kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গণহত্যায় সম্পৃক্ততা স্পষ্ট করল পাকিস্তান

মেহেদী হাসান   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



গণহত্যায় সম্পৃক্ততা স্পষ্ট করল পাকিস্তান

‘গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে যে মীর কাসেম আলীর গত শনিবার ফাঁসি কার্যকর হলো, সে ছিল বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশের প্রকাশ্য আদালতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তার অপরাধের বিচার ও রায় কার্যকর করা হয়েছে।

তবু তার জন্য সমবেদনা জানিয়ে পাকিস্তান মীর কাসেম আলীর মতো যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের গণহত্যাযজ্ঞের সঙ্গে নিজেদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততাই স্পষ্ট করেছে। ’ মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর নিয়ে ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া দেখানোর পর গতকাল রবিবার দুপুরে বাংলাদেশ সরকার ঢাকায় পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার সামিনা মেহতাবকে তলব করে এসব কথা বলেছে।

বাংলাদেশ পাকিস্তানকে কড়া বার্তা দিয়ে বলেছে, আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া সংগত মনে করেছেন এবং এ বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। পাকিস্তানের বিবৃতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সুস্পষ্ট হস্তক্ষেপ এবং তা কোনোভাবেই বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত গত সপ্তাহে মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে মীর কাসেম আলীর করা আবেদন খারিজ করে দেওয়ার পরই পাকিস্তান এ দেশের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করে। সে সময় পাকিস্তান কোনো কারণ উল্লেখ না করলেও ফাঁসি কার্যকরের পর আর নীরব থাকতে পারেনি। গত শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের পর গভীর রাতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ

 নিয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় এবং মীর কাসেমের পরিবারকে সমবেদনা জানায়। পাকিস্তানের এমন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে আবদুল কাদের মোল্লা থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রত্যেক যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রেই। এ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে খোদ পাকিস্তানেই সমালোচনার ঝড় ওঠে। পাকিস্তানের প্রগতিশীল বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, এ ধরনের বিবৃতি দিয়ে পাকিস্তান সাজাপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততারই প্রমাণ দিয়েছে।

গত শনিবার রাতে পাকিস্তানের বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকার গতকাল রবিবার দুপুরে ঢাকায় পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার সামিনা মেহতাবকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে। বাংলাদেশের পক্ষে অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিব (দ্বিপক্ষীয় ও কনস্যুলার) কামরুল আহসান একটি ‘নোট ভারবাল’ (কূটনৈতিক বার্তা) পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারের হাতে তুলে দেন। এ সময় তাঁরা প্রায় ২০ মিনিট বৈঠক করেন।

পাকিস্তানকে বাংলাদেশ কী বলেছে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিব (দ্বিপক্ষীয় ও কনস্যুলার) কামরুল আহসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাকিস্তান মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে যে মতামত দিয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। তাঁর বিচার অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়েছে এবং সেই বিচার সবার সামনেই হয়েছে। বিচারে তাঁর আপিল করার সুযোগ ছিল এবং তিনি আপিল করেছিলেন। সর্বোচ্চ আদালত মনে করেছেন, একাত্তরে বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যায় যে অংশগ্রহণ করেছেন এটি তাঁর প্রাপ্য শাস্তি এবং এ বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের মতামত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ’

পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব বিষয়ে গতকাল বিকেলে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে। পাকিস্তানকে দেওয়া নোট ভারবালে বলা হয়েছে, পাকিস্তান বারবার গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত বাংলাদেশিদের পক্ষ নিয়ে আবারও স্বীকার করছে যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যায় পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছিল। এ কারণেই বাংলাদেশ যখন ৪৫ বছর আগের অপরাধের দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে তখন পাকিস্তান অব্যাহতভাবে এর বিরোধিতা করে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার করছে বলে পাকিস্তান যে অভিযোগ করেছে তা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ সরকার। রাজনৈতিক পরিচয় বা সম্পৃক্ততা নয়, বরং ১৯৭১ সালে মীর কাসেম আলীর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আমলে নিয়েছেন।

নোট ভারবালে বাংলাদেশ বলেছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে গণহত্যা পরিকল্পনা, প্ররোচনা, বাস্তবায়ন, হত্যা, নির্যাতনসহ আরো অন্যান্য অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে বাংলাদেশ স্পষ্ট জানিয়েছে, মীর কাসেম আলী ছিলেন ১৯৭১ সালে ইসলামী ছাত্রসংঘের জেনারেল সেক্রেটারি এবং কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর তৃতীয় শীর্ষ নেতা। মীর কাসেম আলী কেবল ১৯৭১ সালে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অপরাধের সহযোগীই ছিলেন না, বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের নিধনে আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠার অন্যতম হোতাও ছিলেন।

পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে বাংলাদেশ স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে পাকিস্তান অব্যাহতভাবে ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অংশবিশেষ তুলে ধরে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার পরিকল্পনাকারী ও হোতাদের দায়মুক্তির কথা সেখানে বলা হয়নি। তা ছাড়া বাংলাদেশ নিজের নাগরিকদের গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে পারবে না, এটিও ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে নেই।

১৯৭১ সালে গণহত্যায় জড়িত পাকিস্তানিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে না পারার বিষয়টিও বাংলাদেশ পাকিস্তানি ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১৯৭৪ সালের যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির দোহাই দিয়ে পাকিস্তান বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা করছে সেই চুক্তি কেবল ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর পাকিস্তানে প্রত্যাবাসনের মধ্যেই সীমিত ছিল। সেখানে কোথাও রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের দায়মুক্তির কথা বলা হয়নি। ১৯৭৪ সালের ওই চুক্তির পরও বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি যুদ্ধাপরাধী বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে ছিল। পাকিস্তান তখন ১৯৭৪ সালের চুক্তির অজুহাত তুলে তাদের বিচার নিয়ে উদ্বেগ জানায়নি। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর বাংলাদেশের কারাগারে আটক ওই যুদ্ধাপরাধীরা মুক্তি পায়। তাই ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অজুহাতে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা ও অপব্যাখ্যা ঢাকার কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশ মনে করে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ও সেগুলো বাস্তবায়নের বিরোধিতা করে পাকিস্তান বাংলাদেশের জনগণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অসম্মান করেছে। বাংলাদেশের কোনো প্রতিবেশীর কাছ থেকে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে বাংলাদেশের জনগণের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে কেবল ন্যায়বিচার নিশ্চিতের মাধমেই তা প্রশমিত হতে পারে।

বাংলাদেশ জোর দিয়ে বলেছে, অন্য কোনো দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে মন্তব্য করার কোনো অধিকার পাকিস্তানের নেই। মানবাধিকারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পরিস্থিতিই যখন বিশ্বের কাছে উদ্বেগের কারণ, তখন অন্য দেশের মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে পাকিস্তানের মন্তব্য নিছক প্রহসন ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। পাকিস্তানের বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে অবহিত করার আহ্বান জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার সামিনা মেহতাবকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার আশা করে যে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ ও সব মহল দায়িত্বশীল আচরণ করবে এবং অযাচিত বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে এমন একসময় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করল যখন কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সঙ্গেও উত্তেজনা চলছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এ উত্তেজনা আগামী নভেম্বর মাসে পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) ১৯তম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। রীতি অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে আগ্রহী না হলে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় না। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশ পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে।

পাকিস্তান জামায়াতের আস্ফাালন : এদিকে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর ডাকে গতকাল রবিবার ইসলামাবাদে মীর কাসেম আলীর গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীকে আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রতিবাদে পাকিস্তান জামায়াতের প্রধান সিরাজুল হক আগামী বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে অবস্থান কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন।

তুরস্কের বিবৃতি : তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে মীর কাসেম আলীকে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্য ও শীর্ষ অর্থায়নকারী হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে দুঃখ প্রকাশ করেছে। তুরস্কের বিবৃতিতে বলা হয়, অতীতের ক্ষত এ প্রক্রিয়ায় প্রশমিত হবে না এবং এই ‘ভুলচর্চা’ ভ্রাতৃপ্রতিম বাংলাদেশিদের মধ্যে বিভাজন ঘটাবে না বলে তুরস্ক মনে করে।

উল্লেখ্য, গত ১১ মে যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও তুরস্ক বিবৃতি দিয়েছিল। সেই বিবৃতিতে তুরস্ক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নিন্দা জানালেও গতকালের বিবৃতিতে নিন্দার বিষয়টি উল্লেখ নেই। নিজামীর ফাঁসির পরপরই প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরামর্শের জন্য রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়েছিল তুরস্ক। এর তিন মাস পর তুরস্ক তার রাষ্ট্রদূতকে নিজে থেকেই ঢাকা ফেরত পাঠায়।

১১ মের বিবৃতিতে তুরস্ক নিজেদের মৃত্যুদণ্ডবিলোপকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। কিন্তু গতকালের বিবৃতিতে তা উল্লেখ নেই। গত ১৫ জুলাই তুরস্কে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার অভিযোগে দেশটি নিজে এখন মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।


মন্তব্য