kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সম্পদ বাজেয়াপ্তে হতে পারে নতুন আইন

আবুল কাশেম ও রেজাউল করিম   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সম্পদ বাজেয়াপ্তে হতে পারে নতুন আইন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খলনায়ক এডলফ হিটলারের আয়ের একটি বড় উৎস ছিল তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘মাইন কম্ফ’ বা ‘আমার লড়াই’। জার্মানির রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার আগে এ বই বিক্রির অর্থ দিয়েই তাঁর ব্যয়ের বড় অংশ মেটানো হতো।

বইটির এক কোটি কপি বিক্রি হয়েছিল হিটলারের জীবদ্দশায়ই। এখনকার হিসাবে বইটি থেকে রয়ালটি বাবদ আয় হতো বছরে এক কোটি ২০ লাখ ডলার। এ ছাড়া ডাকটিকিট ও পোস্টারে তাঁর ছবি ব্যবহারের জন্য জার্মান সরকারের কাছ থেকে রয়ালটি নিতেন তিনি। এর বাইরে বিশ্বের নামিদামি চিত্রকর্মের বড় সংগ্রহ ছিল তাঁর নিজের। ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল আত্মহত্যা করার আগে তাঁর এসব সম্পত্তির মূল্য ছিল বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ৫০০ কোটি ডলার। হিটলারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ সম্পদে তাঁর কয়েক প্রজন্ম চলতে পারত স্বচ্ছন্দেই। তবে হিটলারের আত্মহত্যার পর একমাত্র বৈধ উত্তরাধিকার বলে স্বীকৃত তাঁর এক ভাগ্নে ওই সম্পদের উত্তরাধিকার হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। সেসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে হিটলারের নিজের প্রদেশ বাভারিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। পরে ওই সম্পত্তি দেওয়া হয় স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। যুদ্ধবাজ হিটলারের বইয়ের বাজার ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও। যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের ‘ট্রেডিং উইথ এনিমি অ্যাক্ট’-এর আওতায় হিটলারের বইয়ের রয়ালটি বাবদ তখনকার আড়াই লাখ ডলার বাজেয়াপ্ত করে যুদ্ধকালীন শরণার্থীদের কল্যাণে বিতরণ করেছিল। যুক্তরাজ্যেও তাঁর বই বিক্রির রয়ালটির অর্থ বাজেয়াপ্ত করে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে দিয়ে দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ায় হিটলারের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা সহজ হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে জনমতও ছিল এর পক্ষে।

স্বাধীনতার পর শত্রুপক্ষের ফেলে যাওয়া সম্পদ জাতীয়করণের লক্ষ্যে আইন হয়েছিল বাংলাদেশে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধ এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার লক্ষ্যেও আইন করা হয়েছিল ১৯৭৩ সালেই। দেশি-বিদেশিদের বাধা পেরিয়ে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়াই তখন মূল লক্ষ্য হওয়ায় ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে অপরাধীদের সম্পদ  বাজেয়াপ্ত করার বিধান সংযুক্ত করা হয়নি। ওই আইনেই বিচারকাজ শুরু হয়েছে স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর। একাত্তরের জল্লাদ আলবদর বাহিনীর তৃতীয় শীর্ষ নেতা ও পরবর্তীকালে জামায়াতের বিজনেস টাইকুন মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগে ও পরে বাংলাদেশেও যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যয় করার জোর দাবি উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংশোধন করে বা নতুন আইন প্রণয়ন করে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে সরকারের দিক থেকেও চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা।

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের সম্পদ বাজেয়াপ্তির বিষয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দাবিও রয়েছে। একটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এটি করতে হবে। ’

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেছি, যাতে যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে আইন সংশোধন বা নতুন আইন করা হয়। ’ তিনি বলেন, ওই অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যয় করবে সরকার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন আইন করে বা সরকার নির্বাহী আদেশ জারি করেও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে। তবে তা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংশোধন করে দণ্ডিত অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিধান যুক্ত করা। এতে কোনো ধরনের আইনি জটিলতা থাকবে না। কারণ সংবিধানের ৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, ওই আইনের কোনো কিছুই চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। যুগোস্লাভিয়া ও রুয়ান্ডায় যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিধান তাদের আইনেই আছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরে বিশ্লেষকরা বলেন, মীর কাসেম আলী শুরুতে এই বিচার বানচাল করার এবং পরে নিজের বিচার ঠেকাতে বিদেশি লবিস্টদের পেছনে বিপুল অর্থ খরচ করেছেন। জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কার্যক্রমসহ দেশবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পদের একটি অংশ খরচ হতো। তাঁর রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি ভবিষ্যতেও সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা আছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীরও বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে। এসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের কল্যাণে ব্যয় করার দাবি করেছেন বিশ্লেষকরা।

২০০২ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া ‘রোম স্ট্যাচুট অব দি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট’-এর ৭৯ অনুচ্ছেদে একটি ট্রাস্ট গঠন করার কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে বা আদালতের মাধ্যমে জরিমানা আরোপ করে ওই সব অর্থ ট্রাস্টের তহবিলে জমা করে তা দিয়ে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করার কথা বলা আছে। বাংলাদেশ এই রোম স্ট্যাচুটে সই করেছে ১৯৯৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। পরে ২০১০ সালের ২৩ মার্চ এটি অনুমোদন করে ওই বছরের ১ জুন থেকে কার্যকর করেছে বাংলাদেশ। এর আওতায়ও মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, দুটি কারণে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা উচিত। একটি নৈতিক কারণ। দ্বিতীয়ত এসব সম্পত্তি, টাকা-পয়সা সন্ত্রাসী কাজে ব্যয় হওয়ার আশঙ্কা। মানবতাবিরোধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে নতুন আইন করতে হবে অথবা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন-১৯৭৩ সংশোধন করে নতুন একটি ধারা সংযোজন করতে হবে। তাতে বলা হবে, যাঁরা সাজা পেয়েছেন বা এই আইনে সাজা পাবেন, তাঁদের সবার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি নিয়োজিত হবে যুদ্ধের সময় যেসব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের কল্যাণে, তাদের উত্তরাধিকারীদের কল্যাণে। তিনি বলেন, আইন সংশোধন করে এমন ধারা সংযোজন করা হলে তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, এ আইনকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। তাই নিশ্চিন্তে এটা করা যেতে পারে। এমন নজির নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল, রুয়ান্ডা, যুগোস্লাভিয়ার আইনেও আছে।

সাবেক এই বিচারপতি আরো বলেন, মানবতাবিরোধীদের সব উপার্জন অবৈধ। এ কারণে এসব সম্পত্তি তাঁদের উত্তরাধিকারীরা ভোগ করবেন—এটা হতে পারে না।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, একটি আইন করে সরকার মীর কাসেমসহ দণ্ডিত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে অথবা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনেও দণ্ডিতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান সংযোজন করতে পারে। এটিই ভালো হবে। কারণ আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ দ্বারা সুরক্ষিত। এ আইনে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তির বিধান যোগ করলে কেউ সেটি চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যেতে পারবে না। সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তির উদ্যোগ নিলে তা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে দণ্ডিতদের স্বজনরা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মীর কাসেমে আলীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম কৌঁসুলি ড. তুরিন আফরোজ কালের কণ্ঠকে বলেন, রোম স্ট্যাচ্যুট অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজে ব্যয় করতে পারে সরকার। এ ছাড়া যুগোস্লাভিয়া ও রুয়ান্ডায় যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে তাদের আইনে বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী সেখানে বিচার হচ্ছে। সেখানে অনেকের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তও করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করা মীর কাসেম, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অন্যদের সম্পত্তি এখনই বাজেয়াপ্ত করা যাবে না। কারণ তাঁদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল বা আপিল বিভাগের রায়ে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তির কথা বলা নেই। তাই সরকারের নির্বাহী আদেশে বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব। কারণ সংবিধান রাষ্ট্রকে এই এখতিয়ার দিয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংশোধনের মাধ্যমেও এই সম্পত্তি বাজেয়াপ্তির বিধান করা সম্ভব। ’

এই প্রসিকিউটর বলেন, সম্পদ বাজেয়াপ্ত না করলে মীর কাসেম-সাকার বংশধররা তা দেশের বিরুদ্ধে কাজে লাগাবে। এখনো এই কাজ করছে তারা। তাই নির্বাহী আদেশে বা আইন সংশোধন করে মীর কাসেমসহ দণ্ডিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধীর সম্পদ বাজেয়াপ্তির দাবি জানান তুরিন আফরোজ।

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মীর কাসেম আলীসহ সব যুদ্ধাপরাধীর সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। শহীদ পরিবারের মাঝে সেই সম্পদ বিতরণ করতে হবে। আর এ বিষয়ে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করতে হবে। ’ তাঁদের টাকার উৎস ধ্বংস করা না হলে হাজার হাজার মীর কাসেম তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।

শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে মীর কাসেম বা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অন্য যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধের সাজা শেষ হয়ে যায়নি। এখন এ অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে। ’


মন্তব্য