kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শরীয়তপুরে পদ্মায় ব্যাপক ভাঙন

পদ্মাপারে কান্না আর আহাজারি

আবদুল আজিজ শিশির, শরীয়তপুর   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পদ্মাপারে কান্না আর আহাজারি

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কুণ্ডেরচর ইউনিয়নে পদ্মার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘর-বাড়ি। পাকা স্থাপনা ভেঙে অন্যত্র সরে যাচ্ছে ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো। পড়ে আছে বহু যত্নে গড়া আবাসের অংশবিশেষ। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘এই ব্যাডা তুই কে? কইতোন আইছছ? আমার এহেনতোন যা। আমার কেহই নাই।

হারা রাইত আমি বৃষ্টিতে বিজজি। অহন আবার কি কইমু। কাইল ভাত খাই নাই। দেহছ না বিস্কুট খাইতাছি। ’ ক্ষুব্ধ কণ্ঠের কথাগুলো শরীয়তপুরের কুণ্ডেরচর ইসমাইল মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আশ্রয় নেওয়া চেহরন বেগমের (৭০)। স্বামী জঙ্গু হাওলাদার ৩০ বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর থেকেই চেহরন বেগম কলমিরচর গ্রামে স্বামীর ভিটে আঁকড়ে একাকী জীবনযুদ্ধ চালিয়ে আসছিলেন। এবার স্বামীর সেই ভিটেটুকুও কেড়ে নিয়েছে প্রমত্তা পদ্মা। শেষ সম্বল আশ্রয়টুকু হারিয়ে চার দিন ধরে স্কুলের মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন। গত রাতের বৃষ্টিতে সারা রাত ভিজেছেন এই বৃদ্ধা।

কোথাও জায়গা না পেয়ে একই বিদ্যালয়ের বারান্দায় ছেলে, ছেলের বউ ও নাতি-নাতনিকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন রাজিয়া বেগম (৬০)। এখানে তাঁদের মতো আরো অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে খোলা আকাশের নিচে।

স্থানীয়রা জানায়, আগস্ট মাসের ৬ তারিখ থেকে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কুণ্ডেরচর ইউনিয়নে নদীভাঙন প্রকট আকার ধারণ করে। গত কয়েক দিনের ভাঙনে ইউনিয়নটির চোকদারকান্দি, মকবুল খালাশীকান্দি, ইছুব মাদবরকান্দি ও দানেশ মাদবরকান্দি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব গ্রাম গ্রাস করেই থেমে নেই নদী। ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। অব্যাহত ভাঙনে দিশাহারা মানুষ ছুটছে আশ্রয়ের সন্ধানে। পদ্মাপাড়ে চলছে সর্বস্বহারা মানুষের কান্না আর আহাজারি।

গতকাল শুক্রবার সকালে ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা  যায়, নদীর পারে থাকা গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে। ভাঙন আতঙ্কে অনেকেই বসতঘর ও আসবাবপত্র সরিয়ে নিয়েছে। আবার অনেক ঘর-স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ওদিকে একটু পরপরই প্রবল স্রোতে ভেঙে পড়ছে নদীর পাড়। পদ্মার গ্রাসে চলে যাওয়া এই জমিতেই কয়েক দিন আগেও ছিল কারো বাপের ভিটা, আশ্রয়ের একমাত্র স্থান আর আবাদের অবলম্বন। চোখের সামনেই দুই শ বছরের পুরনো বাপ-দাদার ভিটে হারিয়ে যেতে দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে ভয়াবহ নদীভাঙন।

মমিন খালাশীকান্দি গ্রামে গিয়ে দেখ গেল, গ্রামটির ৯০ শতাংশই ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পদ্মার পারে বসে আছেন রিতা বেগম (৪৫)। অপলক তাকিয়ে আছেন পদ্মার দিকে। আর দুই গাল বেয়ে নামছে অশ্রুধারা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালেন, বুধবার বিকেলে পদ্মার ভাঙনে তাঁর একতলাবিশিষ্ট পাকা ঘরটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অথচ মাত্র এক বছর আগেই এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ও ধারদেনা করে ছয় লাখ টাকা খরচ করে ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন তিনি। অথচ ঋণের দুই লাখ টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। স্বামী বিল্লাল ফকির পেশায় একজন কৃষক। নদীভাঙন দালান থেকে খোলা আকাশের নিচে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এই পরিবারটিকে।

একই গ্রামের জাহানারা বেগম ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছিলেন। পদ্মার ভাঙন তাঁর সব কেড়ে নিয়েছে। নিজেদের বসতবাড়িটুকুও হারিয়ে ব্যবহারের জিনিসপত্র নিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন।

একই গ্রামের বাসিন্দা শাফিয়া বেগমের (৭০) কেউ নেই। নিজের জায়গাজমি অনেক আগেই পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। অন্যের জমিতে একটি দোচালা টিনের ঘর তুলে বসবাস করছেন। ভাঙন হুমকিতে পড়েছে তাঁর এই আশ্রয়টুকুও। সাহায্যকারী কেউ না থাকায় ঘরটি সরিয়ে নেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় এই বৃদ্ধা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘অনেক আগেই স্বামী মারা গেছে। একটি মেয়ে ছিল। তারও বিয়ে হয়ে গেছে। এখন আর আমার পাশে কেউ নেই। ’

শুধু রিতা বেগম, জাহানারা বেগম, শাফিয়া বেগম, চেহরন, রাজিয়া বেগমদের মতো কুণ্ডেরচর ইউনিয়নের পদ্মাপারের অন্য আরো অনেককেই পথে বসিয়ে দিয়েছে পদ্মার ভাঙন।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র ও স্থানীয়রা জানায়, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবল স্রোতে পদ্মা নদীতে চলছে ব্যাপক ভাঙন। আগস্ট মাসের ৬ তারিখ থেকে কুণ্ডেরচর ইউনিয়নে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়। ভাঙনে ইতিমধ্যে ইউনিয়নের চারটি গ্রামের ৮৫০টি পরিবারের বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এর মধ্যে শতাধিক পাকা স্থাপনাও রয়েছে। ভাঙন হুমকিতে পড়েছে হাসেম আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইসমাইল মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়, একটি পাকা মসজিদ, সরকারি পাকা সড়কসহ আরো পাঁচ শতাধিক বসতবাড়ি।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হোসাইন খান বললেন, ‘ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল থেকে ৬৭৫টি পরিবারকে ৩০ কেজি করে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে ভাঙনের শিকার এলাকাগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ’

এদিকে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী তারেক হাসান বলেন, ‘অস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই ভাঙন রোধ করা যাবে না। ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে প্রকল্প তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।


মন্তব্য