kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এমডি-সিবিএ সিন্ডিকেটে চলছে ‘ঢাকা ওয়াসা’

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



এমডি-সিবিএ সিন্ডিকেটে চলছে ‘ঢাকা ওয়াসা’

ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান ও কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি হাফিজ উদ্দিনের সিন্ডিকেটেই চলছে ঢাকা ওয়াসা। এ সিন্ডিকেটকে ওয়াসার ১২টি রাজস্ব জোনের মধ্যে সাতটির বিল সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

আর এর মাধ্যমেই চলছে হরিলুট। শুধু তা-ই নয়, সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয়ের সাতটি জোন সিবিএর হাতে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি আদায় করা বিলের ১০ শতাংশ পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া হচ্ছে তাদের। এ উদ্দেশ্যে সিবিএ নেতাদের আত্মীয়স্বজন এবং ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ পাওয়া ২০০ জনবলে গঠিত প্রোগ্রাম ফর পারফরম্যান্স ইমপ্রুভমেন্ট (পিপিআই) নামের একটি সমবায় সমিতির সঙ্গে চুক্তি করেছে ওয়াসা। সব শেষ দুই বছরে এই পিপিআই ওয়াসার কাছ থেকে কাজের বিল বাবদ নিয়েছে প্রায় ১৩৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সিবিএর হাত হয়ে এর একটি বড় অংশ চলে গেছে ওয়াসার এমডির পকেটে। এ সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতেই উচ্চ আদালতের নির্দেশের পরও ওয়াসার মাস্টাররোলের ৩৬৬ জনকে স্থায়ী করা হচ্ছে না। নতুন জনবলও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। এই সুযোগে ওয়াসার অনেক কর্মচারী মূল বেতনের কয়েক গুণ ওভারটাইম নিচ্ছেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান ব্যস্ততা দেখিয়ে পরে কথা বলার পরামর্শ দেন।

ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সমিতির মাধ্যমে বিল সংগ্রহ এবং এর একটি অংশ তাদের দেওয়ার বিষয়টি অনেক আগে থেকে চলে আসছে। আমি নতুন এসেছি। বিস্তারিত বলতে পারছি না। ’

পিপিআই নামে লোপাট : ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, পিপিআই নামক এ সমিতির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিল সংগ্রহ করছে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। কাজটি মূলত ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান ও সিবিএর সভাপতি হাফিজ উদ্দিন নিয়ন্ত্রণ করছেন। গত অর্থবছরে সাতটি  রাজস্ব জোন থেকে আদায় করা বিলের ১০ শতাংশ হারে প্রায় ৭০ কোটি ৩০ লাখ টাকা নিয়েছে পিপিআই। এর আগের বছরে তারা নিয়েছে আরো ৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এভাবে সমিতিকে দিয়ে বছরের পর বছর টাকা আদায়ের নামে ওয়াসার শত কোটি টাকা লোপাট করা হচ্ছে। এ সিন্ডিকেটে আরো রয়েছেন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন, সিবিএর সহসভাপতি দুলাল চন্দ্র সাহা, সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমান, সহসাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান ও উপদেষ্টা জাবের হোসেন। তাঁদের মধ্যে জাবের হোসেন অনেক আগে অবসরে গেলেও পিপিআইয়ের সঙ্গে আছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, পিপিআইয়ের মাধ্যমে এমডি তাকসিম এ খানকে ম্যানেজ করে কর্মচারী নেতারা কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। ওয়াসায় চাকরি করে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায় মেতেছেন তাঁরা। এটা সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত। এমডি শুধু সমিতিকে দিয়ে এ ব্যবসা করে যাচ্ছেন। ওয়াসায় জনবল সংকট থাকলেও নিয়োগ নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই তাঁর।

এ বিষয়ে জানতে ওয়াসার সিবিএর সভাপতি মোহাম্মদ হাফিজ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে ওয়াসার একটি সূত্র জানায়, তিনি দেশের বাইরে আছেন।

লোপাটের জন্য ৩৩৬ জনবল স্থায়ী হচ্ছে না : ২০০৭ সালে ঢাকা ওয়াসায় ৩৩৬ জন কর্মচারী অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ দীর্ঘদিনেও তাঁদের স্থায়ী করা হয়নি। এ কারণে ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর ভুক্তভোগী কর্মচারীদের পক্ষ থেকে একটি রিট পিটিশন করা হয়। এর ভিত্তিতে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ চলতি মাসে কর্মচারীদের পক্ষে রায় দেন। কিন্তু এখনো আদালতের রায় বাস্তবায়ন করেনি ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। এই ৩৩৬ জনের মধ্যে সহকারী প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, উপসহকারী প্রকৌশলী, কম্পিউটার অপারেটর, ব্যক্তিগত সহকারী, অফিস সহকারী, জেনারেটর অপারেটর, গাড়িচালক, মেকানিকস, ওয়্যারলেস অপারেটর, বিলিং সহকারী, ভাণ্ডার রক্ষক, ক্যাশিয়ার, এপিও, সহকারী মেকানিকস, এপিএলএম, সহকারী জেনারেটর অপারেটর, হেলপার, পিয়ন, মালি, ক্লিনার ও চেইনম্যান রয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থায়ীকরণের প্রক্রিয়াটি এমডি আর সিবিএ নেতারা আটকে রেখেছেন। কারণ এর ফলে পিপিআইয়ের মাধ্যমে অর্থ লোপাট এবং বেতনের কয়েক গুণ ওভারটাইম বন্ধ হয়ে যাবে। এ কর্মচারীদের স্থায়ী করতে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সংসদ সদস্য শেখ সেলিম, মির্জা আজম, আব্দুল মতিন খসরু ও অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনও এ বিষয়ে সুপারিশ করেছেন। তবে এসবের তোয়াক্কা করছে না ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।

বেতনের কয়েক গুণ ওভারটাইম : ঢাকা ওয়াসার কর্মচারীরা বেতনের কয়েক গুণ ওভারটাইম নিচ্ছেন—এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত অর্থবছরেও প্রায় সাড়ে তিন হাজার কর্মচারী মূল বেতনের দ্বিগুণ ওভারটাইম (ওটি) নিয়েছেন; যদিও নিয়মানুযায়ী ওভারটাইম কখনো মূল বেতনের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। অথচ একই অফিসে কাজ করে কোনো কোনো কর্মকর্তা ওভারটাইম পাচ্ছেন না।

ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, গাড়িচালক ও অপারেটররা বেশি ওভারটাইম নিচ্ছেন। পাম্প অপারেটররাও অনেক সময় মূল কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টার চেয়ে ওভারটাইম বহুগুণ দেখান। ওয়াসার বেশির ভাগ পাম্প অপারেটরের মূল বেতন গত অর্থবছরে ছিল আট হাজার ৭০০ টাকা। কিন্তু তাঁরা ওভারটাইম পেয়েছেন এর দ্বিগুণেরও বেশি। নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে ওভারটাইম বেড়ে গেছে। এমডির গাড়িচালক মাধব গোপাল মজুমদারের মূল বেতন বর্তমানে ২০ হাজার ৪২০ টাকা হলেও গত জুলাই মাসে তাঁর ওভারটাইম হয়েছে ৬১ হাজার ১৫ টাকা। তিনি ২৬০ ঘণ্টার ওভারটাইমের হিসাব দেন। পাম্প অপারেটর কাজী মজিবুর রহমান ও রফিকুল ইসলামের মূল বেতন ১৮ হাজার ৮৬০ টাকা, ওভারটাইম করেছেন ৩৬০ ঘণ্টার। ওভারটাইম বিল হচ্ছে ৭৮ হাজার ৩১ টাকা। গত অর্থবছরে শিক্ষানবিশ পাম্প অপারেটর হাবিবুল ইসলাম ও ওসমান গণির মূল বেতন ছিল সাড়ে আট হাজার টাকা। জুলাই মাসে তা হয়েছে ১৩ হাজার ৭৮ টাকা। বিল করেছেন যথাক্রমে ৪৩ হাজার ৭২ ও ৪৫ হাজার ৬০৬ টাকা। শিক্ষানবিশ পাম্প অপারেটর মো. সরোওয়ার্দী, জাহাঙ্গীর হোসেন, রেজাউল করিম, শাহাবুদ্দীন ও আরিফুল আলমের মূল বেতন ১৩ হাজার ৭৮০ টাকা। কিন্তু সবার ওভারটাইম ৪৪ হাজার ৩৩৯ টাকা। কয়েক বছর ধরে ঢাকা ওয়াসায় এ অনিয়ম চলে আসছে। এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের কারণে ওয়াসা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান রহমতউল্লাহকে বিদায় নিতে হয়েছে বলে জানান একাধিক প্রকৌশলী।


মন্তব্য