kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রেসিডেন্টের সফরের আগেই বার্তা

সম্পর্কে নতুন মাত্রা আনতে চায় চীন

তৈমুর ফারুক তুষার ও মেহেদী হাসান   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সম্পর্কে নতুন মাত্রা আনতে চায় চীন

চীনের প্রেসিডেন্টের আসন্ন ঢাকা সফরের আগেই বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় উন্নীত করার জোরালো বার্তা দিয়েছে পেইচিং। চীন এ দেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরো বাড়াতে চায় এবং ইউরোপের আদলে ভারতসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গেই জোরালো সম্পর্ক গড়তে চায়।

এ লক্ষ্যে আঞ্চলিক সংযোগকে (কানেক্টিভিটি) চীন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের নেতারা সম্প্রতি চীন সফরের সময় ওই দেশটির নীতিনির্ধারকরা এমন বার্তা দেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক করিডরের (বিসিআইএম-ইসি) স্বপ্ন এ অঞ্চলের দেশগুলো দেখছে সেটিকেও দ্রুত বাস্তবে রূপ দিতে চায় পেইজিং। এ লক্ষ্যে ভারতকে তাগিদ দিতে বাংলাদেশকে অনুরোধ জানিয়েছে তারা।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের চার দশক উদ্যাপন উপলক্ষে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের আগামী মাসে ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পেইচিং এখনো কোনো ঘোষণা দেয়নি। তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ২১ আগস্ট চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে বলেন, আগামী ১০ অক্টোবর চীনের প্রেসিডেন্ট তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসবেন। এরপর ১০ থেকে ১৩ অক্টোবরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট যৌথভাবে কর্ণফুলী টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চীনের প্রেসিডেন্ট আগামী ১০ অক্টোবর বাংলাদেশে আসতে পারেন এমন একটি ধারণা পাওয়া গেছে এবং সে অনুযায়ী গত ৭ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

চীনের প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য ওই সফরের আগে চীন সরকারের আমন্ত্রণে ১৪ দলের একটি প্রতিনিধিদল দেশটিতে ৯ দিনের সফর শেষে গত বুধবার ঢাকায় ফিরেছে। প্রতিনিধিদলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছাড়াও ছিলেন আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ব্যরিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, জাসদের (আম্বিয়া) কার্যকরী সভাপতি মঈন উদ্দীন খান বাদল, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ড. শাহাদাত হোসেন, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহ্বায়ক এস কে শিকদার প্রমুখ।

সফরকালে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা চীনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নমন্ত্রী মি. চাও, চীনের আন্তর্জাতিক ডেস্কের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেলসহ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা দুটি রাজনৈতিক কর্মশালায় অংশ নেন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন। ১৪ দলের প্রতিনিধিদলকে বিভিন্ন এলাকা ঘুরিয়ে  চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কর্মপ্রক্রিয়া সরেজমিনে দেখানো হয়।

সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিনিধিদলের সদস্য এক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর পরিকল্পনায় চীনের সঙ্গে মিয়ানমার, বাংলাদেশ হয়ে ভারতের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের কথা রয়েছে। বাংলাদেশ বরাবরই এ সংযোগ স্থাপনের পক্ষে। চীন এ সংযোগ দ্রুত বাস্তবায়ন চায়। কিন্তু এ কাজে ভারত কিছুটা ধীরে চলো নীতি নিয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক থাকায় সম্ভব হলে ভারতকে তাগিদ দিতে পরামর্শ দিয়েছে চীন। ’

ওই নেতা আরো বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের শীতলতা কাটিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী চীন। তারা এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে গভীর ঐক্য গড়ে তুলে এ অঞ্চলে বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতাধর একটি দেশের প্রভাব খর্ব করতে চায়। চীন সব ক্ষেত্রে খুব গুছিয়ে কাজ করছে। তারা বিশ্ব নেতৃত্ব গ্রহণের লক্ষ্য নিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করছে। সে জন্য তারা ইউরোপের দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের আদলে এশিয়ার দেশগুলোর সম্পর্ক দেখতে চায়। চীন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে জলে, স্থলে, আকাশে সকল উপায়ে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন চায়। শুধু চাওয়া নয়, এগুলো বাস্তবায়নে তারা খুবই আগ্রহী। ’

চীন সফরকারী একাধিক নেতা জানান, ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের আগে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর প্রায় নিশ্চিত। এ সফরের আগে ১৪ দলের প্রতিনিধিদলের চীন সফর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বাংলাদেশ ও ভারত সফর করেছেন। জন কেরি ঢাকার ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র দেখানোর চেষ্টা করেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই শি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফর সাজানো হচ্ছে বলে ১৪ দলের প্রতিনিধিদলকে জানিয়েছেন চীন সরকারের প্রতিনিধিরা।

চীন সফর করে আসা অন্য এক নেতা বলেন, ‘আমি চীনের আন্তর্জাতিকবিষয়ক ডেস্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছি। তাঁরা আভাস দিয়েছেন, চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরকালে একাধিক বড় উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের ঘোষণা দেবেন। ’

জানতে চাইলে কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহ্বায়ক এস কে শিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, “চীনের রাজধানী পেইজিংয়ে চীনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নমন্ত্রী মি. চাওয়ের সঙ্গে আমরা বৈঠক করি। বৈঠকে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সরকারের অবস্থান তুলে ধরে চীনের মন্ত্রীকে বলেন, ‘আমাদের বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত, সহযোগিতার হাতও প্রসারিত। ’ এমন বক্তব্যে চীনের প্রতিনিধিরা খুবই খুশি হন এবং স্বাগত জানান। ”

এস কে শিকদার বলেন, ‘বৈঠকে সৈয়দ আশরাফ বলেন, চীনের প্রেসিডেন্টের সফরের জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। জবাবে চীনের মন্ত্রী জানান, তাঁরা প্রেসিডেন্টের সফরের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে। ’

সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘সফরকালে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার বিষয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। তারা পারস্পারিক যোগাযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর পরিকল্পনায় সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্ব দিয়েছে। ’

গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ড. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে চীন। তারা আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছে। ’

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশকে ঘিরে বড় শক্তিগুলোর বিশেষ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তারা বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিয়ে ও উন্নয়নের অংশীদার হয়ে এ দেশের পাশে থাকতে চায়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, রাশিয়াসহ পশ্চিমা অনেক দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করার চেষ্টা করছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সফরের মধ্য দিয়ে দেশটির কাছে বাংলাদেশের বিশেষ গুরুত্বই প্রকাশ পেয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্টেরও বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলকে ঘিরে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং এশিয়ায় নতুন সমীকরণ বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর গুরুত্বকে বিশেষভাবে বাড়িয়ে তুলেছে। বাংলাদেশের জন্য এটি বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে একে কাজে লাগানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, গত সপ্তাহে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা চুক্তি এ অঞ্চলে নতুন একটি সমীকরণ সৃষ্টি করেছে। ওই দুই দেশের সামরিক বাহিনী এখন পরস্পরের ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত—উভয় দেশের সঙ্গেই চীনের যেমন সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আছে, তেমনি তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও আছে।

ওই কূটনীতিক আরো বলেন, ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তির খবর যখন জানা গেল তখন এর কাছাকাছি সময়ে পাকিস্তানকে চীনের সাবমেরিনের মতো সামরিক সরঞ্জাম দেওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারেও তথ্য এসেছে। বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের আরো কয়েকটি দেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশ আসে চীন থেকে। স্পষ্টতই চীন এখন এ অঞ্চলে আরো সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা করবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরো সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ভারত-চীন বা যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে কি না জানতে চাইলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু ছাড়াও জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে বড় শক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে তারা বলে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার প্রক্রিয়ায় ভারত বাংলাদেশের সমর্থন চায়। আবার চীন চায়, বাংলাদেশ যেন এ ক্ষেত্রে ভারতকে সমর্থন না করে। অন্যদিকে ২০১৫ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদের নির্বাচনে বাংলাদেশও প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিল। ২০১৪ সালে জাপানের অনুরোধে বাংলাদেশ তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হওয়ার পথে বাধা কেটে যায়।


মন্তব্য