kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সরকারের জরুরি প্রকল্পের অগ্রগতিতে বাধা

আপেল মাহমুদ   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সরকারের জরুরি প্রকল্পের অগ্রগতিতে বাধা

কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের দুই পাশেই ১০০ ফুট করে প্রশস্ত খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ)। এ জন্য প্রায় ৩০০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

কিন্তু যাদের জমি অধিগ্রহণ করে ওই খাল হবে তাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ওই সব জমির ক্ষতিগ্রস্ত মালিকরা বলছেন, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্রের পেছনে আছে রাজউকের একটি চক্র। ভূমি অধিগ্রহণ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের মনগড়া সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভূমি মালিকদের ওপর। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো জমির বর্তমান বাজারদরের ১০ ভাগের একভাগ ক্ষতিপূরণ পাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

গত ২২ আগস্ট রাজউক ও ঢাকা জেলা প্রশাসনের এক যৌথ সভায় জমির ক্ষতিপূরণ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সভায় ১৫ বছর আগের সিটি জরিপ অনুযায়ী কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের দুই পাশের জমির শ্রেণি নির্ধারণ করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই এলাকার জমির মালিকরা বলছেন, ১৫ বছর আগে সেখানকার অধিকাংশ জমি ছিল নাল কিংবা বোরো আবাদের উপযোগী শ্রেণির। কিন্তু বর্তমানে সে সব জমি ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রি হচ্ছে। আশপাশে অনেকেই বহুতল ভবন নির্মাণ করে বসবাস করছেন। বাড়ির মালিকরা সেখানে গাছপালা লাগিয়েছেন। কেউবা প্লট বিক্রি করে দিয়েছেন। অথচ এসব জমিকে একটি চক্র নিচু পানি কিংবা নাল জমি দেখিয়ে সে অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করছে।

জোয়ার সাহারার আবদুল বাতেন বলেন, ‘এলাকাবাসীকে এ পর্যন্ত সাতবার জমি অধিগ্রহণের নির্মম শিকার হতে হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে রেললাইন, ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক, পাকিস্তান আমলে বিমানবন্দর, নিকুঞ্জ, বাংলাদেশ আমলে পূর্বাচল, ৩০০ ফুট রাস্তা নির্মাণের নামে আমাদের সর্বস্বান্ত এবং বাস্তুহারা করা হয়েছে। সর্বশেষ খাল খননের নামে আমাদের শেষ সম্বল কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সে জমির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ প্রদান নিয়ে চলছে নানা টালবাহানা। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী জমির মূল্য পেলে হয়তো ছেলেমেয়ে নিয়ে শেষ জীবনটা কাটাতে পারব। তা না হলে পথে বসা ছাড়া আমাদের আর কোনো গতি থাকবে না। ’

খাল খনন প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগের জরিপ অনুযায়ী জমির শ্রেণি ধরে ক্ষতিপূরণের কোনো বিধান ভূমি অধিগ্রহণ আইনে নেই। কিভাবে রাজউকের সভায় সিটি জরিপ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত হলো সেটা আমার বোধগম্য নয়। যদি তাই হয়, তাহলে যৌথ জরিপের প্রয়োজন নেই। সিটি জরিপের পর্চা বই দেখেই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে যেহেতু সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, সে জন্য সিটি জরিপের বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেটা করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করলে পুরো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। ’ তিনি আরো বলেন, সরেজমিন বর্তমান জমির দরকে পাশ কাটিয়ে পুরনো সিটি জরিপে জমির দাম ধরে ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলে আইনেরই সংশোধন করতে হবে।

ঢাকা জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে খাল খননের অনুমোদন পাওয়ার পর একটি যৌথ কমিটি সরেজমিনে তদন্তপূর্বক অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের কাজ শুরু করে। ওই কমিটিতে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা ছাড়াও প্রত্যাশী সংস্থার প্রতিনিধি থাকেন। তাঁরা যৌথভাবে জমির শ্রেণি, জমির ওপর স্থাপনা, গাছপালাসহ অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেন। এর স্বচ্ছতার জন্য অধিগ্রহণকৃত এলাকার ভিডিওচিত্র ধারণ করা হয়। এর বাইরে আর কোনো প্রক্রিয়ায় অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ প্রদানের কোনো সুযোগ নেই।

ভূমি অধিগ্রহণ ম্যানুয়েলে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে, অধিগ্রহণকৃত যে জমির ওপর গাছপালা থাকে সেগুলোকে উঁচু জমি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এসব জমির শ্রেণি হয়ে থাকে ভিটি বা বাগান। বর্তমানে খালের জন্য যেসব জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে সেখানে গাছের আধিক্য রয়েছে। তাই অতীতের জরিপ ধরে জমির শ্রেণি নির্ণয় করা হলে বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। অধিগ্রহণ আইনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ এভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে জমির মালিকরা কোনোভাবেই ক্ষতির শিকার না হন।

ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রত্যাশী সংস্থার কথামতো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। বাস্তবে জমির অবস্থান এবং স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব করেই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ হয়ে থাকে। এ জন্য সরেজমিনে ভূমি এবং স্থাপনার অবস্থান দেখার বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি নির্ধারণের জন্য সেখানকার জমির রেজিস্ট্রিকৃত এক বছরে দলিল পরীক্ষা-নিরীক্ষারও সুযোগ রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় কর্মরত একাধিক কানুনগো ও সার্ভেয়ার জানান, ভূমি অধিগ্রহণ এবং ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের জন্য নির্দিষ্ট আইন-কানুন রয়েছে। রাজউক ইচ্ছা করলেই ভূমি মালিকদের জমির মূল্য কম দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে পারবে না। কারণ শুধু ৩০০ ফুটের দুই পাশে খালের জন্যই জমি অধিগ্রহণ হয়নি, দেশের আরো অনেক উন্নয়নমূলক কাজে জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। যেমন ওই খাল প্রকল্পের অদূরে মাদানী এভিনিউ করার সময় যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল সেখানে বর্তমান সময়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাস্তব অবস্থা দেখে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় ক্ষতিগ্রস্তদের। সেখানে তো সিটি জরিপ অনুযায়ী জমির শ্রেণিবিভাগ করা হয়নি। আর সেটা করা হলে তা কেউ মানবেও না। এ ক্ষেত্রে বেআইনি কিছু করা হলে রাজউকের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা হবে এটা নিশ্চিত।

রাজউক চেয়ারম্যান এম. বজলুল করিম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা দিলে ভালো হবে সে জন্য আমরা কিছুদিনের মধ্যেই গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি সভা করার চিন্তাভাবনা করছি। বর্তমান জমির অবস্থার ওপর নির্ভর করে জমির শ্রেণিবিভাগ করা হবে নাকি সিটি জরিপ অনুযায়ী করা হবে সেটা নির্ভর করবে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকরা ক্ষতির শিকার হবেন এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে না। ’


মন্তব্য