kalerkantho


নিজাম হাজারীর রক্তদানের তথ্য চান হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নিজাম হাজারীর রক্তদানের তথ্য চান হাইকোর্ট

ফেনী-২ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর সংসদ সদস্য পদে থাকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দাখিল করা রিট আবেদনের ওপর হাইকোর্টে রায় প্রদান স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী শুনানির জন্য ৩ নভেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।

নিজাম হাজারী কারাভোগের সময় কত ব্যাগ রক্ত দান করেছেন এবং এ কারণে কত দিন কারাবাস রেয়াত পাওয়ার অধিকারী হয়েছেন, সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এই আদেশের কপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি মো. এমদাদুল হক ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার রায় ঘোষণা স্থগিত করে এ আদেশ দেন। এ সময় নিজাম হাজারীর পক্ষে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন এমপি এবং রিট আবেদনকারীপক্ষে অ্যাডভোকেট সত্য রঞ্জন মণ্ডল উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আমিনুর রহমান চৌধুরী টিকু। অস্ত্র মামলায় সাজা কম খাটার অভিযোগ এনে নিজাম হাজারীর সংসদ সদস্য পদে থাকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা শাখাওয়াত হোসেন ভূঁইয়া।

এ মামলায় মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটা থেকে ওই হাইকোর্ট বেঞ্চে রায় ঘোষণা শুরু হয়। বিকেল সোয়া ৪টা পর্যন্ত রায় ঘোষণা করা হয়। এদিন উভয় পক্ষের আইনজীবীদের শুনানি এবং কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া একাধিক প্রতিবেদন থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হয়।

রায় ঘোষণা সম্পন্ন না হওয়ায় গতকাল বুধবার দুপুর ২টায় পরবর্তী সময় নির্ধারণ করেন আদালত।

গতকাল দুপুরের বিরতি শেষে আদালত বসার পর কার্যতালিকা অনুসারে এ মামলাটি উত্থাপিত হলে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘আমাদের আরো কিছু তথ্য জানার দরকার আছে। ৭ নম্বর বিবাদি (নিজাম হাজারী) পক্ষ লিখিতভাবে আদালতকে জানিয়েছেন যে তিনি কারাগারে থাকাবস্থায় ১৩ ব্যাগ রক্ত সন্ধানীকে দান করেছেন। এ কারণে তিনি সাজা খাটা থেকে ৪৮৬ দিন রেয়াত (সাজা মাফ) পাওয়ার অধিকারী। আদালত বলেন, সন্ধানীর এই প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই করা দরকার। কারণ কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া কোনো প্রতিবেদনেই উল্লেখ নেই যে রক্তদানের জন্য নিজাম হাজারী রেয়াত পেয়েছেন। নিজাম হাজারী আদৌ রক্ত দিয়েছেন কি না, দিলে কী পরিমাণ দিয়েছেন, আর সে জন্য তিনি কত দিন রেয়াত পাবেন তা জানা দরকার। ১৯৫৯ সালে জারি করা সরকারি আদেশ অনুযায়ী রক্তদানের জন্য সাজা রেয়াত পাওয়ার কথা।

নিজাম হাজারীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, নিজাম হাজারী কারাগারে থাকার সময় মোট ১৩ বার রক্ত দিয়েছিলেন। যার বিপরীতে তিনি ৪৮৬ দিনের কারাবাস থেকে রেয়াত পাওয়ার অধিকারী হয়েছেন। এটা ধরা হলে তিনি সাজার মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় কারাগারে ছিলেন।

আদালত বলেন, এসব কথা আপনি আগেও বলেছেন। তাই নতুন করে বলার দরকার নেই। আমরা বিষয়টি জানার জন্যই আদেশ দিচ্ছি। এরপর আদালত কারা কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চেয়ে আদেশ দেন।

নিজাম হাজারীর কারাভোগ নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে ২০১৪ সালে ‘সাজা কম খেটেই বেরিয়ে যান সাংসদ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় করা একটি অস্ত্র মামলায় ২০০০ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল নিজাম হাজারীকে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়। অস্ত্র আইনের ১৯(ক) ধারায় ১০ বছর এবং ১৯(চ) ধারায় সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে বলা হয়, উভয় দণ্ড একসঙ্গে চলবে। এ কারণে তাঁকে ১০ বছর সাজা ভোগ করতে হবে বলে আদেশে বলা হয়। এই রায়ের পর ২০০০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন এবং তাঁকে ওই দিনই কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর তিনি সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন (ফৌজদারি আপিল ২৩৬৯/২০০০)। হাইকোর্ট ২০০১ সালের ২ মে এক রায়ে তাঁর সাজা বহাল রাখেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল (নম্বর ১০৭/২০০১) করলে আদালত তাঁর আবেদন খারিজ করে সাজা বহাল রাখেন। সর্বশেষ তিনি আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ আবেদন-১৮/২০০২) করার আবেদন করলে আদালত ২০০২ সালে তা খারিজ করে দেন। চট্টগ্রাম কারাগার থেকে ২০০৬ সালের ১ জুন মুক্তি পান নিজাম হাজারী। এ বিষয়ে কারাগারে সংরক্ষিত নথিতে দেখা যায়, ২০০৬ সালের ২৭ মে হাইকোর্ট তাঁর জামিন মঞ্জুর করেছেন। হাইকোর্টের (ফৌজদারি আপিল ২৩৬৯/২০০০) এ আদেশ দেখার পর চট্টগ্রাম কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে মুক্তি দেয়। ’

এ প্রতিবেদন যুক্ত করে দাখিল করা রিট আবেদনে বলা হয়, সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন তাহলে মুক্তির পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না। এ কারণে নিজাম হাজারী সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য।

এ রিট আবেদনে ২০১৪ সালের ৮ জুন হাইকোর্ট এক আদেশে ফেনী-২ আসন কেন শূন্য ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। এ ছাড়া নিজাম হাজারীর সাজা খাটার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র তলব করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত মার্চে হাইকোর্ট নিজাম হাজারীর কারাভোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম কারা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন চান। চট্টগ্রাম কারাগার থেকে সাজার বিষয়ে দেওয়া প্রতিবেদনে অস্পষ্টতা থাকায় বিষয়টি কারা মহাপরিদর্শককে (আইজি প্রিজন) তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এ নির্দেশে গত ১৭ জুলাই আইজি প্রিজন প্রতিবেদন দাখিল করেন। এ প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ বছরের সাজার মধ্যে তিনি সাজা খেটেছেন পাঁচ বছর আট মাস ১৯ দিন। রেয়াতসহ মোট সাজা ভোগ করেছেন সাত বছর পাঁচ মাস ১৪ দিন। এখনো সাজা খাটা বাকি আছে দুই বছর ছয় মাস ১৬ দিন। এ প্রতিবেদন পাওয়ার পর রুলের ওপর গত ৩ আগস্ট শুনানি সম্পন্ন হয়। এরপর রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয় ১৭ আগস্ট। কিন্তু এদিন রায় না দিয়ে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে একটি নথি চেয়ে আদেশ দেন। একই সঙ্গে রায়ের জন্য ২৩ আগস্ট দিন রাখা হয়। এদিন রায় না দিয়ে আদালত পরবর্তী দিন দেন ৩০ আগস্ট। এবার নির্ধারিত দিনে রায় ঘোষণা শুরু হয়। একদিন রায় ঘোষণার পর তা অসমাপ্ত রেখেই স্থগিত করলেন আদালত। পাশাপাশি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে নতুন করে প্রতিবেদন চাইলেন ও পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করলেন হাইকোর্ট।


মন্তব্য