kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সবচেয়ে সর্বনাশা যমুনা পদ্মা-মেঘনাও ভয়াল

তৌফিক মারুফ   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সবচেয়ে সর্বনাশা যমুনা পদ্মা-মেঘনাও ভয়াল

পানি কমছে আর বাড়ছে পদ্মায় ভাঙন। ছবিটি গতকাল কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ভবনন্দদিয়াড় গ্রাম থেকে তোলা। ছবি : স্টার মেইল

প্রধান নদ-নদীগুলোর ভাঙনে প্রতিবছর তছনছ হয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ, ফসলি জমি, বসতবাড়ি, হাটবাজার, কাঁচা-পাকা সড়ক, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, সরকারি-বেসরকারি অফিসসহ নানা অবকাঠামো। নানা প্রযুক্তি ও পদ্ধতির ব্যবহার করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কার্যকরভাবে ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদ-নদীর শাখা-প্রশাখা প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান নদীগুলো হলো যমুনা, মেঘনা ও পদ্মা (গঙ্গা নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে এসে পদ্মা নাম নিয়েছে। তবে সরকারি নথিপত্রে পদ্মার একাংশ গঙ্গা অববাহিকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ) এ তিন নদীর তীরই বেশি ভাঙছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভাঙনপ্রবণ যমুনা। যদিও নদী নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীদের দাবি, নানামুখী পদক্ষেপের ফলে ভাঙনের ক্ষিপ্রতা আগের তুলনায় কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে পরিবর্তন এসেছে ভাঙনের গতি-প্রকৃতিতে। কমে যাচ্ছে নদীর প্রশস্ততা। আগে যেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নদীর ডান তীর ভাঙনের কবলে পড়ত, এখন সেখানে বেশি ভাঙছে বাঁ তীর।

যমুনার ভাঙনের থাবায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে সিরাজগঞ্জ। পদ্মা অববাহিকায় শরীয়তপুর ও কুষ্টিয়া এবং মেঘনার তোড়ে সবচেয়ে বেশি ভাঙছে বরিশাল ও ভোলা জেলা। ভাঙনে গত চার দশকে দেশের প্রায় এক লাখ হেক্টর ভূখণ্ড হারিয়ে গেছে নদীগর্ভে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রণালির কারণেই এখানকার মাটি অপেক্ষাকৃত নরম প্রকৃতির। সেই তুলনায় দেশের বড় কয়েকটি নদনদীতে অনেক সময়ই শক্তিশালী স্রোতের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উজানের ঢলে বা বর্ষায় ডুবে থাকা মাটি সহজেই ঢেউয়ের আঘাতে ক্ষয় হয়ে যায় বা ধসে পড়ে। ভাঙন ঠেকাতে পাউবো ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে যে আয়তনের নদনদী আছে তার দুই তীর একসঙ্গে ভাঙন থেকে রক্ষার মতো নিরবচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। ’

সরকারের সঙ্গে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসের (সিইজিআইএস) স্যাটেলাইটভিত্তিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর মূলত পদ্মা ও যমুনার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে চার হাজার ২৫২ হেক্টর জমি। এ ছাড়া তিন হাজার ৫৯৩ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, সাত হাজার ৯৯০ কিলোমিটার বিভিন্ন পর্যায়ের সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর ভাঙনের কবলে ঘর হারিয়েছে ৩০ হাজার মানুষ। ওই প্রতিষ্ঠানের চলতি বছরের প্রতিবেদন অনুসারে, এবার ওই দুই নদীবেষ্টিত ২২ জেলায় ভাঙছে তিন হাজার ৬৯০ হেক্টর জমি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আট হাজার ৮১৯ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং ছয় হাজার ২৬৯ কিলোমিটার বিভিন্ন পর্যায়ের সড়ক। আর ঘর হারিয়েছে ৩৩ হাজার ৩৬০ জন।

ওই গবেষণা সংস্থার এবারের নদীভাঙন সম্পর্কিত পূর্বাভাসে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসের আশঙ্কা করা হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। তাদের এ বছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর পদ্মা ও যমুনার তীরের ৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছয়টি হাটবাজার, দুটি সরকারি অফিস, তিনটি বেসরকারি অফিস, তিনটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ৩১টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তবে গবেষকরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে বন্যা-প্লাবন ও ভাঙন একসঙ্গে হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও অনেকে গুলিয়ে ফেলেন। বিশেষ করে বন্যার ক্ষয়ক্ষতিও নদীভাঙনের হিসাবে ঢুকে পড়ে সাহায্য দেওয়া-নেওয়ার ইস্যুতে।

পাউবো সূত্র জানায়, এ বছর বেশি ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো হচ্ছে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, ঢাকা, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, ভোলা ও ফরিদপুর।

সিইজিআইএসের উপনির্বাহী পরিচালক ড. মমিনুল হক সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে নদীগুলো আগের তুলনায় সরু হয়ে যাচ্ছে। গতি-প্রকৃতিতেও আসছে পরিবর্তন। কোথাও ভাঙনের ক্ষিপ্রতা বেড়েছে, কোথাও কমেছে। তবে মোটের ওপর তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে ক্ষিপ্রতা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে হয়। কয়েক বছর ধরে পাউবোর চাহিদার কারণে আমরা মূলত যমুনা ও পদ্মা নিয়ে গবেষণা করছি। তবে প্রতিবারই মেঘনাতেও ব্যাপক ভাঙন চলে। ’ তিনি জানান, পর্যবেক্ষণ অনুসারে গত চার দশকে দেশের প্রধান তিন নদীবেষ্টিত বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দেড় লাখ হেক্টর জমি নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে। বিপরীতে চর হিসেবে জেগে উঠেছে মাত্র ৫০ হাজার হেক্টরের মতো জমি। ফলে এখনো নদীগর্ভে রয়ে গেছে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমি। অন্যদিকে নদীভাঙনের কবলে পড়ে প্রতিবছর গৃহহীন হয়ে পড়ছে ৩০-৪০ হাজার মানুষ।

সর্বগ্রাসী যমুনা : সিইজিআইএসের প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের সবচেয়ে ভাঙনপ্রবণ নদী হিসেবে এখন চিহ্নিত হচ্ছে যমুনা। গত বছর কেবল যমুনা নদীর তীরেই ভেঙেছে দুই হাজার ২২১ হেক্টর জমি, তিন হাজার ৫৯৩ কিলোমিটার বাঁধ, ছয় হাজার ৮৪৩ কিলোমিটার সড়ক। আর এবার যমুনায় ভাঙনের শিকার হচ্ছে দুই হাজার ১৭৩ হেক্টর জমি, আট হাজার ৮১৯ কিলোমিটার বাঁধ, পাঁচ হাজার ৩১০ কিলোমিটার সড়ক। এ ছাড়া ৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছয়টি হাটবাজার, দুটি সরকারি অফিস, তিনটি বেসরকারি অফিস, তিনটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ২৭টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিলীন হওয়ার হুমকিতে রয়েছে।

সিইজিআইএসের সূত্র অনুসারে, ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে ৯০ হাজার ৩৬৭ হেক্টর জমি। এর মধ্যে শুধু সিরাজগঞ্জে বিলীন হয়েছে ২২ হাজার ৭৮৪ হেক্টর এলাকা। এ ছাড়া কুড়িগ্রামে ১৮ হাজার ৪৭৯ হেক্টর, গাইবান্ধায় ৯ হাজার ৩৪৮ হেক্টর, জামালপুরে ১০ হাজার ৬০৮ হেক্টর, বগুড়ায় ১০ হাজার ৯৩৮ হেক্টর, টাঙ্গাইলে ৯ হাজার ১৫০ হেক্টর এবং মানিকগঞ্জে ছয় হাজার ৩৩৫ হেক্টর ভূমি বিলীন হয়েছে।

থামছে না পদ্মার ভাঙন : সিইজিআইএসের প্রতিবেদন অনুসারে গত বছর কেবল পদ্মা অববাহিকার বিভিন্ন জেলায় শাখা নদনদীগুলোর তীরেই ভেঙেছে ৫৮৩ হেক্টর জমি ও ১৫৯ কিলোমিটার সড়ক। আর এবার ভাঙনের কবলে পড়েছে ৫৫২ হেক্টর জমি ও ৩৭২ কিলোমিটার সড়ক।

১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছে ২৯ হাজার ৮৪১ হেক্টর এলাকা। এ সময়ের মধ্যে ভাঙনের ব্যাপ্তি হয়েছে ২৫ হাজার ৯ হেক্টর এলাকা। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কুষ্টিয়া জেলা। সিইজিআইএসের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পদ্মা নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে কুষ্টিয়ার ১১ হাজার ৮৫৭ হেক্টর এলাকা। এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে চার হাজার ৬৯৩ হেক্টর, রাজশাহীতে এক হাজার ৬৭০ হেক্টর, নাটোরে দুই হাজার ৪৫ হেক্টর, পাবনায় দুই হাজার ২০৩ হেক্টর এবং রাজবাড়ীর কাছে ভাঙনের শিকার হয়েছে সাত হাজার ৩৭৩ হেক্টর ভূমি। ২০১২ ও ২০১৩ সালে এসব এলাকায় নদীভাঙনের শিকার হয়েছে এক হাজার ৯০৮ হেক্টর এলাকা।

ওই প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর পদ্মা তীরের ভেঙেছে এক হাজার ৪৫৮ হেক্টর জমি ও ৯৮৮ কিলোমিটার সড়ক। আর এবার পদ্মার ভাঙনের কবলে পড়েছে ৯৬৫ হেক্টর জমি ও ৫৮৭ কিলোমিটার সড়ক।

ভয়াল রূপ মেঘনার : বিশেষজ্ঞরা জানান, পদ্মা-যমুনার মতো ব্যাপক না হলেও দীর্ঘকাল ধরেই মেঘনার বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ভাঙন চলছে। সিইজিআইএসের তথ্য অনুসারে, ১৯৭৩ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মেঘনার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে ২৫ হাজার ৮২০ হেক্টর এলাকা। বরিশালের হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ, ভোলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিপন্ন হয়েছে মেঘনার ভাঙনে।

সব দিকে ভাঙন : গত ২৫ দিনে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কুণ্ডেরচর ইউনিয়নে পদ্মার ভাঙনে হাজারখানেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফরিদপুরের পদ্মা নদীর পাড় ভাঙতে শুরু করেছে। ভাঙনের হাত থেকে রেহাই পেতে অনেকেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল। সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল, ডিগ্রীরচর ও আলিয়াবাদ ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামে ফসলি জমি, বসতভিটা ও গাছপালা বিলীন হয়েছে বলে জানায় স্থানীয় সূত্র।

পদ্মার ভাঙনে রাজবাড়ী সদর এবং গোয়ালন্দ উপজেলায় এক হাজার ১০০ পরিবার তাদের ঘরবাড়ি, জায়গাজমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে অন্য এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে।

ভাঙনের কবলে গত কয়েক দিনে যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীতীরের ছয় ইউনিয়নে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮০০ পরিবার।

সিইজিআইএসের উপনির্বাহী পরিচালক ড. মমিনুল হক সরকার বলেন, ‘চার দশক আগে দেশে নদীভাঙনের যে ভয়ংকর রূপ ছিল, তা অনেকটাই দুর্বল হয়েছে। তবে আমাদের দেশের মাটি নরম প্রকৃতির হওয়ায় বর্ষা ও বন্যার প্রভাবে নদীভাঙন বেশি হয়। এ ক্ষেত্রে বন্যার পানি কমতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ভাঙন। যেমনটা এবারও হচ্ছে। বিশেষ করে নদীর তীরে নিচের স্তরে থাকা নরম মাটি তীব্র স্রোতের আঘাতে ক্ষয়ে গিয়ে ফাটল তৈরি করে। পরে এর ওপরের মাটিও ধসে পড়ে বা ভেঙে যায়। ’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সূত্র জানায়, দেশের ৫৭টি নদীর ওপর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এসব নদীভাঙন ও নাব্যতা হ্রাস পাওয়ার পেছনে অবাধে নদী ভরাট, দখল ও বিভিন্ন অবকাঠামো দায়ী।


মন্তব্য