kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কানাডা থেকে ফিরেই পাল্টে যান জাহিদুল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও কুমিল্লা   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কানাডা থেকে ফিরেই পাল্টে যান জাহিদুল

রাজধানীর রূপনগরের আস্তানার সেই জঙ্গি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম দুই দফায় কানাডা গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পরই বদলে যেতে থাকে তাঁর আচরণ।

পরিবারের নারী সদস্যদের কঠোর পর্দাপ্রথা মেনে চলতে বাধ্য করতেন তিনি। প্রাইভেট কার নিয়ে কুমিল্লার পশ্চিম চাঁন্দপুরের বাড়ি আসতেন। তবে বাসা থেকে তেমন বের হতেন না। সর্বশেষ সাত-আট মাস আগে তাঁকে বাড়িতে দেখা গিয়েছিল। স্থানীয় লোকজন ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।    

জানা গেছে, রাজধানীর রূপনগরে পুলিশের অভিযানে নিহত জাহিদুল একসময় সেনাবাহিনীতে মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন। তবে পারিবারিক সমস্যার কারণ উল্লেখ করে গত বছর জুলাইয়ে স্বেচ্ছায় অবসর নেন তিনি।

স্থানীয়রা জানায়, সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর দুই দফায় কানাডা যান জাহিদুল। কুমিল্লা সদরের পশ্চিম চাঁন্দপুরের স্কুল রোডে ‘ড্রিমস’ নামের তিনতলা একটি বাড়ির দোতলায় বসবাস করেন জাহিদুলের বাবা মোহাম্মদনূরুল ইসলাম। চট্টগ্রাম পুলিশের রিজার্ভ ইন্সপেক্টর (আরআই) ছিলেন তিনি। ৩০ বছর ধরে তিনি ওই বাড়িতে বসবাস করছেন। তাঁর তিন সন্তানের মধ্যে জাহিদুলই বড় ছিলেন।  

গতকাল রবিবার ওই বাড়িতে গেলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভাড়াটিয়া জানায়, জাহিদুল মাঝে মাঝে বাড়ি আসতেন। সর্বশেষ সাত-আট মাস আগে এসেছিলেন। তবে বাসায় এলে কোথাও বের হতেন না। এক বছরের বেশি সময় আগে একবার এবং কয়েক মাস আগে একবার তিনি কানাডা গিয়েছিলেন।

প্রতিবেশীরা জানায়, কানাডা থেকে ফেরার পর ব্যাপক পরিবর্তন আসে জাহিদুলের মধ্যে। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে ধর্মীয় অনুশাসনে চলতে বাধ্য করেন তিনি। স্ত্রীকে বলতেন চোখ ছাড়া আর কিছু দেখা যাবে না—এমন পোশাক পরতে। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্বও হয়। শ্বশুরবাড়ির লোকজন এমন বিধিনিষেধের কথা শুনে আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু জাহিদুল সে আপত্তিকে পাত্তা দেননি।  

গতকাল বাড়িটির দোতলার সব দরজা তালাবদ্ধ দেখা যায়। অন্য ভাড়াটিয়ারা জানায়, গত শুক্রবার সকালে হার্টের চিকিৎসার কথা বলে জাহদুিলের বাবা মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী ঢাকা গেছেন। এখনো ফেরেননি।

এলাকাবাসী জানায়, জাহিদুল বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ৪৩ লং কোর্সের প্রশিক্ষণ শেষে ২০০০ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন পান। অবসর নেওয়ার আগে পদাতিক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন তিনি। রূপনগরে অভিযানের পর পত্রপত্রিকায় নিহত জঙ্গির যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে তা জাহিদুলেরই। গত কোরবানি ঈদে তিনি বাড়ি এসেছিলেন। একটি প্রাইভেট কার নিয়ে বাড়ি আসতেন। কিন্তু বাসা থেকে তেমন বের হতেন না। সর্বশেষ সাত-আট মাস আগে তাঁকে পশ্চিম চাঁন্দপুরে দেখা গিয়েছিল।

স্থানীয়রা জানায়, জাহিদুলদের আসল বাড়ি ছিল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে। ১৯৮৫ সালে জাহিদুলের বাবা পশ্চিম চাঁন্দপুর স্কুল রোডে বাড়ি করেন। ছেলের বিষয়ে তাঁর বাবা নূরুল ইসলাম স্থানীয়দের বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে জাহিদুল কানাডায় গেছে।

ড্রিমস নামের ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া আবদুল বারেক, জয়নাল আবেদীন ও তন্বী আক্তার জানান, তাঁরা জাহিদুলকে ওই বাড়িতে খুব কমই দেখেছেন। কেননা তিনি আসার পর বাড়ি থেকে তেমন একটা বেরই হতেন না।

কুমিল্লার এসপি শাহ আবিদ হোসেন বলেন, ‘জাহিদের বাবা নূরুল ইসলাম সর্বশেষ চট্টগ্রাম থেকে অবসরে যান। তিনি সেখানে আরআই ছিলেন। এলাকার লোকজন তাদের পরিবার সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। কারণ তারা অন্য জায়গা থেকে এসে এখানে (কুমিল্লা) স্থায়ী হয়েছে। আমরা তার সম্পর্কে আরো অনুসন্ধান করছি। ’ 

জাহিদুল সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে তাঁদের বাড়ি গিয়েছিলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই শাহীন। তিনি জানান, ছবি দেখে স্থানীয়রা নিহত জঙ্গিকে জাহিদুল বলে শনাক্ত করেছে।

আইএসপিআরের বক্তব্য : রূপনগরে পুলিশের অভিযানে নিহত জঙ্গি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম সেনাবাহিনীর অবসরপাপ্ত মেজর কি না—এ প্রশ্নে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশিদুল হাসান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই নামে মেজর পদবির একজন কর্মকর্তা গত বছর জুলাইয়ে পারিবারিক সমস্যার কারণ উল্লেখ করে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়ার পর তাদের সম্পর্কে সেনাবাহিনী কোনো খোঁজখবর রাখে না। এ কারণে তাঁর (জাহিদুল) জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে সেনা কর্তৃপক্ষ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ’ জাহিদুলের যে পারিবারিক পরিচয়, ঠিকানা ও ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সেই ব্যক্তিই গত বছর স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া ওই মেজর বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার রাতে মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকার ৩৩ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর ভবনে পুলিশের অভিযানে নিহত হন জাহিদুল। তাঁকে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা নিহত তামিম চৌধুরীর অন্যতম সহযোগী ও সামরিক প্রশিক্ষক বলে দাবি করে পুলিশ। তামিমও একসময় কানাডায় ছিল। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় পুলিশের অভিযানে আরো দুই জঙ্গির সঙ্গে তামিম নিহত হয়।   

এখনো অপেক্ষায় পুলিশ : পুলিশ প্রথমে রূপনগরে নিহত জঙ্গিকে ‘জঙ্গি মুরাদ’ বলে পরিচয় দিয়েছিল। গতকাল দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, নিহত ‘মুরাদ’ আর্মি থেকে অবসর নেওয়ার পর জঙ্গিবাদে তত্পর ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। গত এপ্রিল থেকে মুরাদ তাঁর গ্রামের বাড়ির আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন বা যোগাযোগ বন্ধ করে জিহাদে অংশ নেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। এর পর থেকে তিনি কারো সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগ রাখতেন না। মুরাদের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশ যতটুকু জানতে পেরেছে, সে অনুযায়ী মুরাদের আসল নাম জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। তাঁর বাড়ি কুমিল্লায়।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, নিহত জঙ্গি সাবেক সেনা সদস্য হলেও তিনি কোন র্যাংকের কর্মকর্তা ছিলেন তা জানা যায়নি। তাঁর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য খোঁজা হচ্ছে।

জাহিদুল সম্পর্কে তথ্য জানতে গতকাল রাত ৯টার দিকে রাজধানীর শ্যামলী এলাকার একটি বাসা থেকে তাঁর শ্বশুর ও শাশুড়িকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে রূপনগর থানা পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আহমেদ এ তথ্য জানিয়েছেন।

অভিযান চলবে : পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, ‘জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে। জঙ্গিবাদ দমনে পুলিশ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবে। ’ গতকাল দুপুরে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে রূপনগর থানার ওসি সৈয়দ শহীদ আলম এবং পরিদর্শক (তদন্ত) শাহীন ফকিরকে দেখতে গিয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি। শহীদ আলম ও শাহীন ফকির রূপনগরে অভিযানের সময় আহত হন।


মন্তব্য