিৎসার সাহায্যে সুস্থ করারও উদ্যোগ রয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তপথে মোটাতাজা করার নিষিদ্ধ ওষুধ ঢুকে দেশের বাজারে সয়লাব হচ্ছে—এমন অভিযোগে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর ডিসিসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

জানা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে খামারিরা এখন তাদের পশু কোরবানির হাটে তোলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার মালসাদহ গ্রামের মঞ্জুরুল কবীর ৮০টি গরু সংগ্রহ করে তাঁর খামারে লালনপালন করছেন। তার মধ্যে কোরবানির সময় বিক্রির উদ্দেশে রেখেছেন ৪৭টি। একই এলাকার আরেক খামারি ইনামুল হক জানান, তাঁর খামারে ১৩টি নেপালি জাতের গরু আছে। ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে তিনি ক্ষতিকারক ইনজেকশন ও ট্যাবলেট ব্যবহার করেননি। মঞ্জুরুল ও ইনামুলের মতো দেশের অসংখ্য খামারে এবার গরু, মহিষ, ছাগল ভেড়াসহ দেশি জাতের পশু হাটে বিক্রির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

জানা যায়, গবাদি পশুর শরীরে থাকা স্টেরয়েড, হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যথানাশক ওষুধের প্রতিক্রিয়া উচ্চমাত্রার তাপেও নষ্ট হয় না। বরং এসব পশুর মাংস খেলে রাসায়নিক উপাদান মানবদেহেও ঢুকে যায়, যা ধীরে ধীরে কিডনি, লিভার ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে যেসব পশুর দেহে অতিমাত্রায় বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্টেরয়েড বা হরমোন জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করা হয় সেসব পশু অকালে মারা যায়। বেঁচে থাকরেও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিবারই কোরবানির হাটগুলোতে এ রকম অনেক গরু মারা যায়। হাট থেকে কিনে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পরও মারা যায় অনেক পশু। জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের এমন তথ্য ও মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবারই কোরবানির ঈদের আগে অনেকটা হইচই ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ শুরু হয়। বিশেষ করে অবৈধ বা অসাধু উপায়ে অতিমাত্রায় স্টেরয়েড বা হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে গরু মোটাতাজা বানিয়ে বাজারে তোলার প্রবণতা ঠেকাতেই এমন অবস্থান নেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। তবু ক্রেতারা আতঙ্কে ভোগে। তবে এবার যেহেতু দেশি পশুতেই চাহিদা মেটার কথা বলা হচ্ছে, তাই সেই আতঙ্ক কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।  

প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গিয়াস উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, যেহেতু এবার হাটে দেশি গরুর চালান বেশি থাকছে তাই স্টরয়েড বা হরমোনের ভয়ও অনেকাংশেই থাকছে না। দেশি গরুর শরীরে স্টেরয়েড বা হরমোন প্রয়োগ করলেও বিদেশি জাতের গরুর মতো দ্রুত সময়ের মধ্যে ফুলেফেঁপে উঠতে পারে না। উল্টো এসব পশুর তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির ভয়ে দেশি গরুকে অবৈধ পন্থায় মোটাতাজা করার চেষ্টা করে না।  

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ সামসুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, গরু বা এ জাতীয় প্রাণীর শরীরে স্টেরয়েড ও হরমোন ছাড়াও অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ প্রয়োগ করার কুফল মারাত্মক ভাবে পড়ছে মানবদেহে। বিশেষ করে এসব রাসায়নিক আগুনের তাপে নষ্ট হয় না। মাংসের মাধ্যমে মানবদেহে রাসায়নিক ঢুকে মানুষের লিভার, কিডনি ও স্নায়ুতান্ত্রিক নানা জটিলতা তৈরি করে। এ ছাড়া কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা গরুর মাংস নিয়মিত খাওয়ার প্রভাবে মানুষের মধ্যেও স্থূলতার প্রভাব পড়ে।  

গাংনীর খামারি মঞ্জুরুল কবীর জানান, হঠাৎ করে ভারত থেকে গরু আসা শুরু হলে লোকসানে পড়বেন তাঁর মতো খামারিরা। বগুড়ার গাবতলীর খামারি আরজত হোসেন জানান, তিনি ১০ বছর ধরে স্বাভাবিক খাবার খাইয়ে গরু মোটাতাজা করছেন। এবার নেপালি, হরিয়ানা ও দেশি জাতের ৪১টি গরু পালছেন। তাঁর মতে, যেসব খামারি হরমোন-জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করে মোটাতাজা করে, তাদের গরু মারা যায়।

দাম থাকতে পারে নাগালের মধ্যে : ব্যবসায়ীরা বলছেন, গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার বর্তমান যে বাজারমূল্য রয়েছে, কোরবানির সময় দাম তার কাছাকাছিই থাকতে পারে। বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে দেশি পশুর ওপর নির্ভরশীল আমরা। স্বাভাবিক সময়ের চাহিদা পূরণ হচ্ছে দেশি পশুতে। তবে কোরবানির সময় কিছুটা টানাটানি হয়। এ অবস্থায় ভারত গরু আমদানি নিরুৎসাহিত করায় বিকল্প হিসেবে নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমার থেকে কিছু পশু আমদানি করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভারত থেকেও পশু আসবে বলে আশা করছি। অবশ্য না এলেও অসুবিধা হবে না। দামেও প্রভাব পড়বে না। সহনীয় দামে মানুষ পশু কিনতে পারবে। কারণ গত কয়েক বছরে দেশে গবাদি পশু পালনের হার অনেক বেড়েছে। ’


মন্তব্য