kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গুলশানে হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ দেন জাহিদুল

► জাহিদ সেনাবাহিনী ছেড়েছিলেন অনেক ছাড় দিয়ে
► তামিম-জাহিদের টার্গেটে ছিলেন মন্ত্রীরাও!

কাজী হাফিজ ও রেজোয়ান বিশ্বাস   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



গুলশানে হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ দেন জাহিদুল

শীর্ষ জঙ্গি নেতা তামিম চৌধুরীর সঙ্গে মিলে নব্য জেএমবির প্রধান সামরিক প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে পুলিশের অভিযানে নিহত মেজর (অব.) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জাহিদ ওরফে মুরাদ। তাঁর সম্পর্কে অনেক গোপন তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলাকারী জঙ্গিসহ নব্য জেএমবির মাঠপর্যায়ের শতাধিক সদস্যকে এক বছর ধরে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন জাহিদ। নব্য জেএমবির সদস্যদের মধ্যে নিবরাসসহ ছয়-সাতজনের একটি টিমকে জাহিদ আলাদাভাবে বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন শুধু গুলশানে হামলা চালানোর জন্য। গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর দুই শীর্ষ জঙ্গি নেতা তামিম ও জাহিদের পরিকল্পনা ছিল একাধিক মন্ত্রীকে হত্যা করার। ঢাকা মহানগর  পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম (সিটি) ইউনিটের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১৫ সালের ১০ জুন জারি করা এক প্রজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, মেজর (অব.) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছামূলক (অকালীন) অবসর গ্রহণ করায় তাঁর পেনশন থেকে ২৫ শতাংশ কর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০১৪ সালের ২৫ জুন থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত কানাডায় অনুষ্ঠিত বৈদেশিক কোর্স (অ্যাডভান্সড্ ওরাকল প্রোগ্রামিং কোর্স) সম্পন্ন করার এক বছরের মধ্যে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার আবেদন করায় তাঁকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছিল।

ওই প্রজ্ঞাপন থেকে আরো জানা যায়, মেজর (অব.) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম পিএসসি, পদাতিক স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি নিয়েছিলেন। তাঁর বিএ নম্বর ৬১২৪। কানাডায় অ্যাডভান্সড্ ওরাকল প্রোগ্রামিং কোর্স সম্পন্ন করায় তথ্যপ্রযুক্তিতেও বিশেষজ্ঞ ছিলেন তিনি।

ওই প্রজ্ঞাপনে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম সম্পর্কে বলা হয়, অবসরের কমপেনডিয়াম অব মিলিটারি পেনশন-১৯৮১, রুল ১৬ অনুযায়ী প্রাপ্য পেনশন থেকে ২৫ শতাংশ কর্তন করা হবে।

ওই কর্মকর্তা ২৫ জুন ২০১৪ থেকে ৪ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখ পর্যন্ত কানাডায় অনুষ্ঠিত বৈদেশিক কোর্স (অ্যাডভান্সড্ ওরাকল প্রোগ্রামিং কোর্স) সম্পন্ন করার প্রথম বর্ষের মধ্যে স্বেচ্ছামূলক (অকালীন) অবসরের আবেদন করায় তাঁকে আর্মি রেগুলেশন্স (রুল্স্) ২৫৭-এর অ্যাপেনডিক্স ‘এইচ’ অনুযায়ী ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করতে হবে। এই প্রজ্ঞাপন সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালের ২ জুলাই।

এদিকে মেজর (অব.) জাহিদুলের পারিবারিক সূত্রেও জানা গেছে, কানাডায় যাওয়ার পর ব্যাপক পরিবর্তন আসে তাঁর মধ্যে। স্ত্রী শিলা ও দুই মেয়েকে কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনে চলতে বাধ্য করেন তিনি। স্ত্রী শিলাকে বলেন, চোখ ছাড়া আর কিছু দেখা যাবে না এমন পোশাক পরতে। এ নিয়ে দ্বন্দ্বও হয়। সংস্কৃতিমনা শ্বশুরবাড়ির লোকদের এতে আপত্তি ছিল। কিন্তু সেই আপত্তি পাত্তা পায়নি জাহিদের কাছে।

তদন্তে মিলছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য : ডিএমপির সিটি ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, অন্তত এক বছর নব্য জেএমবির মাঠপর্যায়ের শতাধিক সদস্যকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন মেজর (অব.) জাহিদ। সেসব সদস্যের মধ্যে গুলশানে হামলাকারী নিবরাস ইসলাম ও তার চার সহযোগী, শোলাকিয়ায় পুলিশের ওপর হামলাকারী দলের চারজন এবং কল্যাণপুরে জঙ্গি ঘাঁটিতে নিহত ৯ জঙ্গি অন্যতম। এর বাইরে জাহিদের প্রশিক্ষণ পেয়ে নব্য জেএমবির মাঠপর্যায়ের জঙ্গিদের অনেকেই এখনো উত্তরাঞ্চলে আত্মগোপনে রয়েছে। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা উত্তরাঞ্চলের একাধিক চরে নব্য জেএমবির সদস্যদের ট্রেনিং দেন বলে তদন্তে জানতে পেরেছে সিটি ইউনিট।

সিটি ইউনিটের উপকমিশনার (ডিসি) মহিবুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, জঙ্গি জাহিদুল ইসলাম নব্য জেএমবির সামরিক প্রশিক্ষক ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েই নব্য জেএমবির সদস্যরা নাশকতায় সম্পৃক্ত হয়। তাঁর সম্পর্কে এরই মধ্যে অনেক গুরুত্বপর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।

গুলশানে জঙ্গি হামলার তদন্তে নিয়োজিত সিটি ইউনিটের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, জাহিদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া জঙ্গিরাই গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলা চালায়। তামিমের মৃত্যুর পর জাহিদকে ধরতে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। একপর্যায়ে ঢাকা ও ঢাকার উপকণ্ঠেই তাঁর সম্ভাব্য অবস্থান জানা যায়। এর মধ্যে মিরপুরের রূপনগরের বাসার সন্ধান মেলে। সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাহিদ স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ওই বাসায় আত্মগোপন করে থাকা অবস্থায় তাঁর নিরাপত্তা দিতে নব্য জেএমবির ১০ জঙ্গি নিয়মিত সতর্ক থাকত চাপাতি ও আধুনিক অস্ত্র নিয়ে। তবে ধূর্ত জাহিদ একপর্যায়ে রূপনগরের বাসা ছেড়ে দেওয়ার মনস্থির করে স্ত্রী-সন্তানদের অন্যত্র সরিয়ে নেন। সে সময় তাঁকে পাহারা দেওয়া নব্য জেএমবির সদস্যদেরও তিনি কিছুদিনের জন্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে বলেন।

সূত্রমতে, জাহিদের ঘনিষ্ঠ ওই ১০ জঙ্গি সম্পর্কেও ধারণা পেয়েছে সিটি ইউনিট। এদের মধ্যে চারজনের নাম হলো মানিক, ইকবাল, আকাশ ও সাগর। এ ছাড়া জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার ওরফে শিলাকেও খুঁজছেন গোয়েন্দারা। গোয়েন্দাদের ধারণা, শিলাও জঙ্গি দলের সদস্য। জাহিদের মৃত্যুর পর তাঁর ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে রয়েছেন শিলা।


মন্তব্য