kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এফএফপির প্রতিবেদন

ভঙ্গুর দেশের তালিকায় ৩৬ নম্বরে বাংলাদেশ

আবুল কাশেম   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ভঙ্গুর দেশের তালিকায়  ৩৬ নম্বরে বাংলাদেশ

২০১৬ সালে ভঙ্গুর দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩৬তম স্থানে। ১৭৮টি দেশ নিয়ে এ তালিকা করা হয়েছে।

১২ বছর ধরে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদকালে এ দেশের পরিস্থিতি বেশি খারাপ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে একটু একটু করে স্থিতিশীলতা বাড়তে থাকে। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট সহিংসতায় আবারও বেশ অবনতি হয় বাংলাদেশের। তবে তিন বছর ধরে এ দেশ তার ভঙ্গুর অবস্থা থেকে একটু একটু করে বেরিয়ে আসছে। দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশ পাকিস্তান, নেপাল, আফগানিস্তান এবং স্বৈরতন্ত্র থেকে সবে গণতন্ত্রে ফেরা মিয়ানমারের অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে বেশ খারাপ। বাংলাদেশের ক্যাটাগরিতেই আছে শ্রীলঙ্কা। তুলনায় ভারতের অবস্থা বেশ ভালো।

আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ১২টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘ফান্ড ফর পিস-এফএফপি’, ‘ফ্রাজাইল স্টেটস ইনডেক্স ২০১৬’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে এসব তথ্য তুলে ধরেছে। ১৭৮টি দেশ নিয়ে তৈরি করা প্রতিবেদনটি গত ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করেছে এফএফপি। ১২ বছর ধরে ওয়াশিংটনভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘ফরেন পলিসি’র সঙ্গে যৌথভাবে এফএফপি এ প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।

সূচকগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার চাপ, উদ্বাস্তু ও অভ্যন্তরীণভাবে গৃহহীন মানুষ, দেশের ভেতরে বিভিন্ন গ্রুপ বা পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ক্ষোভ, মেধাবীদের দেশ ত্যাগ, একই রাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতি-ধর্ম ও অঞ্চলের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও দারিদ্র্যের হার, দুর্নীতি, গণতান্ত্রিক সক্ষমতা ও নির্বাচনপ্রক্রিয়া, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশনসহ অন্যান্য সেবা প্রাপ্তি, মানবাধিকার সুরক্ষা, বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত, স্থানীয় ও জাতীয় নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং বিদেশি সহায়তা ও হস্তক্ষেপের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিটি সূচকে সবচেয়ে ভঙ্গুর অবস্থায় থাকলে ১০ নম্বর এবং সবচেয়ে টেকসই অবস্থায় থাকলে শূন্য নম্বর দিয়ে প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। তাতে বাংলাদেশ ৯০.৭ পেয়ে খারাপের দিক দিয়ে ৩৬ নম্বরে অবস্থান করছে। তবে এর চেয়ে খারাপ অবস্থা ৩৫টি দেশের। যাদের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানও।

তালিকায় সবচেয়ে টেকসই দেশ হিসেবে জায়গা পেয়েছে ফিনল্যান্ড। পরের অবস্থানেই রয়েছে নরওয়ে ও নিউজিল্যান্ড। আর সবচেয়ে নড়বড়ে দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সোমালিয়াকে। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধরত দক্ষিণ সুদান রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক রয়েছে তৃতীয় স্থানে। মধ্যপ্রাচ্যের ইয়েমেন ও সিরিয়ার অবস্থান চতুর্থ ও পঞ্চমে। পরের অবস্থানে রয়েছে চাদ ও কঙ্গো। এই আটটি দেশকে ‘খুবই উচ্চমাত্রার সতর্কতা’র (ভেরি হাই অ্যালার্ট) তালিকায় রাখা হয়েছে।

খারাপের দিক থেকে এর পরের অবস্থানের দেশগুলোকে ‘উচ্চমাত্রার সতর্কতা’র (হাই অ্যালার্ট) তালিকায় রাখা হয়েছে। এ ক্যাটাগরিতে রয়েছে আফগানিস্তান, হাইতি, ইরাক, গিনি, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, বুরুন্ডি ও জিম্বাবুয়ে।

এর পরের দেশগুলোকে রাখা হয়েছে সতর্ক (অ্যালার্ট) তালিকায়। বাংলাদেশও এ তালিকায় রয়েছে। এতে বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ অবস্থায় আছে গিনি বিসাউ, ইরিত্রিয়া, নাইজার, কেনিয়া, কোস্টারিকা, ক্যামেরুন, উগান্ডা, ইথিওপিয়া, লিবিয়া, মিয়ানমার, লাইবেরিয়া, মোরিতানিয়া, মালি, উত্তর কোরিয়া, কঙ্গো রিপাবলিক, রুয়ান্ডা, নেপাল ও সিয়েরা লিওন। এর পরই বাংলাদেশ। তার নিচে রয়েছে অ্যাঙ্গোলা ও মিসর।

জনসংখ্যার চাপ, দেশের ভেতরে বিভিন্ন গ্রুপ বা পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ক্ষোভ, মেধাবীদের দেশত্যাগ, দুর্নীতি, গণতান্ত্রিক সক্ষমতা ও নির্বাচন প্রক্রিয়া, সরকারি সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় ও জাতীয় নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে খারাপ বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্বাস্তু ও অভ্যন্তরীণভাবে গৃহহীন হয়ে পড়া প্রতিরোধ, বিভিন্ন জাতি-ধর্ম ও অঞ্চলভেদে উন্নয়ন বৈষম্য দূর করা ও বিদেশি সহায়তা এবং হস্তক্ষেপ সূচকে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ সালের তুলনায় পরের বছরে বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা অনেক খারাপ হয়। তারপর থেকে প্রতিবছরই অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল। আবার ২০১২ সাল থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ২০১৪ সালের নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ও অস্থিরতার কারণে এই তিন বছর সূচকগুলোর অবনতি হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে এসব সূচকে বাংলাদেশ আবার অগ্রগতির ধারায় রয়েছে বলে গ্রাফে দেখিয়েছে এফএফপি।

২০০৫ সালে খারাপের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭ নম্বরে। পরের বছর ১৯ নম্বরে পৌঁছায়। তবে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ওই বছর বাংলাদেশ বিশ্বের নড়বড়ে দেশগুলোর মধ্যে ১৬ নম্বরে চলে আসে। পরের বছর পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে ৮-এ নামে। ২০০৯ সালে অবস্থান আবার ১৯-এ পৌঁছায়। পরের বছর অবস্থান দাঁড়ায় ২৪-এ। ২০১১ সালে আরো এক ধাপ এগোয় দেশ। ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ অবস্থান নেয় ২৯ নম্বরে।

প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে টেকসই বা সাসটেইনেবল দেশ ফিনল্যান্ড। ১০০ নম্বরের মধ্যে ১৮.৮ পেয়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে দেশটি। আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রাখা হয়েছে সোমালিয়াকে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানকে বিশ্বের ১৪তম ভঙ্গুর রাষ্ট্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। আফগানিস্তানকে নবম স্থানে রাখা হয়েছে। মিয়ানমারের অবস্থান ২৬-এ। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কা ৪৩, ভারত ৭০, চীন ৮৬, সৌদি আরব ৯৭, যুক্তরাষ্ট্র ১৫৯ ও যুক্তরাজ্যকে ১৬২তম নড়বড়ে রাষ্ট্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাশিয়া ৬৫, ইসরায়েল ৬৯, তুরস্ক ৭৯, মালয়েশিয়া ১১৫, ব্রাজিল ১১৭ ও আর্জেন্টিনা ১৪০তম স্থানে রয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে ‘ভেরি স্ট্যাবল’ বা খুবই স্থিতিশীল তালিকায় জায়গা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এ ছাড়া এ তালিকায় রয়েছে স্পেন, মাল্টা, উরুগুয়ে, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ফ্রান্স, স্লোভেনিয়া ও সিঙ্গাপুর। এদের চেয়েও ভালো অবস্থানে থাকা দেশগুলোকে সাসটেইনেবল বা টেকসই তালিকায় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পর্তুগাল, বেলজিয়াম, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া, লুক্সেমবার্গ, কানাডা, আইসল্যান্ড, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড ও নরওয়ে।


মন্তব্য