kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মিতু হত্যাকাণ্ড

কৌশলে স্থবির তদন্ত

রিমান্ডের আসামিকে জেরার ‘সময় নেই’

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কৌশলে স্থবির তদন্ত

সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলার তদন্তের গতি থেমে গেছে। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের মাঝে এখন আর ওই মামলা নিয়ে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায় না।

বাবুল আক্তারের এক সময়ের সহকর্মীরা বলছেন, মিতু হত্যা মামলার তদন্তের গতি কৌশলে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। না হলে চাঞ্চল্যকর বহুল আলোচিত এ মামলার তদন্তে গা ছাড়া ভাব থাকবে কেন। তাঁরা বলছেন মামলাটি নিয়ে এখন বাবুল আক্তারের সঙ্গে ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলায় মেতেছে পুলিশ।

৫ জুন মিতুকে হত্যা করা হয়। ৯ জুন পুলিশ প্রথম গ্রেপ্তার দেখায়। ১ জুলাই পর্যন্ত তারা মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে। পরে ৫ জুলাই তাদের দুজন কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। কার্যত এর পর থেকে ওই মামলার কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ে।

গত ২ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু সালেম মোহাম্মদ নোমান মিতু হত্যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামি এহতেশামুল হক ভোলার দ্বিতীয় দফা রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। অথচ তদন্তকারী কর্মকর্তা ৩৬ দিনেও আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের ‘সময়’ পাননি। এ ছাড়া ৪ আগস্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা মিতু হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষার রিপোর্ট পেয়েছে। এ রিপোর্ট পাওয়ার পর এ নিয়েও কোনো তৎপরতা নেই।

সহকর্মীর স্ত্রী মিতু হত্যা মামলার তদন্তের গতি-প্রকৃতি পর্যালোচনা করছেন এমন পুলিশ কর্মকর্তা নগর পুলিশে আছেন অনেকেই, যাঁরা এখন কার্যত চুপ হয়ে দর্শকের ভূমিকায় রয়েছেন। মূলত ওই সব কর্মকর্তা মামলার তদন্তের নানা দিক ও পুলিশের কৌশলগত ভূমিকা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলেন। তবে ওই সব কর্মকর্তা নিজদের পরিচয় প্রকাশ করে পত্রিকায় বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তাঁদেরই কয়েকজন এ প্রতিবেদককে বলেন, গণমাধ্যমে মিতু হত্যাকাণ্ডের তীর বাবুল আক্তারের দিকেই ছোড়া হয়েছে বা হচ্ছে। যদি বাবুল আক্তার খুনিই হবেন, তাহলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো না কেন? তাঁকে পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হলো কেন? খুনি হলে গ্রেপ্তার করা যেত। আর গ্রেপ্তার করলেই আইন অনুযায়ী বাবুল আক্তারের চাকরির বিষয়টির সুরাহা হতো। এখন যেভাবে বাবুল আক্তারকে ধরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, তাতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তারা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকেই হুমকির মুখে ফেলেছেন। এ কারণে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদকারীদের একজন হিসেবে নগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহারের দিকেও অভিযোগের তীর ছুড়েছেন ওই সব কর্মকর্তা। কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, বাবুল যদি খুনি হন, তাহলে তাঁকে ছেড়ে দিয়ে পদত্যাগপত্র নেওয়ার ওনারা (জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তা) কে? আইন কি তাঁদের সেই ক্ষমতা দিয়েছে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এখন মামলার তদন্ত থামিয়ে দিয়ে বাবুল কী ধরনের পদক্ষেপ নেন সেদিকেই উঁকি দেওয়ার কৌশল নিয়েছে পুলিশ, যা ইঁদুর-বিড়াল খেলা ছাড়া কিছুই হবে না। এতে পুরো পুলিশ বাহিনী ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। জনগণ হতাশ হবে। ইঁদুর-বিড়াল খেলার ব্যাখ্যা কী জানতে চাওয়া হয় ওই কর্মকর্তার কাছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জেনেছি বাবুল যদি চাকরি ফিরে পেতে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে যান, তাহলে আসামি ভোলা অথবা অন্য কারো মুখ দিয়ে তিনি হত্যার নির্দেশদাতা—এটা বলানো হতে পারে। এ ধরনের স্বীকারোক্তি আদায়ের পর বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার করতে পারে পুলিশ। আবার বাবুল আক্তার চুপ থাকলে পুলিশও চুপ থাকবে। মামলাও থেমে থাকবে। পরে কোনো এক সময় মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হতে পারে। এ ছাড়া বাবুল আক্তারকে বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়ার কৌশলও থাকতে পারে। এটাও হতে পারে এক ধরনের খেলার অংশ। ’

৫ জুন মিতু হত্যাকাণ্ডের পরপরই পুলিশ আবু নছর গুন্নু ও রবিন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। সংশ্লিষ্টতা নেই এমন দুজনকে গ্রেপ্তারের পর সমালোচনা শুরু হলে পুলিশ নড়েচড়ে বসে। সেই সঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তর একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে। পাশাপাশি মামলা তদন্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), সিআইডি, র‌্যাব, কাউন্টার টেররিজম ইউনিটসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা কাজ শুরু করে।

সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজের তথ্য এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের সূত্র ধরে পুলিশ খুনের ঘটনায় জড়িত আসামিদের আটক করতে সমর্থ হয়। ২৫ জুন থেকে পুলিশ আসামি গ্রেপ্তারের তথ্য জানাতে শুরু করে গণমাধ্যমের কাছে; যদিও ২২ জুনই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সন্দেহভাজন আসামি ও পুলিশের সোর্স মুছা সিকদারকে পুলিশ আটক করে বলে দাবি তাঁর স্ত্রী পান্না আক্তারের। তিনি একই দাবি করে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন; যদিও পুলিশ এখন পর্যন্ত মুছা সিকদারকে আটকের কথা স্বীকার করেনি।

মামলার পর পুলিশ খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও দুটি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৯ জন। তাঁদের মধ্যে আবু নছর গুন্নু ও রবিনের সংশ্লিষ্টতা পায়নি পুলিশ। বাকি সাতজন খুনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এর মধ্যে দুজন আসামি ওয়াসিম ও আনোয়ার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। জবানবন্দিতে তাঁরা আরো সাতজনের নাম প্রকাশ করেন। ওই জবানবন্দিতে নাম আসা রাশেদ ও নূরুন্নবী ৫ জুলাই রাঙ্গুনিয়ায় পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়। অস্ত্র সরবরাহকারী এহতেশামুল হক ভোলা, শাহজাহান ও সাকুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তকারী কর্মকর্তার ভাষায়, এখনো পলাতক আছেন মুছা সিকদার, কালুসহ অন্যরা।

তদন্ত কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, মুছা সিকদার খুনিদের ভাড়া করেছেন। এ কারণে খুনের অন্যতম আসামি মুছা সিকদার। অস্ত্র সরবরাহ করেছেন এহতেশামুল হক ভোলা। ভোলার কাছে পাওয়া অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, ওই অস্ত্র দিয়েই মিতুকে গুলি করা হয়েছিল। আসামি রাশেদ ও নূরুন্নবী ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছেন। সাকু ও শাহজাহান কারাগারে। কালু ও মুছা এখনো পলাতক।

মিতু হত্যা মামলার তদন্ত ‘থেমে’ গেছে কেন জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, মামলার তদন্ত থেমে যায়নি। তদন্ত চলছে। কী ধরনের তদন্ত চলছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসামি মুছা সিকদার ও কালুর খোঁজে অভিযান চালানো হচ্ছে। ভোলার দ্বিতীয় দফা রিমান্ড মঞ্জুরের পর কেন ৩৬ দিনেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যস্ততার কারণে সময় পাইনি। সময়মতো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ’ গত এক মাসে মামলা তদন্তের অগ্রগতি শূন্য কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, অগ্রগতি শূন্য হবে কেন? তদন্ত সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে চলছে। হত্যা মামলার পর আসামি ধরতে দৌড়ঝাঁপ ছিল, এখন ঝিমুনি ভাব কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলার তদন্ত যথানিয়মে চলছে। বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, ‘উনি মামলার বাদী, ওনাকে গ্রেপ্তারের কোনো নির্দেশনা আমি পাইনি। আর তদন্তে এখন পর্যন্ত এমন কিছু আসেনি, যাতে ওনাকে গ্রেপ্তারের প্রশ্ন উঠতে পারে। ’

একই প্রসঙ্গে মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা ও নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) পরিতোষ ঘোষ বলেন, মামলার গতি কেউ থামিয়ে দেয়নি কিংবা থেমে যায়নি। যথাযথ নিয়মেই মামলার তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এ মামলায় মুছা সিকদারকে গ্রেপ্তার জরুরি। তাহলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে। মুছাসহ অন্য আসামিদের ধরতে পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে।


মন্তব্য