kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পূর্ণাঙ্গ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট

কামরুল-মোজাম্মেল সংবিধান রক্ষার শপথ ভঙ্গ করেছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কামরুল-মোজাম্মেল সংবিধান রক্ষার শপথ ভঙ্গ করেছেন

আদালত অবমাননার দায়ে দুই মন্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া মামলায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়  প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এমপি এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি সংবিধান সুরক্ষার দায়িত্ব পালনে নেওয়া শপথ ভঙ্গ করেছেন।

তাঁরা আইন ভঙ্গের কাজ করেছেন। এটা মারাত্মক ফৌজদারি আদালত অবমাননা।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বে আট সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের এ পূর্ণাঙ্গ রায় গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে। ৫৪ পৃষ্ঠার রায়ে সব বিচারপতি দুই মন্ত্রীকে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে একমত হয়েছেন। তবে সংবিধান রক্ষার শপথ ভঙ্গের বিষয়ে তাঁরা দ্বিমত পোষণ করেছেন। আট বিচারপতির মধ্যে প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচজন শপথ ভঙ্গের বিষয়ে একমত। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনসহ তিন বিচারপতি এ বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়েছেন। প্রথম পাঁচজনের পক্ষে মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী। তাঁর সঙ্গে একমত হয়েছেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। অপর তিনজনের পক্ষে রায় লিখেছেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তাঁর সঙ্গে একমত হয়েছেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি মো. নিজামুল হক।

এদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শপথ ভঙ্গের কারণে ওই দুজন মন্ত্রিত্ব হারাচ্ছেন না। সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদে মন্ত্রিত্ব হারানোর যেসব কারণ উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে শপথ ভঙ্গের বিষয়টি নেই। তবে এ কারণে মন্ত্রী পদে থাকা উচিত কি না সেটা তাঁদের নিয়োগদাতা এবং ওই দুই মন্ত্রীর নিজস্ব বিবেচনার বিষয়।

শপথ ভঙ্গের পর তাঁদের কী হবে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম ও সাবেক বিচারপতি ব্যারিস্টার এ এফ এম মেজবাহ উদ্দিন কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেন, সংবিধান ও আইনে স্পষ্ট বলা নেই যে শপথ ভঙ্গ করলে কোনো মন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিত্ব হারাবেন। তবে এটা জনমত যাচাইয়ের বিষয়।

তবে খাদ্যমন্ত্রীর আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনাকারী অ্যাডভোকেট আবদুল বাসেত মজুমদার বলেছেন, রায়ে বলা হয়েছে দুই মন্ত্রী শপথ ভঙ্গ করেছেন। আর শপথ ভঙ্গ করলে কী হবে তা সংবিধানে বলা নেই।

আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, শপথ ভঙ্গ করায় সরাসরি মন্ত্রিত্ব যাবে না। তবে নৈতিক কারণে এখনই তাঁদের পদত্যাগ করা উচিত। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী সরকারের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তির জরিমানা বা জেল হলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর পদ থেকে বরখাস্ত হয়েছেন বলে ধরে নিতে হবে। ফলে শপথ ভঙ্গের দায়ে ওই দুই মন্ত্রীর সাংবিধানিক পদে থাকার কোনো নৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার নেই।

সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান বলেন, রায়ে শপথ ভঙ্গের কথা বলা হয়েছে। তবে এ কারণে তাঁদের মন্ত্রিত্ব যাবে কি না সেটা বলা নেই। এ ছাড়া সংবিধানে মন্ত্রীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা বিষয়ে যে বিধান রয়েছে সেখানে শপথ ভঙ্গ করার বিষয়টি নেই। তাই তাঁদের এ পদে থাকা উচিত কি না সেটা তাঁদের (দুই মন্ত্রী) বিবেচনার বিষয়। এ ছাড়া যাঁর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি এ দুজনকে মন্ত্রী হিসেবে শপথ পড়িয়েছেন, এটি তাঁদের সিদ্ধান্তের বিষয়।  

গত ৫ মার্চ রাজধানীর বিলিয়া মিলনায়তনে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত ‘৭১-এর গণহত্যাকারীদের বিচারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র : সরকার, বিচার বিভাগ ও নাগরিক সমাজের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকসহ বক্তারা প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তাঁরা প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে মীর কাসেম আলীর মামলায় ফের আপিল বিভাগে শুনানির দাবি জানান। ওই সময় প্রধান বিচারপতি নেপাল সফরে ছিলেন। তিনি ৭ মার্চ দেশে ফেরেন। এরপর ৮ মার্চ দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করা হয়। তাঁদের ১৪ মার্চের মধ্যে রুলের জবাব দাখিল এবং ১৫ মার্চ আদালতে হাজির থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মীর কাসেম আলীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা বহাল রেখে রায় ঘোষণা করা হয়। নির্ধারিত ১৪ মার্চের মধ্যে উভয় মন্ত্রী আইনজীবীর মাধ্যমে তাঁদের ব্যাখ্যা দাখিল করেন। ১৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আদালতে হাজির হলেও খাদ্যমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকায় আইনজীবীর মাধ্যমে সময়ের আবেদন জানান। আদালত ২০ মার্চ পরবর্তী দিন ধার্য করেন। এ অবস্থায় ২০ মার্চ খাদ্যমন্ত্রী ক্ষমা চেয়ে সম্পূরক ব্যাখ্যা দাখিল করেন। এদিন আদালত তাঁর জবাব দেখে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আদালত ২৭ মার্চ পরবর্তী দিন ধার্য করে ওই দিন দুই মন্ত্রীকে হাজির থাকতে নির্দেশ দেন। ২৭ মার্চ দুই মন্ত্রী আদালতে উপস্থিত হন এবং তাঁদের উপস্থিতিতে শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করা হয়। সেদিন সংক্ষিপ্ত রায়ে আদালত অবমাননার দায়ে দুই মন্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেন আদালত। দুই মন্ত্রীর প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। এই অর্থ অনাদায়ে সাত দিনের বিনা শ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জরিমানার এই অর্থ ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল ও লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের কোষাগারে জমা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে জরিমানার টাকা জমা দেন দুই মন্ত্রী। সংক্ষিপ্ত রায় দেওয়ার পাঁচ মাস পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলো।

গত ২৭ মার্চ আদালত আদেশে বলেন, ‘তাঁরা (দুই মন্ত্রী) আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে অব্যাহতির জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছেন। তাঁদের এই আবেদন গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করছি। তাঁরা মন্ত্রী। সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত। তাঁরা সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন। তাঁরা প্রধান বিচারপতি ও সর্বোচ্চ আদালতকে অবমাননা করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বিচার বিভাগের মর্যাদাহানি করেছে। বিচার প্রশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ করেছেন। যদি তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে যেকোনো ব্যক্তি বিচার বিভাগ সম্পর্কে একই রকম অবমাননাকর বক্তব্য দেবেন। তাঁদের বক্তব্য গুরুতর আদালত অবমাননামূলক। তাই তাঁদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করছি। যেহেতু তাঁরা শুরুতেই নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছেন, তাই তাঁদের সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানো হচ্ছে। তাঁদের আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। তাঁদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হলো। ’

তবে গতকাল প্রকাশিত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এটা স্পষ্ট যে এই বিচার থেকে প্রধান বিচারপতি সরে যান—এমন ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন অভিযুক্ত দুজন (দুই মন্ত্রী)। তাঁরা বলেছেন, তাঁরা তাঁদের প্রত্যাশিত রায় চান। সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা নিয়ে তাঁরা অভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। এই ইচ্ছা ব্যক্ত করে তাঁরা আইনের শাসনের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়েছেন।

রায়ে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টকে আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু তাঁরা  (দুই মন্ত্রী) তাঁদের প্রত্যাশিত রায় পাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। ন্যায়বিচার দেওয়ার ব্যবস্থা বিশেষ দিকে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁরা এ ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক আইনি নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু তাঁদের (দুই মন্ত্রী) ইচ্ছা ছিল আপিল বিভাগ আইনের বাইরে গিয়ে তাঁদের প্রত্যাশিত রায় দিক। তাঁদের এই চাওয়া সংবিধান পরিপন্থী।      

রায়ে আরো বলা হয়, সংবিধানে অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁরা (দুই মন্ত্রী) অবহেলা করেছেন। তাঁরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁরা তাঁদের দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁরা আইন ভঙ্গের কাজ করেছেন। রায়ে বলা হয়, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নে তুলে তাঁরা (দুই মন্ত্রী) বিচার বিভাগের মর্যাদাকে খাটো করেছেন। তাঁরা রায় প্রদান প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছেন এবং সুপ্রিম কোর্ট সম্পর্কে কুৎসা রটনা করেছেন। এটা মারাত্মক ফৌজদারি আদালত অবমাননা এবং সংবিধানে প্রদত্ত ব্যবস্থার লঙ্ঘন। এ কারণে তাঁরা সহানুভূতি পেতে পারেন না। এ জন্য তাঁদের ন্যূনতম সাজা দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

শপথ ভঙ্গের বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে দেওয়া ভিন্ন অভিমতে বলা হয়, ‘আদালত অবমাননার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত ও জরিমানা করা নিয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। তবে সংবিধান রক্ষার শপথ ভেঙেছেন, এ বিষয়ে একমত হতে পারছি না। তাঁদের (দুই মন্ত্রী) শপথ ভঙ্গ করার বিষয়টি এই আদালতের বিচার্য বিষয় ছিল না। শপথ ভঙ্গের বিষয়টি তাঁদের নজরেও (নোটিশে) আনা হয়নি। এ কারণে শপথ ভঙ্গের বিষয়ে একমত নই। ’


মন্তব্য