kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কালের কণ্ঠকে মাইকেল কুগেলম্যান

হিলারি জয়ী হলে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেবেন

ট্রাম্প জিতলে কী হবে কেউ জানে না

মেহেদী হাসান   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



হিলারি জয়ী হলে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেবেন

হিলারি ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ওবামা প্রশাসনের নীতি অব্যাহত রাখবেন বলে মনে করেন ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রভাবশালী নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট মাইকেল কুগেলম্যান। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কী হবে সে বিষয়ে কারো ধারণা নেই বলে কুগেলম্যান জানান।

মাইকেল কুগেলম্যান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বিষয়ে গবেষণা করেন। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন, সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে তাঁর লেখা নিবন্ধ নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়।

আগামী ৮ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ওই নির্বাচনের ফল বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে মাইকেল কুগেলম্যান গত শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ খুব কমই জ্বলন্ত ইস্যু হয়েছে। ভৌগোলিক গুরুত্ব ও অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র কেন বাংলাদেশের প্রতি যথার্থ দৃষ্টি দেয় না সে ব্যাপারে আমি অনেক আগে থেকেই উদ্বিগ্ন। ’ তিনি বলেন, ‘তবে ওবামা প্রশাসনের ক্ষমতার শেষ সপ্তাহগুলোতে ঢাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জন কেরির (যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) বাংলাদেশ সফর ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সফরে বাংলাদেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আবার একই সঙ্গে জোরালো দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বিশেষ করে অর্থনৈতিক বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ’

কুগেলম্যান মনে করেন, ওবামার আমলের হোয়াইট হাউসের সঙ্গে হিলারি ক্লিনটনের দীর্ঘ সম্পৃক্ততা থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ওবামা প্রশাসনের নীতিই অনুসরণ করে যাবেন। তিনি বলেন, ‘হিলারি প্রেসিডেন্ট হলে বাংলাদেশের সঙ্গে পরিমিত মাত্রায় যোগাযোগ থাকবে এবং সন্ত্রাসবাদের সমস্যা জোরালো হলে এ যোগাযোগ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। এটিই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ’

কুগেলম্যান বলেন, ‘আমরা যদি ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাই তাহলে সব বাজি ধরা বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি এমনই এক অনিয়ন্ত্রিত ব্যক্তি যে কেউ জানে না কোনো বিষয়ে তাঁর নীতি কী হবে। ’

কুগেলম্যান আরো বলেন, ‘আমি ধারণা করতে পারি, বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কমানোর সার্বিক নীতির অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট (নির্বাচিত হলে) ট্রাম্প বাংলাদেশের সঙ্গেও সম্পর্ক কমাতে চাইতে পারেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প আরো অন্তর্মুখী নীতি অনুসরণের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে তিনি তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকার হোয়াইট হাউসের নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করবেন কি না সেটি নিয়েও প্রশ্ন আছে। ’

কুগেলম্যান বলেন, ‘বাংলাদেশের শ্রম অধিকার ইস্যুতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য রয়েছে। আমি মনে করি, শ্রম খাতে অনিয়মের জন্য রিপাবলিকান প্রশাসনের চেয়ে ডেমোক্র্যাট প্রশাসন বাংলাদেশকে শাস্তি দিতে বেশি আগ্রহী। ’

সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ বৈশ্বিক সমস্যা হলেও বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেন বাড়তি উদ্বেগ দেখাচ্ছে জানতে চাইলে মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, খুব সাম্প্রতিক সময়ের আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষভাবে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল না। বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রবাদীরা আরো সক্রিয় ও ক্ষমতাধর হলেও, এমনকি তারা সুনির্দিষ্টভাবে বিদেশিদের লক্ষ্য করলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ অঞ্চলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের ওপরই আগে থেকে দৃষ্টি রাখছিল। তিনি বলেন, ‘আমি বলব যে ওয়াশিংটন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন এক রকম চোখ বন্ধ করেই ছিল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশে সন্ত্রাসের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে। গত জুলাইয়ে ঢাকায় রেস্তোরাঁয় হামলার পরই তাদের দৃষ্টি খুলেছে। ’

কুগেলম্যানের মতে, বাংলাদেশে সন্ত্রাস নিয়ে বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের বর্তমান উদ্বেগের বেশ কিছু কারণ আছে। এর একটি হলো বিদেশিরা হামলার লক্ষ্য হওয়া। জুলাইয়ে হামলা এবং এর আগেও একাধিক ঘটনায় বিদেশিদের হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিদেশিদের ওপর হামলার পর নিজেদের জন্য সরাসরি হুমকি মনে করেই কেবল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন হয়নি, এর অর্থনৈতিক প্রভাবও আছে। মূলত পোশাকশিল্পের কারণে বাংলাদেশে ব্যাপক পরিসরে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রয়েছে। ’ পোশাকশিল্পে সম্পৃক্ত আমেরিকানদের সঙ্গে কথা বলে কুগেলম্যান জেনেছেন, তারা সত্যিই উদ্বিগ্ন। ভয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে কুগেলম্যানের প্রশ্ন থাকলেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ যথেষ্ট বাস্তব বলেই তিনি মনে করেন।

কুগেলম্যানের মতে, আইএস ফ্যাক্টর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের আরেকটি কারণ। তিনি বলেন, “ঢাকা অস্বীকার করতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশি উগ্রবাদীরা যে অন্তত আইএস দ্বারা অনুপ্রাণিত সে বিষয়টি স্পষ্ট এবং খুব সম্ভবত তারা আইএসকে সহযোগিতাও করেছে। বর্তমান দিনগুলোতে ‘আইএস’ শব্দটি শুনলেই বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের রাজধানীই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। ” তৃতীয় কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত সমস্যা আরো অবনতির দিকেই যাচ্ছে। ওয়াশিংটন ও বিশ্বের অন্যত্র ধারণা করা হয়, সমস্যা মোকাবিলায় ঢাকার কোনো পরিকল্পনা নেই। ঢাকা এ সমস্যাকে খুব বড় করে না দেখার চেষ্টা করছে এবং সন্ত্রাস যে বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে এটিও তারা অস্বীকার করছে। ’


মন্তব্য