kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভয়ংকর হয়ে উঠেছে অবৈধ পাকিস্তানিরা

এস এম আজাদ   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ভয়ংকর হয়ে উঠেছে অবৈধ পাকিস্তানিরা

বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থান করছে কয়েক হাজার পাকিস্তানি নাগরিক। তেমন কোনো বাধা ছাড়াই এ দেশে থেকে তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধমূলক কাজে।

জাল রুপি ও টাকার কারবার, হুন্ডি ব্যবসা, সোনা চোরাচালান, মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে তাদের নাম উঠে এসেছে। আবার যারা অভিজাত মার্কেট ও বাণিজ্য মেলায় দোকান দিয়ে ব্যবসা করছে তাদেরও নেই কোনো ওয়ার্ক পারমিট, ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, আয়কর সনদপত্র ও বিনিয়োগ বোর্ডের অনুমোদনপত্র। অবৈধভাবে এ দেশে অবস্থান করা অনেক পাকিস্তানির বিরুদ্ধে নেপথ্যে থেকে জঙ্গি অর্থায়ন, এমনকি সরাসরি জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগও উঠেছে। তাদের কর্মকাণ্ড জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

পুলিশ, র‌্যাব, শুল্ক বিভাগ ও একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার জাল রুপিসহ শতাধিক পাকিস্তানি নাগরিককে আটক করা হয়। পরে অবশ্য এরা জামিনে বেরিয়ে এসেছে। হুন্ডি, জাল মুদ্রাসহ অবৈধ মুদ্রা পাচারের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে প্রায় এক ডজন পাকিস্তানিকে শনাক্ত করা হয়েছে, যারা এ অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতে জাল রুপি ছড়িয়ে দেওয়ার অপকর্মটিও করে ওই পাকিস্তানিরাই। এমনকি নিজ দেশ থেকে বিশেষ সুতা এনে বাংলাদেশি টাকাও জাল করতে শুরু করেছে তারা। এসব অপকর্মের সঙ্গে পাকিস্তানি দূতাবাস ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের এজেন্টরা জড়িত বলেও প্রমাণ মিলেছে। গত বছর জঙ্গিবাদের মদদ এবং জাল রুপির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাকিস্তান দূতাবাসের দুই কর্মকর্তাকে দেশে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুই বছর ধরে ভিন্ন মতাদর্শী ও বিদেশিদের হত্যায় জড়িত নব্যধারার জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্যদের অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছে এমন কয়েকজন পাকিস্তানির ব্যাপারে তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। এখন এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে। গত বছরের শেষ দিকে ইদ্রিস শেখ, মকবুল শরীফসহ কয়েকজন জেএমবি জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য মিলেছে—পাকিস্তানি সিন্ডিকেট সে দেশে নিয়ে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, দিচ্ছে অর্থ সহায়তাও। সম্প্রতি গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার পর তথ্য মিলেছে, পাকিস্তানের কাশ্মীর সীমান্ত এলাকায়ও বাংলাদেশি কিছু জঙ্গির প্রশিক্ষণ হয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তানি কিছু প্রশিক্ষক বাংলাদেশে এসে অস্ত্র ও বোমার প্রশিক্ষণ দিয়েছে। গুলশান হামলার প্রধান সংগঠক তামিম চৌধুরী পাকিস্তান থেকে অর্থ সহায়তা নিত বলেও তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাল রুপির ব্যবসা এবং জঙ্গিবাদের পেছনে পাকিস্তানি জড়িত—এমন তথ্য পাওয়ার পর সে দেশের নাগরিকদের ওপর কড়া নজর রাখছে গোয়েন্দারা। তবে বাংলাদেশে এসেই নাম-পরিচয় পাল্টে ফেলায় এবং এ দেশে তাদের দোসরদের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় পাকিস্তানি অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।     

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতিতে। অবৈধভাবে অবস্থান করা পাকিস্তানি নাগরিকদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা আগেও বলেছি। অনেক পাকিস্তানি নাগরিক এ দেশে অবৈধভাবে বসবাস করছে। তারা নানা অপরাধে জড়িয়ে গেছে এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণও আছে আমাদের হাতে। যারা অপকর্ম করছে তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে, ধরা হচ্ছে। দেশেও ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ প্রক্রিয়া চলমান। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকেই ছাড় দেবে না সরকার। ’

গত ১৮ আগস্ট তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ভারত সফরে থাকাকালীন ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশের স্থানীয় বিভিন্ন জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে। গত কয়েক বছরে ঢাকায় বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি কূটনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে তথ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।

অবৈধ হয়েও পাকিস্তানিরা যেভাবে এ দেশে : পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক কর্মকর্তা জানান—‘সম্প্রতি এক হিসাবে দেখা গেছে, আট হাজার ৯৪২ জন পাকিস্তানি নাগরিক বৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তবে অবৈধভাবে কতজন অবস্থান করছে তার কোনো হিসাব নেই। ধারণা করা হচ্ছে, বৈধ নাগরিকের দ্বিগুণের বেশি আছে অবৈধভাবে। জাল মুদ্রার কারবার বা ভিন্ন অপরাধে পাকিস্তানিরা ধরা পড়লে তাদের কাছে বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায় না। অবৈধভাবে থাকা পাকিস্তানিদের মধ্যে আহলে সুন্নতপন্থী মাদানি এবং তাবলিগ জামাতের নামে এ দেশে আসা উঠতি বয়সী পাকিস্তানির সংখ্যাই বেশি। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিভিন্ন বয়সী পাকিস্তানি নারী-পুরুষও আছে, যারা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার জন্য এসে থেকে যায়। কিছু লোক আসছে ব্যবসার কথা বলে। কাপড় ও কেমিক্যাল ব্যবসার জন্য এসে আত্মগোপনে থাকা ওই কথিত ব্যবসায়ীরা আড়ালে ভিন্ন কাজ করছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে তাদের খুঁজে পায় না পুলিশ। অনেকে ঠিকানার সঙ্গে নামও বদলে ফেলে। আমরা অবৈধদের তালিকা করার চেষ্টা করছি। এ জন্য অন্যান্য বিভাগের সহযোগিতা লাগবে। ’

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে পাকিস্তানি পণ্য এনে দেশের বাজার সয়লাব করছে কিছু পাকিস্তানি সিন্ডিকেট। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের সুবাস্তু অ্যারোমা সেন্টার, ধানমণ্ডির প্রিন্স প্লাজা ও গুলশানের পিংক সিটিতে নামে-বেনামে দোকান দিয়ে পাকিস্তানিরা কাপড় ব্যবসা করছে স্থায়ীভাবে। তাদের নেই ওয়ার্ক পারমিট। এসব কথিত ব্যবসায়ী হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে। এতে বছরে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানের ৬৩ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর বাড়ির ২/এ ফ্ল্যাটে অভিযান চালান শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। আবদুল হালিম পুরী নামের এক পাকিস্তানি ওই ফ্ল্যাটে কাপড় মজুদ করে অবৈধ ব্যবসা করে আসছিল।

জঙ্গিবাদের নেপথ্যে পাকিস্তানিরা : সূত্র জানায়, গত বছরের জুন-জুলাই মাস থেকে বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের এ দেশে আসার হার বেড়ে যায়। এদের মধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক এর আগে চার-পাঁচজন করে এ দেশে ভ্রমণ করেছে। অতীতে এত পাকিস্তানি নাগরিক ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশে আসেনি বলে জানিয়েছে দুটি গোয়েন্দা সংস্থা। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে গোয়েন্দারা এটি পর্যবেক্ষণে আনেন। অনুসন্ধানের পরে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছে, এসব পাকিস্তানি নাগরিকের অনেকেই আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গি। এ সময়ের মধ্যে আসা পাকিস্তানি নাগরিকদের অনেকেই বিমান থেকে নেমে ইমিগ্রেশনে অবতরণপত্রে বাংলাদেশে অবস্থানের যেসব ঠিকানা দিয়েছে সেখানে তাদের পাওয়া যায়নি।

সূত্র জানায়, গত বছরের ২৯ নভেম্বর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি নাগরিক ইদ্রিস শেখ ও মকবুল শরীফ এবং আটকে পড়া পাকিস্তানি সালাম ও পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মোস্তফা জামানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরে ইদ্রিস ও মকবুল ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তারা জানায়, জেএমবির জঙ্গিদের সহায়তা করার জন্যই তারা বাংলাদেশে আসে। তাদের সহায়তা করে ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি (রাজনৈতিক) ফারিনা আরশাদ। অভিযোগ ওঠার পর চাপের মুখে গত বছরের ডিসেম্বরে ফারিনা আরশাদকে প্রত্যাহার করে দেশে নিয়ে যায় সে দেশের সরকার।

সূত্রগুলো জানায়, ইদ্রিসের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় দেশ-বিদেশে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের কাজে ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী বিশেষ স্পাই মোবাইল ফোনসেট। ওই মোবাইল ফোনটির সঙ্গে ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাসের কর্মকর্তা ফারিনা আরশাদ ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন অসীমের মোবাইল ফোনের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। অসীম পাকিস্তানের একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।

সূত্র বলছে, ইদ্রিস ২০০৭ সালে বাংলাদেশে এসে জেএমবির সঙ্গে যোগ দেয়। ফারিনা ও অসীমের সহযোগিতায় গত দুই বছরে ৪৮ বার বাংলাদেশ-পাকিস্তান যাতায়াত করেছে ইদ্রিস। তার প্রধান কাজ ছিল বাংলাদেশে জেএমবির কার্যক্রম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা, জেএমবি সদস্যদের ছোট ছোট দলে পাকিস্তানে পাঠিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়ে আবার বাংলাদেশে ফেরত আনা। মূলত বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটানোর লক্ষ্যেই এ কাজ করছিল ইদ্রিসসহ অন্যরা। সেই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক নষ্ট করতেই পাকিস্তানে তৈরি জাল মুদ্রা বাংলাদেশে আনত। এসব জাল মুদ্রা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তপথে ভারতে পাঠানো হতো।

এদিকে রাজধানীর গুলশান এবং কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার সঙ্গে পাকিস্তানিদের যোগসাজশের বিষয়টিও নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা, তেহরিক-ই-তালেবান ও জইশ-ই-মোহাম্মদের যেসব সদস্য এর আগে বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছিল তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। গুলশান হামলার পর ‘দাওলাতুল ইসলামের’ ব্যানারে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এতে বাংলাদেশি তিন যুবক হামলার পক্ষে বক্তব্য দেয়। ফুটেজটি বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দারা বলছে, ছবির পেছনের দৃশ্যপট পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী কোনো অঞ্চলে হতে পারে। ওই তিন যুবকের মধ্যে তুষার জেএমবির অনুসারী বলে তথ্য পাওয়া গেছে। আরেক যুবক জুন্নুন শিকদার এবিটির এবং তাহমিদ শাফী হিযবুত তাহ্রীরের অনুসারী। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তে তথ্য মিলেছে—মধ্যপ্রাচ্যের দেশ দুবাই ও পাকিস্তান থেকে গুলশান হামলার সংগঠক তামিম চৌধুরীর কাছে অর্থ এসেছে। এর পেছনে কারা আছে সেটা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ’ তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, “গুলশান হামলার পর রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার করা ‘দাওলাতুল ইসলাম’ মতাদর্শী কয়েকজন জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। নব্য জেএমবির নিখোঁজ থাকা জঙ্গিরা পাকিস্তান ও মালয়েশিয়া হয়ে সিরিয়ায় প্রশিক্ষণে যাচ্ছে। অনেকের প্রশিক্ষণ হচ্ছে পাকিস্তানের কিছু এলাকায়। তামিম চৌধুরীসহ অন্য সংগঠকদের সঙ্গে পাকিস্তানি প্রশিক্ষক ও মদদদাতাদের যোগাযোগ আছে। আবার সিরিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে যারা বাংলাদেশে ঢুকেছে তাদের অনেকেই পাকিস্তান হয়ে এসেছে। আমরা গোটা বিষয়টিই বিশেষ নজরদারিতে রেখেছি। আর অবৈধ পাকিস্তানিই শুধু নয়, এ দেশে যারাই অবৈধভাবে আছে তাদের ধরতে অভিযান শুরু হবে। ” 

গত বছরের ১২ জানুয়ারি রাতে বনানীতে পাকিস্তান দূতাবাসের কর্মকর্তা মাযহার খান আরেক পাকিস্তানি মজিবুর রহমানের সঙ্গে গোপন বৈঠক করার সময় তাদের আটক করে গোয়েন্দারা। এরপর মাযহারকে ছাড়িয়ে নেয় ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাস। তবে অভিযোগ ওঠায় তাঁকে পাকিস্তান সরকার ফেরত নিয়েছে।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিজওয়ান আহমেদ নামের একজন পাকিস্তানিসহ জইশ-ই-মোহাম্মদের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ২০১২ সালে জইশ-ই-মোহাম্মদের অন্যতম সংগঠক মাওলানা ইউনূস আলী ধরা পড়ে। লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য বেলাল আহম্মেদকে ২০১১ সালে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর জামিনে ছাড়া পেয়ে তারা আত্মগোপনে আছে। প্রায় তিন বছর আগে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে পাকিস্তানি নাগরিক সৈয়দ আব্দুল কাইয়ুম আজহারি ওরফে সুফিয়ান, আশরাফ আলী জিহাদ ও মনোয়ার আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কয়েক মাস পরই জামিনে ছাড়া পেয়েছে তারা।

অন্যদিকে পাকিস্তানে বসবাসরত আল-কায়েদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইজাজ আহমদের সমর্থনে এ দেশে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কর্মকাণ্ড এগিয়ে যায়। তবে ওই ইজাজ মারা গেছে বলে প্রচার আছে। জেএমবির সাবেক আমির শায়খ রহমানের মেয়ে নাসরিন আখতার ও তার স্বামী জাভেদ আখতার পাকিস্তানের করাচি থেকে জেএমবির কার্যক্রমে সক্রিয় বলেও তথ্য আছে।

জাল রুপির কারবার নিয়ন্ত্রণে তারা : গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে জাল রুপি ছড়িয়ে দেওয়ার এক ধরনের কারবার পরিচালনা করছে পাকিস্তানিরা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সোনাও নিয়ে আসছে পাকিস্তানি চক্র। বাংলাদেশের রাজশাহী, যশোর, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়সহ সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এসব মুদ্রা ও সোনা ভারতে পাচার হয়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গত দুই বছরে ৩০ কোটির বেশি ভারতীয় জাল রুপি উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চালানটি পাওয়া যায় ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল। ওই দিন শাহজালালে ছয় কোটি ভারতীয় জাল রুপি উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গোয়েন্দাদের দাবি, পাকিস্তান থেকে আসা এসব মুদ্রা খুবই উচ্চ মানের ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা। এগুলো যে জাল, তা দেখে, এমনকি সাধারণ পরীক্ষায় বোঝার উপায় নেই।

চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁও থেকে জাল রুপিসহ পাকিস্তানি নাগরিক রেহমানকে আটক করে র‌্যাব। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর বিমানবন্দর থেকে আবদুল্লাহ সেলিম নামের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক পাকিস্তানি নাগরিকসহ ছয়জনকে এক কোটি জাল রুপিসহ আটক করে র‌্যাব। সূত্র জানায়, গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি ৭০ লাখ ভারতীয় জাল রুপিসহ আকরাম নামের এক পাকিস্তানি, ৩ ফেব্রুয়ারি এক কোটি রুপিসহ মোহাম্মদ আলী, ২০ নভেম্বর এক কোটি ১৭ লাখ রুপিসহ মোহাম্মদ সেলিম, ১৫ জানুয়ারি ৮০ লাখ রুপিসহ এমরান মোহাম্মদ, ১ ডিসেম্বর ৬০ লাখ এক হাজার রুপিসহ আইয়ুব আলী এবং এক কোটি ভারতীয় জাল রুপিসহ পাকিস্তানের নাগরিক রেহান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা দুবাই, করাচি, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসব মুদ্রা নিয়ে আসে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, পাকিস্তানের কাশ্মীরভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার শীর্ষ নেতা শাকিল মোহাম্মদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে জাল মুদ্রার ব্যবসা চলছে। ২০১৪ সালে আলাউদ্দিন নামে তার এক সহকারীকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এই সূত্রে গত বছর তিন পাকিস্তানিসহ এক ডজন জাল রুপির কারবারিকে ধরে ডিবি পুলিশ। তদন্তে মুদ্রাপাচারে সক্রিয় কয়েকজনের নামও উঠে আসে। তাদের মধ্যে পাকিস্তানের নাগরিক আবিল বশির, মইন উদ্দিন খন্দকার, ইমতিয়াজ আলম, ইমরান হোসেন, শামীম নাজ, সাজ্জাদুর রহমান, আবদুল্লাহ আল মামুন, করিম মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ মুনতাসির ও বাদল ফরাজী উল্লেখযোগ্য।

অন্যদিকে জাল টাকা তৈরি করার জন্য এখন পাকিস্তান থেকে বিশেষ কাগজ ও সুতা আনা হচ্ছে। আগে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা কাগজ প্রায় আসলের মতো দেখতে হলেও তাতে কিছু ত্রুটি ছিল। এবার টাকার আসল কাগজই জাল নোট চক্রের হাতে এসে পড়েছে। এসেছে উন্নত মানের সুতাও। সেগুলো এতটাই নিখুঁত যে জাল টাকা হিসেবে শনাক্ত করাই মুশকিল। গোয়েন্দারা বলছে, এই অপকর্ম পরিকল্পিতভাবে করেছে পাকিস্তানি সিন্ডিকেট।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বাণিজ্য চালাচ্ছে। ২০১৩ সালের ১১ জুন রাজধানীর কারওয়ান বাজারের লা-ভিঞ্চি হোটেল থেকে পেরুর নাগরিক হুয়ান পাবলো রাফায়েলকে তিন কেজি কোকেনসহ গ্রেপ্তার করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা। জিজ্ঞাসাবাদে পাবলো জানায়, কোকেনের পরবর্তী গন্তব্য ছিল পাকিস্তান। এর সূত্র ধরে মোস্তফা ও শামসুল হক নামের দুই পাকিস্তানিকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। ‘ক্রস ওসান প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের একটি কাপড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের আড়ালে তারা হেরোইন ও কোকেন পাচারের কারবার করছিল। মোস্তফার বাবা আশরাফ নাসিম ও সাদিক নামের আরেক ব্যবসায়ী ছিল তাদের সহযোগী, যারা পালিয়ে যায়।

একই বছরের ২ মার্চ গুলশান ও উত্তরা থেকে দুই কেজি হেরোইনসহ আকমল, তাহির রিয়াজ ও শওকত নামের তিন পাকিস্তানিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত পাঁচ বছরে নাইজেরিয়ানসহ বিদেশিদের কাছ থেকে বেশ কিছু হেরোইন ও কোকেন চালান জব্দ করা হয়, যেগুলোর পরবর্তী গন্তব্য ছিল পাকিস্তান।

শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মইনুল খান বলেন, ‘এরই মধ্যে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করে অবৈধভাবে ব্যবসা করে আসা পাকিস্তানি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আটক করেছি। এমন অবৈধ ব্যবসায়ীদের ধরতে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা সর্বোচ্চ সক্রিয় রয়েছেন। ’ তিনি আরো বলেন, ‘ভারতসহ বিভিন্ন দেশের জাল মুদ্রা তৈরির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটককৃতদের অধিকাংশই পাকিস্তানের নাগরিক। এগুলো নিখুঁতভাবে পাকিস্তানে তৈরি করে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারতে পাঠানো হয়। এসব বিষয়েও আমাদের তৎপরতা আছে। ’


মন্তব্য