kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিতর্কিতদের স্বাধীনতা পুরস্কার বাতিল হচ্ছে

আশরাফুল হক রাজীব   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বিতর্কিতদের স্বাধীনতা পুরস্কার বাতিল হচ্ছে

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া স্বাধীনতা পুরস্কার যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ পর্যালোচনায় যদি দেখা যায়, স্বাধীনতাবিরোধী কেউ পুরস্কার পেয়েছেন তাহলে তা বাতিল করা হবে।

এরই মধ্যে জাতীয় পুরস্কার-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পুরস্কার বাতিলের সুপারিশ করেছে গত ২৪ আগস্ট। আর এ সুপারিশ গত রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদন পেয়ে ফেরতও এসেছে। এখন পুরস্কার বাতিলের গেজেট জারি হবে।

জাতীয় পুরস্কার-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সদস্য কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পুরস্কার বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে আদালতের রায়ের আলোকে। তিনি ছাড়াও বিভিন্ন সময় যাঁদের এ মহামূল্যবান পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, তাঁদের বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হবে। স্বাধীনতাবিরোধী কেউ এ সম্মান পেতে পারেন না। প্রয়োজনে তা বাতিল করা হবে। কৃষিমন্ত্রী আরো বলেন, জিয়াউর রহমানের পুরস্কার বাতিলের সুপারিশ আসার পর বিএনপি বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। অথচ জিয়া-খালেদা দম্পতির ছেলেরা এ পুরস্কার গ্রহণ করেননি। রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক থাকে। যাঁদের মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া হয়, তাঁদের পরিবারের সদস্যরা এসব পুরস্কার গ্রহণ করেন অনেক ভালোবাসা আর মমতায়। অথচ ২০০৩ সালের এ পদক গ্রহণ  করেননি তারেক বা কোকো। জিয়াউর রহমানের বীর-উত্তম খেতাব বাতিল করা হবে কি না জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী বলেন, এই খেতাব যখন দেওয়া হয় তখন দৃশ্যত দেশবিরোধী ভূমিকায় ছিলেন না জিয়া। তাই তা বাতিলের প্রশ্ন অবান্তর।

স্বাধীনতা পুরস্কার হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় পুরস্কার। ১৪টি ক্ষেত্রের যেকোনোটিতে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখলে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে—স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিদ্যা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, পল্লী উন্নয়ন, সমাজসেবা বা জনসেবা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জনপ্রশাসন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ এবং সরকার নির্ধারিত অন্য যেকোনো ক্ষেত্র।

স্বাধীনতা পুরস্কারের প্রার্থী বাছাইয়ের সময় দেশ ও মানুষের কল্যাণে অসামান্য অবদান রয়েছে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেই বিবেচনা করা হয়। এই ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কৃতিত্বই আমলে আনা হয়। বিদেশিদেরও এ পদক দেওয়া হয়। কিভাবে স্বাধীনতা পুরস্কারের তালিকা তৈরি হয় জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে পরের বছরের পুরস্কারে ভূষিত করার জন্য সব মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব আহ্বান করে। অনেক সময় সম্ভাব্য নাম চাওয়া হয় বিভিন্ন সময় স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তদের কাছেও। এসব প্রস্তাব বাছাই করে প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটি। তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব যায় জাতীয় পুরস্কার-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে। তাদের প্রস্তাবটিই চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী। মনোনীত কোনো ব্যক্তি পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বা নির্দিষ্ট তারিখে উপস্থিত হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করতে না চাইলে তাঁকে চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আর মরণোত্তর পুরস্কারপ্রাপ্তদের উত্তরাধিকারী না পাওয়া গেলে সেই পুরস্কার জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। পদকপ্রাপ্তদের ১৮ ক্যারেট স্বর্ণে নির্মিত ৫০ গ্রাম ওজনের মেডেল ও সম্মাননাপত্রের সঙ্গে দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়।

স্বাধীনতা পুরস্কার চালু হয় ১৯৭৭ সালে। বিভিন্ন সময় এ পুরস্কার নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। ১৯৮০ সালে শর্ষীনার পীর মাওলানা আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয় শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখার জন্য। ২০০৩ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এ পুরস্কার দেয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকেও। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করার জন্যই জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁকে এ পদক দেওয়া হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট এ পুরস্কার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিসভা কমিটি।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, শুধু শর্ষীনার পীরই নন, আরো অনেক বিতর্কিত ব্যক্তিকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর বাবার হত্যাকাণ্ডের পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শর্ষীনার পীরের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অনেক নৃশংসতার সঙ্গে শর্ষীনার পীর জড়িত ছিলেন। তাঁর নৃশংসতার বর্ণনা রয়েছে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থের অষ্টম খণ্ড এবং ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ গ্রন্থে। স্বাধীনতা পুরস্কার  দেওয়া শুরুই হয়েছে মাহবুব আলম চাষীকে দিয়ে। অথচ এই চাষী ১৯৭৫ সালের ষড়যন্ত্রকারী ও ঘাতক। পাকিস্তানের অনেক স্বপ্নদ্রষ্টাও এ সম্মান পেয়েছেন। তাঁরা চাননি বাংলাদেশ সৃষ্টি হোক। তাহলে তাঁদেরকে কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হলো এ প্রশ্ন রেখে শাহরিয়ার কবির বলেন, পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা হওয়া সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা না হওয়া। অনেক মুসলিম লীগারকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। অথচ মুসলীম লীগ সব সময় বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে। একজন আপাদমস্তক মুসলিম লীগার কিভাবে স্বাধীনতা পুরস্কার পান? আমরা অনেক দিন থেকে বলে আসছি, যেসব বিতর্কিত ব্যক্তিকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তা বাতিল করা হোক। এখনো অনেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদেরকে এ সম্মান দেওয়া উচিত। স্বাধীনতা পুরস্কারের পাশাপাশি অন্যান্য জাতীয় পুরস্কারও পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার বলে জানান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বাধীনতা পুরস্কার কথাটির মধ্যেই নিহিত আছে কাদের এ পুরস্কার দেওয়া যাবে। কাজেই স্বাধীনতায় যাঁরা বিশ্বাস করেন না, তাঁদের কিভাবে এ পুরস্কার দেওয়া হলো? যাই হোক বিষয়গুলো নিশ্চয়ই পুরস্কার-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বিবেচনায় নেবে।


মন্তব্য