kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মোহনায় ছুটছে ইলিশ

শিমুল চৌধুরী, ভোলা, ফারুক আহম্মদ, চাঁদপুর ও জসীম পারভেজ, কলাপাড়া   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মোহনায় ছুটছে ইলিশ

চাঁদপুরে ইলিশের আড়তে দম ফেলার ফুরসত নেই মহাজন ও শ্রমিকদের। কয়েক দিন আগেও ছিল উল্টো চিত্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

এক হাতে বাজারের ব্যাগ, আরেক হাতে ঝুলছে দড়িতে বাঁধা জোড়া ইলিশ, কিংবা বাজারের ব্যাগের পুরোটাই ইলিশে ভরা—দ্বীপ জেলা ভোলার আনাচকানাচে এখন দেখা মিলবে এমন দৃশ্যের। জেলেরা বলছে, নদী কিংবা সাগরে জাল ফেললেই ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ।

একসঙ্গে এত ইলিশ ধরা পড়ায় দামও কমে গেছে। নদীর ঘাটে বা হাটবাজারে লোকজনের আনাগোনাও বেড়ে গেছে। সস্তায় ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরছে সবাই।  

জেলেরা বলছে, ১৫ দিন আগেও এমন অবস্থা ছিল না। ভরা মৌসুম সত্ত্বেও মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ মিলছিল না। যারা জাল নিয়ে সাগরে যেত, তারাও ফিরত প্রায় খালি হাতেই। তবে মাঝের সময়টায় পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইলিশ এখন মোহনার দিকে ছুটছে। তাই জাল ফেললেই ধরা পড়ছে।

জেলেরা ট্রলার বোঝাই করে ইলিশ নিয়ে সাগর ও নদী থেকে উপকূলে ফিরছে। এখন ভোলায় ৫০০ গ্রাম ওজনের প্রতি হালি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। এক কেজি ওজনের এক হালি ইলিশের দাম পড়ছে দুই হাজার ২০০ টাকার মতো। জাটকার হালি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়।    

দেশের অন্যতম মৎস্যকেন্দ্র ভোলার মাছের আড়তগুলো রুপালি ইলিশে সয়লাব হয়ে গেছে। ইলিশ ধরা পড়ছে না দেখে কয়েক দিন আগেও আড়তদারদের মুখ গোমড়া ছিল। এখন সেই মুখে হাসি ফিরেছে। আড়তেও ফিরছে চাঞ্চল্য ভাব। চলছে জমজমাট বেচাকেনা। এসব আড়ত থেকেই ইলিশ যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে।

কুয়াকাটাসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরেও প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। মাছ নিয়ে জেলেরা ছুটে আসছে কলাপাড়ার আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। ইলিশ ব্যবসায়ীরাও মৎস্যবন্দর আলীপুর ও মহিপুরে বিনিয়োগ করছেন।

দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইলিশের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় চাঁদপুরের আড়তগুলোতেও লোকজনের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। সকাল-বিকাল সরগরম থাকে সব আড়ত। গতকাল সোমবার দুপুরে ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতলী মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ইলিশবোঝাই অন্তত ১৫-১৬টি মাছ ধরার ট্রলার নোঙর করেছে। ইলিশবোঝাই আরো পাঁচ-ছয়টি ট্রলার নদী ও সাগর থেকে উপকূলের দিকে আসছে। ঘাটে ভেড়ার পর সেই ইলিশ আড়তে নিচ্ছে জেলেরা। আড়তদাররা বরফ দিয়ে নিলামে ইলিশ বিক্রি করছে মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে। মাছ ব্যবসায়ীরা স্থানীয় বিভিন্ন বাজার ছাড়াও ঢাকা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাচ্ছে বাক্সবোঝাই বরফে ঢাকা ইলিশ।

জেলে, আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা জানায়, জোবার (জোয়ার-ভাটা) সময় জেলেরা আরো বেশি ইলিশ নিয়ে উপকূলে ফিরবে। তুলাতলী মাছঘাটে কথা হয় ধনিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তৈয়ব আলী জেলের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘ভোর ৭টার দিকে নদীতে গেছিলাম। ঘাটে ফিরছি দুপুর ১টায়। ছোট সাইজের ইলিশ মাছ পাইছি প্রায় তিন হালি। দাম পড়ব হাজার দেড়েক। এক সপ্তাহ ধরে নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পড়তাছে। অথচ মাসখানেক আগেও ভোলার নদ-নদী ছিল ইলিশশূন্য। ’

ধনিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে ও ইউনিয়ন ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক বশির মাঝি জানান, ১৫ দিন আগেও একজন জেলে দিনে মাত্র দুই-তিন হাজার টাকার মাছ পেত। এখন একজন জেলে দিনে প্রায় ২০ হাজার টাকার মাছ পাচ্ছে। দামও আগের চেয়ে কমেছে। আধাকেজি ওজনের এক হালি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। এক কেজি ওজনের প্রতি হালি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় দুই হাজার ২০০ টাকায়। জাটকার হালি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়।

তুলাতলী মাছঘাটের আড়তদার রোমান পাটওয়ারী বললেন, নদীতে এখন প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। জোবার সময় এ ঘাটে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকার মাছ বেচাকেনা হয়। ওই সময় ইলিশবোঝাই প্রায় আড়াই শ ট্রলার তীরে আসে। তখন তুলাতলী মাছঘাট আরো জমজমাট হয়ে ওঠে। তবে এখন অভাব শুধু বরফের। চাহিদামতো বরফ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় বরফের কারণে বহু মাছ নষ্ট হয়।  

জেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি এরশাদ হোসেন জানান, এখন দিনে ২০ থেকে ২৫ মণ ইলিশ ধরা পড়ছে। কয়েক দিন আগেও দিনে মাত্র মণখানেক ইলিশ ধরা পড়ত।

ইলিশ বেশি ধরা পড়ায় বরফ কলের মালিক ও কর্মচারীরাও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। তুলাতলী আইস ফ্যাক্টরির কর্মচারী জাকির হোসেন বললেন, তাঁদের কলে প্রতিদিন ২২৫ ক্যান (বড় আকারের চাঁইকে ক্যান বলে) বরফ তৈরি হচ্ছে। তবু চাহিদামতো বরফ সরবরাহ করতে পারছেন না তাঁরা।    

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রেজাউল করিম গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, এবার বর্ষায় পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় সাগর ও নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে।  

ইলিশে সয়লাব চাঁদপুরের মাছের মোকাম : দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী ও সাগরে ধরা পড়া ইলিশে সয়লাব চাঁদপুরের মাছের মোকাম। হঠাৎ ইলিশের আমদানি বাড়ায় ব্যস্ত সময় কাটছে প্রধান মাছের আড়ত বড়স্টেশনের ব্যবসায়ীদের। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনার ইলিশের কথা বলে এসব মাছের চালান চলে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বড় বড় বাজারগুলোতে। গতকাল জেলার সবচেয়ে বড় মাছের পাইকারি বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

এখন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেলে ৩টা পর্যন্ত সরগরম থাকছে বড়স্টেশন আড়ত। ব্যবসায়ীরা জানান, এখন মূলত আমদানি হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলে সাগরে ধরা পড়া ইলিশ। ভোলার মনপুরা, ঢালচর, নোয়াখালীর হাতিয়া কিংবা লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার থেকে এসব ইলিশের চালান আসছে। ভোরে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন যাত্রীবাহী লঞ্চে ঝাঁকিতে ভরে ইলিশ নিয়ে আসছেন সরবরাহকারীরা। প্রতি ঝাঁকিতে ১৪ মণ ইলিশ থাকে। গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত বড়স্টেশন আড়তে আমদানি হয়েছে ১৮০ ঝাঁকি, তাতে ছিল দুই হাজার ৫২০ মণ ইলিশ।

চাঁদপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান কালু জানান, অনেক দিন ধরে মাছের আমদানি কম ছিল, ব্যবসায়ীরাও হতাশায় ভুগছিলেন। কিন্তু হঠাৎ ইলিশের এমন আমদানিতে সবার মধ্যে চাঙ্গাভাব ফিরেছে। এভাবে এক মাস চললে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি পুষিয়ে যাবে।

সুমন খান নামে এক ব্যবসায়ী জানান, গতকাল এক কেজি ওজনের প্রতিমণ ইলিশের দাম উঠেছে ৩৬ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজনের এক মণ ইলিশের দাম পড়েছে ২৪ হাজার টাকা। আর ছোট আকারের ইলিশ প্রতি মণ ১৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

মোখলেছুর রহমান নামের আরেক ব্যবসায়ী জানান, চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ পুরোপুরি ধরা শুরু হলে মাছের দর আরো কমে যাবে।

মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যার পানি সাগরে পড়লে সাগরে পানির চাপ সৃষ্টি হবে। জোয়ারে সেই পানি যাবে নদীর মোহনার দিকে। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে সেই সময় ইলিশও সাগর ছেড়ে নদীর মোহনার দিকে ছুটবে। তখন চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে।

সরেজমিনে বড়স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, ঝাঁকিতে নিয়ে আসা ইলিশের চালান বরফ দিয়ে বাক্স করে ট্রাক ও রেলের ওয়াগনে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে এ আড়তে এসে ইলিশ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।  

চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনিস্টিটিউট ও নদী কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড. আনিছুর রহমান জানান, এক সময় বর্ষা এলেই ইলিশের ভরা মৌসুম বলা হতো। এখন তা পাল্টে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন সেপ্টেম্বর-অক্টোবর হচ্ছে ইলিশ ধরার মৌসুম। এই সময় সাগর থেকে ইলিশের ঝাঁক সাগর মোহনায় ছুটে আসে। পানির স্রোত বেশি হলে তা নদীর দিকে ছোটে।

চাঁদপুরে এখনো সেভাবে ইলিশ না ধরা পড়ার বিষয়ে ড. আনিছুর রহমান বলেন, চর, ডুবোচর আর নদীদূষণের কারণেও সাগর মোহনা ছেড়ে ইলিশ নদীতে ছুটে আসতে পারছে না। তা ছাড়া নিয়মের বাইরেও অনেক জেলে কারেন্ট জাল ব্যবহার করে। তাতে ছোট আকারের ইলিশ ধরা পড়ে যাচ্ছে।

জেলেরা ছুটছে আলীপুর-মহিপুরে : কুয়াকাটাসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে ইলিশের প্রাচুর্য এবং দ্রুত বাজারজাতের সুযোগের কারণে এখন জেলেরা ছুটে আসছে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। ১০-১২ দিন ধরে কুয়াকাটাসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের সোনাচর, ৪ নম্বর বয়াসহ আশপাশের এলাকায় প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। সমুদ্রের এ অঞ্চলটিকে ইলিশ আহরণক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলেরা। ইলিশ বেশি ধরা পড়ায় ব্যবসায়ীরাও আলীপুর ও মহিপুরে ভিড় করছেন।  

সরেজমিনে আলীপুর ও মহিপুরে গিয়ে দেখা গেছে, শিববাড়িয়া নদের দুই তীরে হাজার হাজার মাছ ধরা ট্রলার নোঙর করে আছে। প্রতিটি ট্রলার থেকে মৎস্য আড়তের শ্রমিকরা বিরামহীন ইলিশ খালাস করছে। প্রতিটি আড়তেই বিভিন্ন আকারের ইলিশের স্তূপ।

মহিপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিমাই চন্দ্র দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরটি জেলে ট্রলারের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল, অল্প সময়ে অধিক মাছ শিকারের এবং সেই মাছ বিক্রির নির্ভরযোগ্য স্থান। তাঁর মালিকানাধীন এফবি অপু ট্রলারটি গতকাল ২৮ লাখ টাকার ইলিশ বিক্রি করেছে। এখানে ভোলা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পিরোজপুর, বরগুনাসহ আশপাশের এলাকার ট্রলার মাছ বিক্রি করতে আসে।

চট্টগ্রাম থেকে মহিপুরে আসা মৎস্য ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির জানান, ‘আমাদের কম্পানির ছয়টি ট্রলার রয়েছে। এর মধ্যে আজ একটি ট্রলারের ৬০ মণ ইলিশ ১০ লাখ বিক্রি করেছি। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে—এখান থেকে মাত্র তিন ঘণ্টায় ট্রলারে সোনাচর, ৪ নম্বর বয়াসহ আশপাশের এলাকায় গিয়ে ইলিশ ধরা যায়। ’

আলীপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনসার মোল্লা জানান, জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান সফল হওয়ায় এবার প্রচুর বড় আকারের ইলিশের পাওয়া যাচ্ছে। ৪০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১২ হাজার টাকা মণ দরে, ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১৯ হাজার টাকায় এবং ৮০০ থেকে এক কেজির ওপরের ইলিশের প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ২৬-২৭ হাজার টাকায়। আলীপুর, মহিপুর ও কুয়াকাটায় অর্ধশত মৎস্য আড়ত আছে। সে ক্ষেত্রে কলাপাড়ায় প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচ হাজার মণ ইলিশ আহরণ হচ্ছে।

কলাপাড়ার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জলবায়ু ঠিক থাকায়, পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় এবং উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকায় এ বছর প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে।


মন্তব্য