kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি

ভারতের গুরুত্ব বাড়বে, কমবে পাকিস্তানের

মেহেদী হাসান   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ভারতের গুরুত্ব বাড়বে, কমবে পাকিস্তানের

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র গত মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। এর আওতায় ওই দুই দেশের সামরিক বাহিনীগুলো একে অন্যের দেশের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে এ চুক্তি করা হয়েছে। এ চুক্তির ফলে পাকিস্তানও অস্বস্তিতে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের নজিরবিহীন এই সহযোগিতা চুক্তি এ অঞ্চলে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করতে পারে। ওই চুক্তি নিয়ে চীনের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন, এ চুক্তি নিয়ে কারো ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ফলে এ অঞ্চলে ভারতের প্রভাব ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ের সঙ্গেই ভালো ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকার ফলে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তবে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার যে নীতি বাংলাদেশ অনুসরণ করে, আগামী দিনগুলোতে তা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশকে আরো কৌশলী হওয়ার ও সজাগ থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তাঁরা।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সন্ত্রাস ও সহিংস উগ্রবাদ দমন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশ কী ধরনের সহযোগিতা নিচ্ছে আর নিচ্ছে না, সেদিকে ভারতসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বড় শক্তিগুলোর নিবিড় দৃষ্টি রয়েছে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তির উপস্থিতি নিয়ে প্রতিযোগী অপর বৃহত্ শক্তিগুলোর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে যে স্পর্শকাতরতা ছিল, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা চুক্তির পর তা কমতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার যে নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হলো তা আগামীতে এ ধরনের প্রস্তাবে রাজি হতে আরো অনেক দেশকেই উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এর ফলে আগামী দিনগুলোতে কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে এ অঞ্চলে নতুন নতুন সমীকরণ দেখা যেতে পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ গত সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা চুক্তি ওই দুই দেশের সম্পর্কের এক নতুন মোড়। চুক্তি থেকে বোঝা যায়, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ক্রমেই কৌশলগত রূপ পাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এ বিশেষ সম্পর্কের ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ অঞ্চলে পাকিস্তানের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র মুখ ফিরিয়ে নেবে। এর ফলে সন্ত্রাসবাদী বিদেশনীতি ধাক্কা খাবে এবং পাকিস্তানের ওই নীতির শিকার বাংলাদেশ, ভারত ও আফগানিস্তানে সন্ত্রাস কমবে। সার্বিকভাবে এ অঞ্চলে ও বিশ্বে পাকিস্তানের প্রভাব কমবে। তিনি মনে করেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র উষ্ণ সম্পর্কের ফলে এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বাড়বে। স্বভাবতই পাকিস্তান এ চুক্তিতে খুশি হবে না। চীনেরও খুশি হওয়ার কারণ নেই। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলকে ঘিরে চীন ও ভারতের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা আছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকার ফলে ভারত সুবিধা পাবে। এমনকি দক্ষিণ চীন সাগরেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

আবদুর রশিদ বলেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত জোরালো। অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে যে আস্থার সংকট ছিল তা কাটানোর জোর প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ঢাকা সফরে। বিশেষ করে, মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকৃতি এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানানোর প্রচেষ্টা দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরো ভালো হতে সহায়ক হবে।

আবদুর রশিদ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের এ চুক্তিকে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে ওই দেশটির সম্পর্কের ভারসাম্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ভালো। চীনের সঙ্গে জোরালো বাণিজ্য সম্পর্ক থাকলেও অরুণাচল ইস্যুতে বিরোধ আছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, এক দশক আগে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি করেছিল। তাই সে অর্থে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার এই সমঝোতা একেবারে কিছু নতুন নয়। নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি এ অঞ্চলে ভারতের ভূমিকাকে আরো সুসংহত করবে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক সহযোগী হিসেবে ভারত আবির্ভূত হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ওই চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তবে বাংলাদেশকে পররাষ্ট্রনীতির দিকে খুব সজাগ থাকতে হবে। বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রাখার যে নীতি বাংলাদেশ অনুসরণ করছে, তা ধরে রাখাও চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

ড. দেলোয়ার বলেন, ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের বড় দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা দেখা যেতে পারে। আঞ্চলিক শীতল যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে এর প্রভাব বাংলাদেশসহ অন্য দেশগুলোর ওপর পড়তে পারে।

চুক্তিতে যা আছে : প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘লজিস্টিকস এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অব অ্যাগ্রিমেন্ট’, সংক্ষেপে লেমোয়া স্বাক্ষরের ফলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর মধ্যে লজিস্টিক সহায়তা, সরবরাহ ও সেবা প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি দুর্যোগ বা মানবিক সংকটের সময় ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ওই দুই দেশের, বিশেষ করে ভারতের সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি করবে। চুক্তিতে উভয় দেশ তাদের সামরিক সরঞ্জাম মেরামত ও পুনঃ সরবরাহের জন্য অন্যের স্থল, বিমান ও নৌঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ পাবে। খাবার, পানি, পরিবহন, জ্বালানি, পোশাক, চিকিৎসাসেবা, প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য লজিস্টিক সেবা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এ চুক্তিতে।

দ্বিপক্ষীয় অনুশীলনের সময় অংশগ্রহণকারী দেশের ইউনিটের জ্বালানির প্রয়োজন হলে তা পাওয়ার সুযোগ ছিল না এত দিন। নতুন চুক্তির ফলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলো একে অপর দেশ থেকে এ ধরনের পরিস্থিতিতে জ্বালানি সুবিধা পাবে।


মন্তব্য