kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঢাকায় পুলিশের অভিযানে জঙ্গি মুরাদ নিহত

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ঢাকায় পুলিশের অভিযানে জঙ্গি মুরাদ নিহত

রাজধানীর মিরপুরে রূপনগর আবাসিক এলাকায় গতকাল রাতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালায় পুলিশ। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকায় গতকাল শুক্রবার রাতে পুলিশের এক অভিযানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নব্য ধারার এক জঙ্গি নিহত হয়েছে। তার নাম মুরাদ ওরফে জাহাঙ্গীর ওরফে বদর ওরফে মেজর মুরাদ।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মুরাদকে ধরতে গতকাল অভিযানে যায় রূপনগর থানা পুলিশের একটি দল। এ সময় মুরাদ পুলিশকে ছুরিকাঘাত করে এবং গুলি চালায়। এতে রূপনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সৈয়দ সহিদ আলম, পরিদর্শক (তদন্ত) শাহিন ফকির, উপপরিদর্শক (এসআই) মোমেনুর রহমান এবং সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বোখারি আহত হন। এঁদের মধ্যে প্রথম তিনজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে শাহিন ফকির ও সহিদ আলমকে স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) কর্মকর্তারা বলেন, মুরাদ রাজধানীর গুলশান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার মূল হোতা তামিম আহমেদ চৌধুরীর অন্যতম সহযোগী। সে ছিল নব্য জেএমবির সামরিক শাখার প্রশিক্ষক। গত ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার দেওয়ানবাড়িতে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশি অভিযানে তামিমসহ তিন জঙ্গি নিহত হওয়ার আগেই সেখান থেকে সটকে পড়ে মুরাদ। সে-ই ওই বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল বলে তথ্য পায় পুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুরাদ ওরফে জাহাঙ্গীর নব্য জেএমবির হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের আস্তানায় গিয়ে অস্ত্র ও বোমার প্রশিক্ষণ দিত। আর এ কারণেই তার নামের সঙ্গে ‘মেজর’ যুক্ত হয়েছে, নাকি মুরাদ কোনো সময় সেনাবাহিনীতে ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তার সঠিক নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্র জানায়, গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শিয়ালবাড়ীর কাছে রূপনগর আবাসিক এলাকার ৩৩ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর বাড়িটি ঘিরে ফেলে পুলিশ। এরপর ভেতরে অভিযানে গেলে সাড়ে ৮টার দিকে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। ছয় তলাবিশিষ্ট বাড়িটির মালিকের নাম আবুল কালাম আজাদ ওরফে হাশেম। তিনি বর্তমানে হজে আছেন। ওই বাড়ির ষষ্ঠতলার তিন কক্ষের ফ্ল্যাটে থাকত মুরাদ। সম্প্রতি সে বাসায় কম যাতায়াত করছিল।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘নিহত ব্যক্তি নব্য জেএমবির প্রশিক্ষক মেজর মুরাদ। সংগঠনের মধ্যে সে মেজর মুরাদ নামেই পরিচিত ছিল। ’ ইউনিটের উপকমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন বলেন, মেজর মুরাদ ছিল নব্য জেএমবির মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীর সেকেন্ড ইন কমান্ড বা ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তার নাম কখনো জাহাঙ্গীর, কখনো মুরাদ, কখনো মেজর মুরাদ; আবার কখনো বদর বা ওমর। দুই মাস আগে নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় জঙ্গিদের জন্য বাসাটি ভাড়া নেয় সে। অবশ্য অভিযানের আগেই সেখান থেকে সটকে পড়ায় সে সময় পুলিশ তার নাগাল পায়নি।

গতকালের অভিযানের ব্যাপারে এডিসি ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘কয়েক দিন আগে ওই বাড়িতে মুরাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। ২৮ আগস্ট ওই বাড়িতে গিয়ে বাসাটি তালাবদ্ধ দেখা যায়। তখনো ভেতরে জিনিসপত্র ছিল। এরপর পুলিশ কোনো কিছুতে হাত না দিয়ে বাড়িওয়ালাকে বলে আসে যে ওই ব্যক্তি জিনিসপত্র নিতে এলে যেন পুলিশকে জানানো হয়। ওই জঙ্গি ফিরে এলে বাড়িওয়ালা তাৎক্ষণিক রূপনগর থানা পুলিশকে জানান। এ সময় বাড়িওয়ালা বাইরে থেকে তালাও ঝুলিয়ে দেন। পুলিশ ওই বাসার তালা খুলে মুরাদকে ধরতে গেলে সে পুলিশকে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় ধস্তাধস্তিতে গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটে। এতেও আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। ’ ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, চাপাতি ও ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

যেভাবে অভিযান : পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জনায়, গত ১ জুলাই শিয়ালবাড়ী এলাকার ৩৩ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাড়ির ষষ্ঠতলায় বাসা ভাড়া নেয় মুরাদ। তিন কক্ষের ওই বাসায় তার সঙ্গে স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানও ছিল। সে যখন ওই বাসায় ওঠে তখন তার দাড়ি ছিল। কিন্তু কয়েক দিন পর সে দাড়ি ফেলে দেয়। চলাফেরায়ও পরিবর্তন আসে। এ নিয়ে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। তারা পুলিশকে বিষয়টি জানায়। গত ২৮ আগস্ট ওই বাসায় সিটিটিসি ইউনিটের পুলিশ যায়। কিন্তু ওই সকালেই মুরাদ পরিবার নিয়ে বেরিয়ে যায়। পুলিশ বাসার দরজায় তালা লাগানো দেখে ফিরে আসে। যাওয়ার আগে বাড়িওয়ালাকে পুলিশ বলে আসে, কেউ এলেই যেন পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, গতকাল বিকেলে মুরাদ বাসায় ফিরে আসে। এ সংবাদ পৌঁছে যায় পুলিশের কাছে। পুলিশ এরপর নজরদারিতে রাখে বাড়িটি। সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুলিশ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেয়। নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দেওয়া হয় বাসার আশপাশের লোকজনকে। এরপর পুলিশ মুরাদের দরজায় কড়া নাড়ে। কিছু সময় পর ভেতর থেকে দরজা খুলে দেয় মুরাদ। পুলিশ কর্মকর্তারা মুরাদকে জাপটে ধরতে গেলে সে তাদের ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে মুরাদ বাসা থেকে বের হয়ে সিঁড়িতে নেমে আসে। তখন সে পুলিশের ওপর গুলিও চালায়। পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে গুলিবিদ্ধ হয়ে সিঁড়ির গোড়ায় পড়ে যায় মুরাদ।

পাশের বাসার বাসিন্দা আল-আমিন ও ওবায়দুর রহমান জানান, রাত সাড়ে ৮টার দিকে এশার নামাজের শেষে তাঁরা গোলাগুলির শব্দ পেয়েছেন। এরপর তাঁরা বাড়িতে ফিরে দেখেন পুলিশ ঘিরে রেখেছে। জানতে চাইলে অভিযানের কথা জানায় পুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন : গত রাতে রাজধানীর পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালে আহত পুলিশ কর্মকর্তাদের দেখতে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুনেছি নিহত ব্যক্তি জঙ্গিদের প্রশিক্ষক ছিল। তাকে জীবিত ধরতে পারলে ভালো হতো। সেটা করার অবস্থা ছিল না। এখন তার পরিচয় বের করার চেষ্টা চলছে। ’

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এডিশনাল আইজি) মোখলেসুর রহমান গত রাতে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে অভিযানের পর সেই আস্তানা ছেড়ে চলে যায় এই জঙ্গি। সে ফিরে এলে রাত সাড়ে ৮টা থেকে রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত সেখানে অভিযানটি চালানো হয়।

রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান ও অ্যাডিশনাল আইজি জাভেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘নিহত মুরাদ অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ছিল বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। সে গুলশানে হামলাকারী নিবরাসসহ অন্য জঙ্গিদের বোমা বানানো ও হামলা চালানোর কৌশল নিয়ে প্রশিক্ষণ দিত। তদন্তের পর এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়া যাবে। ’

তবে রাতেই র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলেন, ‘মুরাদ সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিল কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। জঙ্গিদের প্রশিক্ষকদের তারা ‘মেজর’-এর মতো উপাধি দিয়ে থাকতে পারে। ’

গতকাল রাত দেড়টার দিকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ আশপাশের রাস্তা বন্ধ করে বাড়িটি ঘিরে রাখে। তখনো পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) দল ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহ করছিল। আর মুরাদের লাশ তখনো বাড়ির ভেতরের সিঁড়ির সামনে পড়ে ছিল।


মন্তব্য