kalerkantho


প্রাণভিক্ষা চাইবেন না মীর কাসেম

মঞ্চ প্রস্তুত, এখন ফাঁসির অপেক্ষা

আশরাফ-উল-আলম, সরোয়ার আলম ও শরীফ আহমেদ শামীম   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মঞ্চ প্রস্তুত, এখন ফাঁসির অপেক্ষা

রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী। এ অবস্থায় একাত্তরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ‘বাঙালি খান’ হিসেবে পরিচিত এই আলবদর কমান্ডারের ফাঁসি যেকোনো মুহূর্তে কার্যকর হতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে প্রস্তুতিও চূড়ান্ত করা হয়েছে। জল্লাদ শাহজাহানের নেতৃত্বে এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে ফাঁসির মহড়াও। এখন শুধু সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। বিশ্বস্ত একটি সূত্র মতে, আজ শনিবার রাতেই ফাঁসি কার্যকর করা হতে পারে আলোচিত এই ধনকুবেরের। এদিকে কাশিমপুর কারাগারের চারপাশ নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে গতকালই।

মীর কাসেম আলী গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার পার্ট-২-এ বন্দি আছেন। কারা কর্তৃপক্ষ গতকাল শুক্রবার দুপুরের পর আবারও মীর কাসেমের কাছে জানতে চায় তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবেন কি না। জবাবে তিনি ক্ষমা চাইবেন না বলে জানান। এর আগে পর পর দুই দিন এ বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া হলে তিনি সময় নেন।

কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখার উদ্দিন গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কারা কর্তৃপক্ষ আজ দুপুরের পর ওনার কাছে জানতে চায় যে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবেন কি না। উনি স্বাভাবিক থেকেই জানিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবেন না। ’

রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা না চাওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়ায় এখন মীর কাসেমের ফাঁসি কার্যকর করতে আর কোনো আইনি বাধা নেই। সরকারের সবুজ সংকেত পেলেই কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসি কার্যকর করবে। তবে গতকাল পর্যন্ত ফাঁসির দিনক্ষণ জানা যায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হলেই জানতে পারবেন। ’

কাশিমপুর কারাগার পার্ট-২-এর সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক জানান, প্রাণভিক্ষার আবেদনের বিষয়ে মীর কাসেম আলীর সিদ্ধান্তের কথা জানতে তিনিসহ কয়েকজন গতকাল দুপুরের খাবারের পর ৪০ নম্বর সেলে যান। ওই সময় কাসেম আলী প্রাণভিক্ষা চাইবেন না বলে জানান। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ পেলে ফাঁসি কার্যকরের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মীর কাসেম আলীর করা রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন গত মঙ্গলবার সকালে খারিজ করে দেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ওই দিনই সন্ধ্যায় রায় প্রকাশ করা হয়। রাতেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হয়ে আদেশ পৌঁছানো হয় কাশিমপুর কারাগারে। পরদিন বুধবার সকালে তাঁকে আদেশ পড়ে শোনানো হয়। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না। ওই দিন তিনি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সময় চান। তাঁর পরিবারের সদস্যরা ওই দিন দেখা করে বেরিয়ে এসে বলেন, তাঁর ছেলে গুম অবস্থায় আছে। তাঁকে না দেখা পর্যন্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন না তিনি। বৃহস্পতিবার আবারও কারা কর্তৃপক্ষ মীর কাসেমের সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে তিনি আরো সময় চান। গতকাল চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দেন, তিনি প্রাণভিক্ষা চাইবেন না।

আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার বলেন, মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর করতে যা যা করা প্রয়োজন তার সব প্রস্তুতিই নেওয়া হয়েছে। কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি আপাতত বাতিল করা হয়েছে। ফাঁসির মঞ্চ সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়েছে। সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে কাশিমপুর কারাগার।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে যা যা করা দরকার সব কিছুই করা হচ্ছে। কাশিমপুর কারাগারের চারপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি র‌্যাবের টহল জোরদার করা হয়েছে। কারাগারের আশপাশের দোকানপাটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

কাশিমপুর কারাগারের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সে ফাঁসির মঞ্চ রয়েছে তিনটি। এর মধ্যে কাশিমপুর কারাগার পার্ট-২-এর মঞ্চে একসঙ্গে দুজনের ফাঁসি কার্যকর করার ব্যবস্থা আছে। ওই ফাঁসির মঞ্চটি নতুন করে রং করা ছাড়াও ধোয়ামোছার পর পাশেই শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। সেখানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

সূত্র মতে, চূড়ান্ত মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল দুপুর ২টায়। মহড়া চলার সময় জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বনিক, জেলার নাসির উদ্দিনসহ কারাগারের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মীর কাসেম আলীর শরীরের ওজন ও উচ্চতা মেপে সে অনুযায়ী বস্তায় দড়ি লাগিয়ে জল্লাদ শাহজাহানের নেতৃত্বে কামালসহ কয়েকজন জল্লাদ মহড়ায় অংশ নেন। জল্লাদ শাহজাহান নাকি জল্লাদ রাজু ফাঁসির মঞ্চে লিভার টানবেন তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে জল্লাদ শাহজাহানের হাত দিয়েই মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর হতে যাচ্ছে বলে ধারণা পাওয়া গেছে।

এদিকে মীর কাসেমের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগে তাঁর পরিবারের সদস্যরা আরেকবার দেখা করার সুযোগ পাবেন বলে কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। মীর কাসেমের মেয়ে সুমাইয়া রাবেয়া গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কালের কণ্ঠকে জানান, কারা কর্তৃপক্ষ এখনো তাঁদের কিছু জানায়নি। দেখা করার জন্য ফোনও করেনি। তবে তাঁরা নিশ্চত হয়েছেন, তাঁদের বাবা প্রাণভিক্ষা চাইবেন না। তাঁরা কারা কর্তৃপক্ষের ডাকের অপেক্ষায় আছেন।

একাত্তরের ঘটনায় অনুতপ্ত নন : একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় অনুতপ্ত নন মীর কাসেম আলী। তাই তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে মা চাইবেন না। কারাগারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মীর কাসেম আলী তাঁদের কাছে দোয়া চেয়েছেন।

মীর কাসেম স্বাভাবিক আছেন : মীর কাসেম আলী কাশিমপুর কারাগারে অত্যন্ত স্বাভাবিক আছেন বলে জানিয়েছেন আইজি প্রিজন। কাশিমপুর কারাগারের এক কর্মকর্তাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সকালে তিনি মীর কাসেমের সেলের পাশেই দায়িত্ব পালন করেছেন। সকাল থেকেই মীর কাসেম একেবারে স্বাভাবিক ছিলেন। সকালে তিনি রুটি ও খেজুরের গুড় খেয়েছেন। দুপুরে মাছ, মুরগির মাংস ও সবজি দিয়ে ভাত খেয়েছেন।

একটু বেশি সময় পেলেন : মীর কাসেম আলীর রিভিউ আবেদন খারিজ হয়েছে চার দিন আগে। রিভিউ খারিজের রায় প্রকাশের পর চার দিন সময় পাননি আগে ফাঁসি কার্যকর হওয়া মানবতাবিরোধী পাঁচ অপরাধী। জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর করা রিভিউ আবেদন গত ৫ মে খারিজ করে দেন আদালত। ৯ মে রায় প্রকাশিত হয়। ১১ মে প্রথম প্রহরে কার্যকর করা হয় তাঁর ফাঁসি। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর করা রিভিউ খারিজ হয় গত বছরে ১৮ নভেম্বর। পরদিন রায় প্রকাশিত হলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়। ওই দুজন রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। তাঁদের আবেদন রাষ্ট্রপতি খারিজ করার পর ওই বছরের ২১ নভেম্বর প্রথম প্রহরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের করা রিভিউ আবেদন গত বছর ৬ এপ্রিল খারিজ করেন আদালত। ৮ এপ্রিল এ রায় প্রকাশিত হয়। এরপর তাঁকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে একই বছরের ১১ এপ্রিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় তাঁর। তার আগে জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার করা রিভিউ আবেদন খারিজ করা হয় ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর। সেদিন রাতেই তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাসেম আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন থেকেই তিনি কারাগারে। এ মামলায় তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রাষ্ট্রপক্ষে আনা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে দুটিতে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি আটটিতে ৭২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মীর কাসেম আলী আপিল করেন। এ আপিলের ওপর শুনানি শেষে আপিল বিভাগ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম হত্যার দায়ে ফাঁসির দণ্ড বহাল রেখে গত ৮ মার্চ সংক্ষিপ্ত রায় দেন।

 


মন্তব্য