kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বুকের ধন বিক্রি করে পরের জমিতে ঘর!

কুদ্দুস বিশ্বাস, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বুকের ধন বিক্রি করে পরের জমিতে ঘর!

সন্তান বিক্রির টাকায় উঠছে ঘর। ভিটায় বিমর্ষ মা বেবী খাতুন। ছবি : কালের কণ্ঠ

অভাব তাড়াতে ৩৫ হাজার টাকার বিনিময়ে কন্যাসন্তান বেচেছেন মা। এর মধ্যে ১৫ হাজার টাকা পেয়েছে দালাল।

বাকি টাকায় অন্যের ভিটায় তোলা হচ্ছে নতুন ঘর।

এ ঘটনা ঘটেছে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা বারবান্দা গ্রামে। মা রেবী খাতুন। বাবা গোলাম মোস্তফা। তাঁদের মেয়ে মোরশেদা আক্তার বন্যার বয়স ২২ দিন। ৩৫০ টাকার ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ভবিষ্যতে আর ওই সন্তানের দাবি তাঁরা করবেন না বলে লিখিত চুক্তি হয়েছে। গত ২২ আগস্ট সন্তান বিক্রি করা

 হলেও গতকাল বৃহস্পতিবার এলাকায় খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনা সম্পর্কে জানতে এ প্রতিবেদক যান ওই গ্রামে। পরিবারটি যে বাড়িতে থাকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নতুন ঘর তোলা হচ্ছে।

বুকের ধন বিক্রি করে দেওয়ার পর মা পাগলের মতো হয়েছেন। সঙ্গে গ্রামের মানুষের মধ্যেও শোক দেখা দিয়েছে। কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। চোখের সামনে অন্য সন্তানের না খেয়ে থাকার যন্ত্রণা। থাকার মতো কোনো ঘর নেই। স্বামী ভরণপোষণ দিতে পারেন না। রেবী খাতুন বলেন, “কী করুম? অভাবের তাড়নায় সন্তানরা মরবার নাগছে। বাড়ির পাশে আমগর এমপি (সংসদ সদস্য) অইছে। এমপির বাইত্তে গেছিলাম। হ্যায় কইলো, ‘সাইকেল মার্কায় ভোট দেস নাই, তোরে কিছু দিবার পারুম না। এত বাচ্চা নিছোস কেন? দুইডা এডা বেইচ্চা দে গা। ’ তা ছাড়া যারা আমার সন্তানরে নিছে হেরা ভালা মানুষ। আমার বন্যা সুখেই বড় অবো। বুকের ধনরে বেইচা আইতে গুম অয় না। বুকটা খালি খচখচ করে, ট্যাহার জন্যি মাইয়াডারে বেইচ্চা দিলাম। ”

সন্তানের বাবা গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমি তাগোরে একটা ট্যাহাও খরচ দিবার পারি না। আমি অসুস্থ আছি অনেক দিন। কামাই-রোজগার করবার হাই না। গেদির মায়ে ভালোর জন্যই ওইটা করছে। যারা নিছে তাদের কোনো সন্তান নাই। তাই বাচ্চাটা ভালোই থাকব। ’

গ্রামের লোকজন জানায়, উত্তর বারবান্দা গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের (মৃত) মেয়ে রেবী। বর্তমানে একই গ্রামের নবিন মিয়ার বাড়িতে তিন বছর ধরে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। রেবীর প্রথম বিয়ে হয়েছিল একই গ্রামের কলিম উদ্দিনের সঙ্গে। এক সন্তান হওয়ার পর কলিম স্ত্রীকে ছেড়ে দেন। কিছুদিন পর তাঁর একই এলাকার মজিবর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয়। এই ঘরে দুই সন্তান জন্ম নেয়। এখানেও স্বামী তাড়িয়ে দেয় তাঁকে। শেষে বিয়ে হয় জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পাথরের চরের গোলাম মোস্তফার সঙ্গে। মোস্তফা মাঝেমধ্যে দিনমজুরি করেন। তাঁর আরো চার স্ত্রী রয়েছেন। ফলে স্ত্রী-সন্তানদের কোনো খরচ দিতে পারেন না তিনি। মোস্তফার ঔরসে জন্ম নেয় বন্যা। এর আগের সন্তান মরিয়ম খাতুন (৮), জিহাদ হোসেন (৬) ও মৌসুমী আক্তার (৪)। রেবীর বৃদ্ধ মা জমেলা খাতুন ভিক্ষা করেন।

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চেংটিমারী গ্রামের দেলোয়ার ও পানফুল খাতুন ওই শিশুসন্তান কিনে নিয়ে গেছেন। তাঁদের কোনো সন্তান হয়নি। সন্তান কেনাবেচায় দালালি করেছে সিদ্দিক মিয়া।

রেবী খাতুনদের আশ্রয়দাতা নবিন মিয়া বলেন, ‘দুনিয়াতে তাদের কোনো কিছুই নেই। এ কারণে আমার জমিতে তাকে আশ্রয় দিয়েছি। তিন বছর থেকে আমার বসতভিটায় ছোট একটি ছাপড়া তুলে থাকে। সন্তান বিক্রির ২০ হাজার টাকা দিয়ে আমার জমিতেই ঘর তুলছে। ’

বারবান্দা গ্রামের ইউপি সদস্য আসাদুজ্জামান হেলাল বলেন, ‘আমি ঘটনা শুনেছি অনেক পরে। শিশুসন্তানটিকে অনেক অনুরোধ করে নিয়ে গেছে তারা। ’

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল মামুন তালুকদার বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। কেউ আমাকে বলেনি। এর পরও খোঁজ নিয়ে দেখব। ’

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম-৪ (রৌমারী-রাজীবপুর) আসনের এমপি এবং একই গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ‘এটা একটা ষড়যন্ত্র। ওই মহিলা সন্তান বিক্রি করেছে কি না আমি জানি না। সে কোনো দিন আমার কাছে সাহায্যের জন্য আসেনি। যদি আমার বিষয়ে কিছু বলে থাকে তাহলে মিথ্যা কথা বলেছে। ’


মন্তব্য