kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রূপনগরে নিহত জঙ্গি কুমিল্লার জাহিদুল

জাহাঙ্গীর ওরফে মুরাদ নাম নিয়েছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



রূপনগরে নিহত জঙ্গি কুমিল্লার জাহিদুল

অবশেষে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে অভিযানে নিহত জঙ্গির পরিচয় মিলেছে। গতকাল শনিবার রাতে পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই জঙ্গির আসল নাম মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম।

তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা সদরের পাঁচথুবি চাঁদপুর এলাকায়। জাহিদুলের বাবার নাম মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম। মায়ের নাম জেবুন্নাহার ইসলাম।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘জাহিদুল ইসলামই নাম পরিবর্তন করে জাহাঙ্গীর ওরফে মুরাদ বলে জেএমবি সদস্যদের জন্য বাসা ভাড়া করে দিত। সে কখনো ওমর, কখনো রনি, কখনো মুরাদ পরিচয় দিত। মিরপুরের রূপনগর এলাকার ৩৩ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর ওই বাসাটিও সে জাহাঙ্গীর নামেই ভাড়া নেয়। নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়া ও কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানাও জাহাঙ্গীর নামে ভাড়া নিয়েছিল এই জাহিদুল। ’

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গতকাল জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য আঙুলের ছাপ নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দেখা হয়। গত রাতে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম নামের এই ব্যক্তির জন্ম ১৯৭৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। তার পেশার স্থানে সরকারি চাকরি লেখা রয়েছে। ভোটার নম্বর ২৬০৯৬২০০০০৭২। তার জন্ম রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০২০০৭১৯৫০০৬০৩৬১৫৪। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক। থুঁতনির নিচে কাটা দাগ রয়েছে। রক্তের গ্রুপ ‘এ’ পজিটিভ। ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর-সিপি ০১৬৫৬৯৩ এইচএস। পাসপোর্ট নম্বর-ওএ ৬০১২৫৬৬। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারে তার বর্তমান ঠিকানা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত পল্লবী থানার মিরপুর ক্যান্টমেন্ট হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, যার ওয়ার্ড নম্বর ৬। বাসা-৪২৩/৯ অফিসার্স কোয়ার্টার।

গুলশান, কল্যাণপুর ও নারায়ণগঞ্জে নিহত জঙ্গিদের মতোই জাহিদুলের লাশ পড়ে আছে মর্গে। গতকাল পর্যন্ত তার কোনো স্বজন সেখানে যায়নি।

এদিকে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া আহত পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রূপনগর থানার ওসি সৈয়দ সহিদ আলম ও পরিদর্শক (তদন্ত) শাহীন ফকিরের দেহে সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে। গতকাল তাঁরা স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকলেও শঙ্কামুক্ত ছিলেন। অভিযানের ঘটনায় রূপনগর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জনসচেতনতামূলক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জঙ্গি তৎপরতায় জড়িতদের প্রতি আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার মতো রূপনগরের নিহত জঙ্গি নেতাকেও আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমরা নিহত জঙ্গিকে জীবিত গ্রেপ্তার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অভিযানের সময় পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে জঙ্গিরা হামলা শুরু করে। পরে বাধ্য হয়ে পুলিশ কাউন্টার অ্যাটাক করেছে। এতে ওই জঙ্গি মারা যায়। ’ আহত পুলিশ সদস্যদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযানের সময় চার পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁদের প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

গত শুক্রবার রাত ৩টার দিকে জাহিদুলের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নেওয়া হয়। গতকাল দুপুরে তার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। পরে হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিহত জঙ্গির মাথায় লেগেছে তিনটি গুলি। বাকি ছয়টি গুলি শরীরের বিভিন্ন স্থানে। তবে সব কটি গুলিই শরীরে ঢুকে বেরিয়ে গেছে। ’

এদিকে গতকাল দুপুরে নিহত জঙ্গির আঙুলের ছাপ মিলিয়ে নিতে নির্বাচন কমিশনের দুই কর্মকর্তা ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে যান। তাঁরা হলেন টেকনিক্যাল সাপোর্ট শাখার মো. পারভেজ হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি বিভাগের শামীম আহমেদ। তাঁরা ওই যুবকের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, এনআইডির তথ্যভাণ্ডার থেকে এই আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দেখা হবে। শেষ পর্যন্ত রাতে তার পরিচয় মেলে।

ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, অভিযানে গিয়ে গুরুতর আহত রূপনগরের ওসি সৈয়দ সহিদ আলম ও পরিদর্শক (তদন্ত) শাহীন ফকিরের দেহে সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর তাঁরা শঙ্কামুক্ত হয়েছেন। তাঁরা স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সহিদের কোমরে এবং শাহীনের বাঁ কাঁধ ও মাথায় ধারালো অস্ত্রের জখম রয়েছে। শাহীনের ডান পায়েও জখম রয়েছে।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আহমেদ জানান, শুক্রবার রাতে রূপনগরে অভিযানের ঘটনায় স্থানীয় থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনা অন্যান্য জঙ্গি হামলার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে এ ব্যাপারে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট তদন্ত শুরু করে দিয়েছে।

গত শুক্রবার রাতে রূপনগর আবাসিক এলাকার ৩৩ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর ছয়তলা ভবনে পুলিশের অভিযানে নিহত হয় জাহিদুল। যাকে ‘নব্য জেএমবির’ শীর্ষনেতা তামিম চৌধুরীর অন্যতম সহযোগী ও সামরিক প্রশিক্ষক বলে দাবি করে পুলিশ। গত ১ জুলাই গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারি এবং ও’কিচেন রেস্তোরাঁয় জঙ্গিরা হামলা চালায়। পরদিন সকালে সেনা কমান্ডোদের ‘অপারেশন থান্ডার বোল্টে’ পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন নিহত হয়। পরে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর ২৬ জুলাই রাতে রাজধানীর কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের ‘অপারেশন স্টর্ম ২৬’ অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত হয়। গত ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের ‘অপারেশন হিট স্ট্রং ২৭’ অভিযানে তামিম চৌধুরীসহ তিন জঙ্গি নিহত হয়। সেখানে তামিমদের বাসা ভাড়া নিয়ে দেয় জাহিদুল। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গুলশান এবং গত ৭ জুলাই শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার প্রধান সংগঠক ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম চৌধুরী।

শেষ মুহূর্তেও তৎপর ছিল জাহিদুল : নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর মৃত্যুর পরও তৎপর ছিল জঙ্গি জাহিদুল। নারায়ণগঞ্জ থেকে পালিয়ে মিরপুরের রূপনগরে ছয়তলা বাড়ির একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে আত্মগোপনে থেকেই কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল সে। নারায়ণগঞ্জে দুই সহযোগীসহ তামিম গোয়েন্দা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অভিযানে নিহত হলেও অল্পের জন্য পালিয়ে নিজেকে রক্ষা করে জাহিদুল। তবে নব্য জেএমবির সামরিক শাখার দায়িত্বে থেকে খোদ রাজধানীতেই ফের বড় ধরনের নাশকতা চালানোর প্রস্তুতি ছিল তার। সহযোগীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকার তথ্যও পেয়েছিল গোয়েন্দারা। তাই জাহিদুলকে ধরতে মরিয়া ছিল গোয়েন্দারা। অবশেষে তার সন্ধান পেয়ে এক মিনিটও দেরি করেনি পুলিশ। গত শুক্রবার রাতে মিরপুরের রূপনগর এলাকার ৩৩ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাড়িতে অভিযানের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হয় এই ভয়ংকর জঙ্গি। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, জাহিদুলের মৃত্যুতে নব্য জেএমবির এক ভয়ংকর সদস্যের দাপট শেষ হলো।

যেভাবে গোয়েন্দা জালে জাহিদুল : রূপনগরের ওই বাড়ির মালিকের ছেলে বিপ্লবের ভাষ্য অনুযায়ী,জাহিদুল পরিচয় গোপন করে ছয়তলার দুই কক্ষের ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয়। পুলিশের তথ্য মতে, ওই ফ্ল্যাটে দুটি বেডরুম, ড্রয়িং ও ডাইনিং রুম। বাসার ভেতরে দামি ফার্নিচার। দুই মাস আগে স্ত্রী ও দুই মেয়েসহ সপরিবারে রূপনগরের আবাসিক এলাকার এই বাড়িতে বসবাস শুরু করে জেএমবির সামরিক প্রশিক্ষক জাহিদুল। গত ২৮ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের সে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গাঢাকা দেয়। এর মধ্যেই তার অবস্থানের খবর পেয়ে গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিল। কিন্তু তখন জাহিদুলকে না পেয়ে বাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে গোয়েন্দা জালে আটকানোর ফাঁদ পেতেছিল। এরপর ফের কবে জাহিদুল বাসায় ঢুকবে এ জন্য অপেক্ষায় থাকে গোয়েন্দারা। রূপনগর থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দারা বাড়িটির ওপর কড়া নজরদারি রাখছিল। অবশেষে জাহিদুল শুক্রবার সন্ধ্যার পর চুপিসারে বাসায় ঢোকার চেষ্টা করে।

সরেজমিনে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে একটি অটোরিকশা এসে প্রধান সড়কে থামে। এরপর ওই অটোরিকশা থেকে নেমে জাহিদুল প্রধান ফটক পার হয়ে ৩৩ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাসার দিকে এগোতে থাকে। তখন রূপনগর থানার ওসির নেতৃত্বে সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা আশপাশেই ছিলেন। জাহিদুল ১৪ নম্বর ভবনের কলাপসিবল গেট খুলে ভেতরে ঢোকে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই বাড়ির মালিকের বাসার লোকজন মোবাইল ফোনে দ্রুত রূপনগর থানার ওসিকে জানিয়ে দেন। খবর পাওয়া মাত্র রূপনগর থানার ওসি সঙ্গে থাকা এক ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক তদন্ত), দুজন এসআই ও একজন কনস্টেবলকে নিয়ে জাহিদুল ধরতে দ্রুত ওই বাড়ির সামনে চলে আসেন। এরপর বাসায় ঢুকে পুলিশ সদস্যরা জাহিদুল ধরার চেষ্টা করেন। আর তখনই জাহিদুল ওসিসহ তিন পুলিশকে কুপিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। ওই অবস্থায় পুলিশ সদস্যরাও গুলি চালালে জাহিদুল গুলিবিদ্ধ হয়ে বাসার সামনের রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। এভাবেই জেএমবির এক ভয়ংকর জঙ্গির দীর্ঘদিনের দাপটের অবসান হয়।


মন্তব্য