kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

ফিরছে সুদিন!

বাড়ছে সংখ্যা, আকার ও বিচরণক্ষেত্র

তৌফিক মারুফ   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ফিরছে সুদিন!

ইলিশ নিয়ে হা-পিত্যেশ করার দিন শেষ হয়ে আসছে। যেমন পরিমাণে, তেমনি আকারেও বাড়ছে ইলিশ।

বাড়ছে বিচরণক্ষেত্রও। বিশেষজ্ঞরা একে দেখছেন শুভ ইঙ্গিত হিসেবে। তাঁরা বলছেন, গত কয়েক বছরে ইলিশ পদ্মাছাড়া হয়ে গিয়েছিল। ষাটের দশকে যেখানে পদ্মাকে ইলিশের খনি বলা হতো, সেখানে আশির দশক থেকে ধীরে ধীরে পদ্মায় কমতে শুরু করেছিল ইলিশের আনাগোনা। এমনকি ২০০১-০২ সাল থেকে ২০১০-১২ সাল পর্যন্ত পদ্মা প্রায় ইলিশশূন্য হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সরকারের গত কয়েক বছরের ব্যাপক সুরক্ষামূলক পদক্ষেপের ফলে এখন আবার পদ্মায় ফিরেছে ইলিশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সর্বশেষ বা পঞ্চম ইলিশ অভয়াশ্রম হিসেবে পদ্মার নিম্নভাগে শরীয়তপুরের তারাবুনিয়া এলাকাকে বেছে নেওয়ার পর থেকে ইতিবাচক প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে এখন ইলিশের মৌসুমে আড়তে-হাটবাজারে ফিরতে শুরু করেছে ইলিশের প্রাচুর্য। মাথায় ঝাঁকা নিয়ে শহরের অলিগলি ঘুরে ঘুরে বিক্রেতারা ইলিশ, ইলিশ বলে হাঁক ছাড়ছে।

গবেষকরা জানান, বৃষ্টিপাত, পানিপ্রবাহের সঙ্গে ইলিশের উৎপাদন সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। একসময় বাংলাদেশের প্রায় সব প্রধান নদ-নদীতেই ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। তবে ১৯৭৮ সালের পর থেকে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পদ্মায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় ইলিশের চলাচল ও আবাসস্থল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণসহ মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণে পদ্মা-মেঘনাসহ অনেক নদীর পানিপ্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় ইলিশের প্রজননক্ষেত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পরিবর্তিত হয়েছে এর বিচরণক্ষেত্র ও ভ্রমণপথ। সহনশীল মাত্রায় ইলিশ উৎপাদন বজায় রাখতে হলে ইলিশের চলাচল, খাদ্যগ্রহণ, প্রজনন ইত্যাদি কার্যকলাপ অবাধ ও স্বাভাবিক রাখতে হবে।

ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএফআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একপর্যায়ে আমরা ভেবেই নিয়েছিলাম পদ্মা বুঝি ইলিশশূন্যই হয়ে গেল! এমনকি আমরা গবেষণার জন্য পদ্মায় ঘুরেও কখনো ইলিশ পাচ্ছিলাম না। তবে এখন আবার সেই পদ্মায় ইলিশ মিলছে, বিস্তার ঘটছে ইলিশের বিচরণক্ষেত্রের। এমনকি পদ্মার আশপাশের কোথাও কোথাও পুকুরেও ইলিশ পাওয়ার নজির দেখেছি সম্প্রতি। ’

ড. আনিসুর রহমান বলেন, ‘পদ্মা ছাড়াও গত কয়েক বছরে আরো কিছু নতুন এলাকায় আমরা ইলিশের বিচরণ দেখছি। বলা যায়, এখন সারা দেশেই ইলিশের কম-বেশি বিচরণ আছে। এমনকি সুরমা-কুশিয়ারার আশপাশের বড় বড় বিল এলাকা থেকেও আমরা ইলিশ ধরা পড়ার খবর পাচ্ছি। এটা নিঃসন্দেহে সুখবর। ’

অবশ্য বিশেষজ্ঞরা নদীদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহের সংকটের মুখে ইলিশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়তে পারে বলেও মনে করেন। ইলিশ গবেষকরা সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় শুরু করেছেন নানা কার্যক্রম। ইলিশসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চত করতে সংশ্লিষ্ট সব মহলকে সজাগ রাখতেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ অনুসারে সারা বিশ্বের মোট ইলিশ সম্পদের ৯৫ শতাংশই পাওয়া যায় বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের জলসীমায়। আর বিশ্বের মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশই মেলে বাংলাদেশে। মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, ২০০১-০২ সালে যেখানে ইলিশ আহরণের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ২০ হাজার ৫৫৩ মেট্রিক টন, ২০১৩-১৪ বছরে তা দাঁড়ায় তিন লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টনে। শতকরা হিসাবে যার বৃদ্ধির হার ৭৫ শতাংশ।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ইলিশ মাছের অবাধ প্রবেশ ও বিচরণ নিশ্চিতকরণের জন্য পাঁচটি নির্দিষ্ট এলাকা অভয়াশ্রম ঘোষণা করে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি অবাধ প্রজনন ও প্রাকৃতিকভাবে অধিক ডিম ও পোনা উৎপাদনের জন্য মৎস্য সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০-এর অধীনে টানা ১৫ দিন ইলিশ শিকার, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত বা কেনাবেচা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এবারও আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত ওই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে ইতিমধ্যেই।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ইলিশ মাছের নিরাপদ আবাসস্থল উন্নয়ন ও সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দিনে দিনে এ আবাসস্থল ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা অনিরাপদ হয়ে পড়ছে সঠিক মাত্রায় নাব্যতা সংরক্ষণ না করা, সঠিক প্রবাহ নিশ্চিত না করা, ইলিশ অধ্যুষিত জলাশয়ের আশপাশে অপরিকল্পিত উপায়ে বাঁধ নির্মাণ, নদী ভরাট করা এবং শিল্প ও কৃষিক্ষেত্রের দূষণের ফলে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে উপকূলে চলাচলকারী দেশি-বিদেশি জাহাজের জ্বালানি ও বর্জ্য নির্গত হওয়াও বড় বিপদ বয়ে আনছে ইলিশের ওপর। সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ইলিশ ক্ষেত্রগুলোর আশপাশের কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকও ক্ষতি বয়ে আনছে। প্রতিবছর কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকের আড়াই থেকে তিন হাজার মেট্রিক টন পানিতে ধুয়ে নদীতে নেমে এসে মাছের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব বিষয়ে পর্যায়ক্রমে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়ায় দ্রুতই কিছুটা সুফল মিলতে শুরু করেছে।

বিএফআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে জোরালো পদক্ষেপ চলছে। যার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে বছর বছর। জাটকা ও মা ইলিশ নিধন বন্ধে উপযুক্ত কর্মকৌশলের ফলে উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েই চলছে। রপ্তানিও বন্ধ রাখা হয়েছে। যে কারণে দেশে ইলিশের চাহিদার তুলনায় ঘাটতি কমে গেছে। যদিও মান ধরে রাখা নিয়ে সংশয় ও ঝুঁকি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিমাণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমানভাবে মান সুরক্ষায়ও সমন্বিত টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ’

মৎস্যবিজ্ঞানীরা জানান, ইলিশ শুধু বাংলাদেশের জাতীয় মাছই নয়, এটা এখন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পদ। বিশেষ করে দেশে উৎপাদিত মোট মৎস্যসম্পদের মধ্যে এককভাবে ১২ শতাংশ জোগান দেয় ইলিশ। দেশের জিডিপিতে ইলিশ ১ শতাংশ অবদান রাখছে। এ ছাড়া সরাসরি পাঁচ লাখ জেলে এবং আরো ২৫ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ইলিশ শিকার থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক নানা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে ইলিশসম্পদকে আরো টেকসই ও উন্নয়ন করতে গবেষণা কার্যক্রম জোরালো করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ড. আনিসুর রহমান বলেন, ‘চলতি বছরের শুরু থেকেই আমরা পূর্বাভাস দিয়েছিলাম এবার ইলিশ মৌসুমে উৎপাদন অনেকটাই ভালো হবে। এখন দেখছি তা-ই হয়েছে। এবার যথেষ্ট ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, আকারও বেশ ভালো। ’

বিশেষজ্ঞরা জানান, বিগত কয়েক দশকে ইলিশের উৎপাদন দ্রুত হ্রাস পেলেও এ মাছের উৎপাদন সহনশীল পর্যায়ে বজায় রাখতে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা কৌশল যেমন—জাটকা সংরক্ষণ, সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুমে ইলিশ মাছ আহরণ নিষিদ্ধ, অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বাস্তবায়নের কাজ শুরুর সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। ইলিশ মাছ সারা বছরই কমবেশি প্রজনন করলেও সবচেয়ে বেশি প্রজনন করে অক্টোবরের (আশ্বিন/কার্তিক) বড় পূর্ণিমার সময়। এ সময় শতকরা প্রায় ৬০-৭০ ভাগ ইলিশ মাছই পরিপক্ব ও ডিম ছাড়ার উপযোগী অবস্থায় থাকে। আর এ সময়েই সবচেয়ে বেশি ইলিশ (মোট ধৃত মাছের ৫০-৬০ শতাংশ) ধরা পড়ে। ইলিশের আবাসস্থল নদী-মোহনার ইকোলজি বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে আরো গবেষণা চলছে। ইলিশের প্রধান চারটি প্রজননক্ষেত্র (ঢালচর, মনপুরা মৌলভীরচর ও কালিরচর দ্বীপ) সমন্বিতভাবে প্রায় সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রতিবছর ইলিশের প্রজনন মৌসুমে (আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার সময়) ১১ দিন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে নিম্ন মেঘনা নদী, শাহবাজপুর চ্যানেল, তেঁতুলিয়া ও আন্ধারমানিক নদীর অভয়াশ্রমে মার্চ ও এপ্রিলে (মধ্য ফাল্গুন থেকে মধ্য বৈশাখ) এবং পদ্মা নদীর নিম্নাংশে মার্চ ও এপ্রিলে (মধ্য ফাল্গুন হতে মধ্য বৈশাখ) ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে ২০০২ সালের তুলনায় ২০০৭ থেকে ২০১৪ সালে প্রাকৃতিক প্রজনন সাফল্যের হার পর্যায়ক্রমে প্রায় ১১ শতাংশ থেকে শুরু করে ৭৭.৫৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০১৪ সালের ইলিশ প্রজনন মৌসুমে ১১ দিনে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকার সফলতার সমীক্ষায় গবেষকরা দেখেছেন, প্রায় এক কোটি ৬৩ লাখ ইলিশ মাছ শিকার থেকে রক্ষা পেয়েছিল। যা থেকে প্রায় চার লাখ ১৭ হাজার ৭৬৫ কেজি ডিম প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হয়েছে।


মন্তব্য