kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


৮০ যুদ্ধাপরাধী পলাতক

আশরাফ-উল-আলম ও রেজাউল করিম   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



৮০ যুদ্ধাপরাধী পলাতক

বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করার পর এ পর্যন্ত একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ৮০ জন পালিয়ে গেছে। পলাতকদের মধ্যে যেমন আছে অভিযুক্ত তেমনি আছে বিচারে দণ্ডপ্রাপ্তও।

অনেকে দেশে আত্মগোপন করে আছে, আবার বিদেশ পাড়ি দেওয়ার সংখ্যাও আছে অনেক। দীর্ঘ সময় ধরে কুখ্যাত এসব রাজাকার-আলবদর একে একে আত্মগোপনে চলে গেলেও তাদের ধরে আটক রাখা বা বিদেশে পালিয়ে যাওয়া রোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিচারে শাস্তি হওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগও কখনো দেখা যায়নি। আত্মগোপনে থাকাদের মধ্যে মামলায় নাম আছে, শুধু এদের সংখ্যাই জানাতে পেরেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

এক-এগারোর সরকারের পরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুরু হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম। কেউ কেউ আগে থেকেই বিদেশে পালিয়েছিল। আবার কেউ কেউ তদন্ত শুরু হওয়ার পর বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর পালিয়ে যায়। অনেকে তদন্ত শুরু হওয়ার পর পালিয়ে যায়। বিদেশে পালিয়ে থাকা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে টাস্কফোর্স গঠন করা হলেও এ পর্যন্ত কাউকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে তদন্তকালে যারা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে তাদের গ্রেপ্তারের জন্য মনিটরিং সেল গঠন করা হলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। বিশিষ্টজনদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সেল, প্রসিকিউশন টিম ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় নেই বলেই একাত্তরে দেশ ও মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এসব ভয়ংকর অপরাধী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। যেসব অপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে তাদের বেশির ভাগ এলাকা ছেড়েছে বলে জানা গেছে। তাদের অনেকেই পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সহযোগিতা নিয়ে পালিয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান বলেন, ‘একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলার আসামিদের মধ্যে অন্তত ৮০ জন পালিয়ে গেছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে। এদের মধ্যে রায় হয়েছে এমন মামলার আসামি যেমন আছে, তেমনি চলমান মামলা এবং ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্তাধীন মামলায় অভিযুক্তরাও আছে। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের হাতে অভিযোগ এসেছে এবং আমরা আমলে নিয়েছি এর সংখ্যা অন্তত ২০০। আশঙ্কা করি, এসব অভিযুক্তের মধ্যেও অনেকে গা ঢাকা দিয়েছে। তবে এ সংখ্যা বলার কোনো উপায় নেই। ’

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কারো বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলেই তাদের নজরদারিতে রাখার কথা। যথাযথ নজরদারি না থাকায় তারা পালিয়ে যেতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক রায়ে বলা হয়েছে, স্থানীয় রাজাকাররাই সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর ছিল। এরা নিজ হাতে সাধারণ মানুষ, স্বাধীনতাকামী মানুষকে খুন করেছে। রাজাকার, আলবদর, আল-শামসসহ নানা নামে তারা চালিয়েছে লুটপাট, নারী ধর্ষণ, ধর্মান্তরকরণে বাধ্য করা, অপহরণ, নির্যাতনের মতো ভয়াবহ কর্মকাণ্ড। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের দেওয়া নির্দেশ পালন করতে গিয়ে এরা এসব অপকর্মে লিপ্ত ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদের কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিকামী মানুষের হাতে নিহত হয়েছে, আবার অনেকে এলাকা ছেড়েছে। অনেকেই আবার বহাল তবিয়তে ছিল দাপটের সঙ্গেই। স্থানীয় জনগণ এদের শাস্তির অপেক্ষায় থাকলেও বিচারকাজ শুরু হতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিচার শুরু হলেও দেখা যাচ্ছে এদের বেশির ভাগ পালিয়ে গেছে।

ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এম এ হাসান বলেন, তদন্ত সংস্থার যে পরিমাণ সতর্কতা অবলম্বন করার দরকার ছিল সেটির ঘাটতি ছিল। বিচারসংশ্লিষ্ট অনেকে আছেন যাঁরা নিজের নাম জাহির করতে কোনো তথ্যই গোপন রাখেন না। দেখা গেছে, অনেকে এমপি হয়েছেন এই ট্রাইব্যুনালে নিজের সংশ্লিষ্টতার সুযোগ নিয়ে। স্থানীয় রাজাকারদের নজরদারিতে রাখার দায়িত্ব মূলত পুলিশের। যথাযথ নজরদারি না রাখা অথবা যোগসাজশের কারণে রাজাকাররা পালিয়ে গেছে এবং এখনো যাচ্ছে। আবার স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীরাও অনেককে পালিয়ে যেতে সাহায্য করছে। যারা বিদেশে পালিয়ে গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো নয়। তিনি আরো বলেন, যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বা অভিযোগ এসেছে তাদের প্রতি নজর না রাখলে এরাও পালিয়ে যাবে।

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, একাত্তরে বেশ কয়েকজন আলোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তারা বেশির ভাগই এখন বিদেশ পলাতক। তাদের ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি তদারকি সেল গঠন করেছে। এর আগে বঙ্গবন্ধুর খুিনদের বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতেও একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন হয়েছিল। এই টাস্কফোর্স যেমন অকার্যকর ভূমিকা পালন করছে, তেমনি পলাতক দণ্ডিত রাজাকারদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তদারকি সেলও অকার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এই কমিটি শুধু কাগজে-কলমে, তাদের কোনো কার্যক্রম লক্ষ করা যায় না। তাই পলাতক যুদ্ধাপরাধীরা নিরাপদেই আছে এটা বলা যায়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ কালের কণ্ঠকে বলেন, একটি সেল করা হয়েছে পালাতক দণ্ডপ্রাপ্ত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে। এই সেলের সঙ্গে আছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। এই অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতার কোনো বিকল্প নেই। চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান অবস্থান করছেন যথাক্রমে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে। এ ছাড়া আরো কয়েক দণ্ডিত রাজাকারও বিদেশে অবস্থান করছে। পলাতকরা যেসব দেশে অবস্থান করছে সেগুলোর বেশির ভাগই মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার কোনো বিকল্প নেই।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামিদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব পুলিশের। তদন্ত সংস্থার কাজ নয় এটি। অনেক ক্ষেত্রে কোনো আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই সে পালিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তদন্ত সংস্থা তাদের নজরদারিতে রাখার চেষ্টা করে। কোনো আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তারের আবেদন করা যায় না। তার বিষয়ে খোঁজখবর শুরু হতেই বিষয়টি সে কোনো না কোনোভাবে জেনে যায়। জানার পরেই সে পালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশে অবস্থানরত পলাতকদের বিষয়ে তিনি বলেন, একটি কমিটি হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। তারা কাজ করছে এ নিয়ে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তদন্ত শুরুর সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামসের সদস্যরা পালিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়, তাদের বিষয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের নজরদারি রাখার কথা। কিন্তু তা করা হচ্ছে না। আবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর যারা বাড়িতে থাকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। যারা পালিয়ে গেছে তাদের গ্রেপ্তার করার জন্য ব্যাপক অভিযানেরও খবর পাওয়া যায় না। পুলিশের নির্লিপ্তার কারণে তারা গ্রেপ্তার হচ্ছে না। গত বছর জুন মাসে পলাতক এক আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পলাতকদের গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করতে সরকারকে একটি মনিটরিং সেল গঠনের নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের পর পুলিশ সদর দপ্তর একটি কমিটিও গঠন করে। কিন্তু ওই কমিটির কার্যক্রমে কোনো অগ্রগতি নেই। যারা পালিয়েছে রায়ের পর তাদের কাউকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যারা দেশের বাইরে পালিয়েছে তাদের ফেরত আনতে মন্ত্রণালয়ও একটি তদারকি সেল গঠন করে গত বছর জানুয়ারিতে। ওই সেল গঠন হওয়ার পর গত বছর সেপ্টেম্বরে একটি সভা হয়। সভায় কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি, ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত বিদেশে পালিয়ে থাকা অভিযুক্ত বা রায়ে দণ্ডিত কাউকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

২০১০ সালের ২৫ মার্চ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার করার জন্য গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রথম দিকে শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে তদন্ত শুরু হয়। কুখ্যাতদের মধ্যে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতা গোলাম আযম, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা আবদুস সুবহান, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, বিএনপি নেতা সাকা চৌধুরী, চৌধুরী মঈনুদ্দীন, আশরাফুজ্জামান খান, আবুল কালাম আযাদ, মীর কাশেম আলী প্রমুখের বিচার প্রথম দিকে শুরু হয়। অনেকের বিচার শেষে দণ্ডও কার্যকর হয়। এঁদের মধ্যে ফরিদপুরের মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের তদন্ত শেষ হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার সঙ্গে সঙ্গেই পালিয়ে যান তিনি।

বিদেশে পালিয়ে আছেন শীর্ষ পাঁচ যুদ্ধাপরাধী : জানা গেছে, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরপরই ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে তিনি পাকিস্তানে রয়েছেন বলেও জানা গেছে। চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকে বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ কয়েকটি অপরাধে টুইব্যুনাল ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। তাঁরা অনেক আগেই যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। বিদেশে থেকেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন এই দুজন। এঁদের ফেরত আনার কথা বারবার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও তা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জের হাসেন আলী ওরফে হাসান ও ফরিদপুরের জাহিদ হোসেন ওরফে খোকন রাজাকারও বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। এই দুজনই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামি। ২০১৫ সালের ৯ জুন হাসেন আলী ও ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর খোকন রাজাকারের বিরদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। তদন্তর সময়ই তাঁরা পালিয়ে যান বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

অন্যরা কোথায় আছে কেউ জানে না : শীর্ষস্থানীয় অপরাধীদের বিচারের পর দেশের বিভিন্ন স্থানের অপরাধীদের বিচার শুরু হয়। কক্সবাজার, জামালপুর, বাগেরহাট, কিশোরগঞ্জসহ অন্যান্য স্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শুরু হওয়ার পরই এসব এলাকার চিহ্নিত রাজাকাররা পালিয়ে যায়। ২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার জাতীয় পার্টির নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে পাঁচটি অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। কারাদণ্ডের বোঝা মাথায় নিয়েই তিনি পলাতক রয়েছেন। এখন তিনি কোথায় আছেন কেউ জানে না। এদিকে তাঁর ফাঁসি চেয়ে সরকার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেছে।

গত ৩ মে কিশোরগঞ্জের চার রাজাকারকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির নির্দেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন আহমেদ, তাঁর ভাই ক্যাপ্টেন (অব.) নাসির উদ্দিন আহমেদ, রাজাকার কমান্ডার গাজী আবদুল মান্নান ও হাফিজ উদ্দিন। আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত আসামি হলেন আজহারুল ইসলাম। অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন ছাড়া বাকি চার আসামিই পলাতক রয়েছেন।

জামালপুরের তিন রাজাকারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় গত ১৮ জুলাই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া একই রায়ে আরো পাঁচজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন রাজাকার হলেন আশরাফ হোসেন, আবদুল মান্নান ও আবদুল বারী। আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত আসামিরা হলেন অ্যাডভোকেট শামসুল হক ওরফে বদর ভাই, এস এম ইউসুফ আলী, শরীফ আহমেদ ওরফে শরীফ হোসেন, আবুল হাশেম ও মো. হারুন। এই আট রাজাকারের মধ্যে শামসুল হক ও ইউসুফ কারাগারে আছেন। বাকি ছয়জনই পলাতক রয়েছেন। তাঁদের  অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ শেষ হয়।

বর্তমানে বিচারকাজ চলছে এমন বেশ কয়েকটি মামলার আসামিরা পলাতক রয়েছেন। এঁদের মধ্যে যশোরের জাতীয় পার্টির নেতা সাখাওয়াত হোসেনসহ আটজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আট আসামির মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন ও বিল্লাল হোসেন কারাগারে আছেন। বাকি ছয়জন পলাতক রয়েছেন। পলাতকরা হলেন ইব্রাহিম হোসেন ওরফে ঘুঙ্গুর ইব্রাহিম, শেখ মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান, মো. আ. আজিজ সরদার, আবদুল আজিজ সরদার, কাজী অহিদুল ইসলাম ওরফে কাজী ওহিদুস সালাম ও আবদুল খালেক মোড়ল।

নোয়াখালীর সুধারামের আমির আলীসহ চার রাজাকারের বিচার শুরু হয় গত ২০ জুন। অন্যরা হলেন আবদুল কুদ্দুস, জয়নাল আবেদীন ও আবুল কালাম। এঁদের মধ্যে আবুল কালাম পালিয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। বিচারকাজ চলছে এমন মামলায় সাভারের আবুল কালাম, লক্ষ্মীপুরের ইউসুফ, ঢাকার আবদুল কুদ্দুস, সৈয়দ মোহাম্মদ হুসাইন ও জয়নাল আবেদীন, কক্সবাজারের মৌলভি জাকরিয়া শিকদার, অলি আহমদ, জালাল উদ্দিন, সাইফুল ওরফে সাবুল, মমতাজ আহম্মদ, হাবিবুর রহমান, আমজাদ আলী, আবদুল মজিদ, আবদুস শুক্কুর, জাকারিয়া, মৌলভি জালাল, আবদুল আজিজ ও ইদ্রিস আলী সরদার পলাতক রয়েছেন। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার দুই রাজাকার ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর পালিয়েছেন। গত ১৭ মে তাঁদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়।

এই ট্রাইব্যুনালে আরো ৩৮ সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অভিযোগের তদন্ত চলছে। এঁদের বিরুদ্ধে এখনো প্রতিবেদন না দেওয়ায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়নি। সন্দেহভাজন এসব অভিযুক্ত এখন এলাকায় নেই বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে আছেন নেত্রকোনার খালেক তালুকদার, কবির খান, নূর উদ্দিন, সালাম বেগ, শেখ মো. এ মজিদ, মৌলভীবাজারের শামছুল হক, নেছার আলী, মোবারক মিয়া, ফখরুজ্জামান, আবদুস সাত্তার, খন্দকার গোলাম রব্বানী, আবদুন নূর তালুকদার, আনিস মিয়া ও আবদুল মুছাব্বির মিয়া, ময়মনসিংহের ওয়াজউদ্দিন, গাইবান্ধার সাবেক সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা আবু সালেহ মো. আজিজ মিয়া ওরফে ঘোড়ামারা আজিজ, নাজমুল হুদা, রুহুল আমিন মঞ্জু, আবদুল লতিফ ও আবু মুছলিম মোহাম্মদ আলী, দিনাজপুরের আবদুর রহিম মিয়া, জামালপুরের বেলায়েত হোসেন, নাসির উদ্দিন ও ইসমাইল হোসেন, ময়মনসিংহের কাজী বদরুজ্জামান, গাইবান্ধা সদরের আবদুল জব্বার মণ্ডল, খোকা রাজাকার, আবদুল ওয়াহেদ মণ্ডল, মমতাজ আলী ব্যাপারী, আজগর হোসেন খান ও মো. রঞ্জু মিয়া, হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মো. লিয়াকত আলী, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলী, আটপাড়ার খলিলুর রহমান। সাবেক মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুকের খোঁজ নেই। তাঁর বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলছে।


মন্তব্য