kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নেতৃত্বশূন্যতা আর ভুলে ভুলে গতিহারা বিএনপি

এনাম আবেদীন   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নেতৃত্বশূন্যতা আর ভুলে ভুলে গতিহারা বিএনপি

নেতৃত্বের শূন্যতাই কি বিএনপির বড় সংকট? নাকি সরকারের বাধা কিংবা অন্য কোনো কারণে এগোতে পারছে না দলটি? প্রতিষ্ঠার ৩৮ বছরে এসে এ প্রশ্নই এখন দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সমর্থক সুধীসমাজের মধ্যেও উঠতে শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, দল পরিচালনার মতো বিচক্ষণ নেতার সংখ্যা বিএনপিতে কমে গেছে।

অনেকে এমন সংশয়ও প্রকাশ করেছে যে বর্তমান নেতৃত্ব বা কাঠামো দিয়ে দলটির ঘুরে দাঁড়ানো ও ক্ষমতায় আসা সম্ভব নাও হতে পারে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতে, ১৯ দফাসহ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত কর্মসূচি ও আদর্শের চর্চা থেকে সরে আসার কারণেই দলে এই নেতৃত্ব সংকট সৃষ্টি হয়েছে। নেতা হওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ ছিল জিয়ার প্রথম শর্ত। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্থান দিতে বলেছিলেন। ১৯ দফার মধ্যে দেশপ্রেম, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লবে’র কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এগুলো আস্তে আস্তে হারিয়ে যাওয়ায় দলটির রাজনৈতিক শক্তি তথা গতি হারিয়ে গেছে।

সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, আজকের এই বিপর্যয়ের জন্য বিএনপিই বহুলাংশে দায়ী, কিন্তু পুরোপুরি নয়। কারণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা মামলা-হামলা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে দলটির নেতারা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারছেন না। আর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়া এবং হরতাল-অবরোধ ডেকে নাশকতা সৃষ্টির দায় কাঁধে নেওয়াটাও বিএনপির বড় রাজনৈতিক ভুল ছিল।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে আজ ১ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার। সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে নীতিনির্ধারণী বিষয়ে দলটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত খুব কমই নিতে পেরেছে। বরং একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত দলটিকে পেছনের দিকে নিয়ে গেছে। এর সর্বশেষ প্রমাণ জাতীয় কাউন্সিলের পাঁচ মাস পর কমিটি ঘোষণার ঘটনা। এর মূলে ছিল সিনিয়র নেতাদের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস। এর আগে প্রতিদ্বন্দ্বী একাধিক নেতার কারণে অষ্টম সংসদে সরকারি দলের উপনেতা এবং নবম সংসদে বিরোধী দলের একজন উপনেতা নির্বাচন করতে পারেনি বিএনপি। আর দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করাটা কতখানি প্রজ্ঞার পরিচায়ক হয়েছে, এ আলোচনা দলটির ভেতরে-বাইরে এখনো চলমান। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দলটি সঠিক বৈদেশিক নীতি নিয়ে এগোতে পারছে কি না—এ প্রশ্নও উঠেছে জোরেশোরে। জামায়াতের সঙ্গে জোট করে দল এগিয়েছে না পিছিয়েছে—এ আলোচনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। অথচ এ প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দলটিতে এখনো দোদুল্যমানতা রয়েছে। সমর্থক বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী খোলাখুলি খালেদা জিয়াকে জামায়াত ও বৈদেশিক  নীতি স্পষ্ট করতে বলেছেন। বলেছেন, আট-নয় মাসের মধ্যে ‘কালেকটিভ’ নেতৃত্বের মাধ্যমে দল পরিচালনাসহ ভবিষ্যত্ কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে। নতুবা প্রভাবশালী নেতাদের নেতৃত্বে বিএনপি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।      

জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এ আশঙ্কার কারণ হলো খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিচারাধীন বেশ কয়েকটি মামলার অস্বাভাবিক গতি। দলটির তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত সবাই জানে, বেশ কয়েকটি মামলায় খালেদা ও তারেকের সাজা হতে পারে। ওই পরিস্থিতি সামাল দেওয়াসহ দল পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে বিএনপিতে কোনো আলোচনাই নেই। সিদ্ধান্ত নেই সংসদ ভবন এলাকা থেকে জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে দেওয়ার ইস্যুতে করণীয় নিয়েও। অনেকের মতে, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সক্ষমতাই হারিয়ে ফেলছে।  

চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের সাজা-পরবর্তী ‘গেম প্ল্যান’ সম্পর্কে ঢাকাস্থ কূটনীতিকরাও জানতে চাইছেন। কিন্তু দলে এ নিয়ে কোনো চিন্তা বা আলোচনা পর্যন্ত নেই বলে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের তরফ থেকে কূটনীতিকদের জানানো হয়েছে।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, বিএনপি নেতারা বয়োবৃদ্ধ হয়ে যাওয়ায় নেতৃত্বের এ সংকট তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের মতো বিএনপি অনেক নেতাকে ধরেও রাখতে পারেনি। তিনি বলেন, যে কয়েকজন নেতা এখন আছেন, তাঁরা নিজেরাও উদ্যোগী হয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বসছেন না। উল্টো তাঁরা অভিযোগ তুলেছেন খালেদা জিয়া তাঁদের ডাকেন না। আসলে তাঁদের মনে ভয় ঢুকে গেছে। তাঁরা হিসাব করে চলছেন। ফলে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।

শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, জাতীয় নেতার ভাবমূর্তিসম্পন্ন নেতা বিএনপিতে দু-তিনজনের বেশি চোখে পড়ে না। পাশাপাশি প্রজ্ঞাসম্পন্ন নেতাও কমে গেছে। বিএনপির সমস্যা সম্ভবত এখানেই। তিনি বলেন, চেয়ারপারসনেরও বয়স হয়ে গেছে। তিনি কিছুটা অসুস্থও। তা ছাড়া সরকার মামলা-হামলা দিয়ে এমন অবস্থা তৈরি করেছে যে বিএনপি কেন, অন্য কোনো দল বা শক্তিও এখন সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। সে কারণে মনে হতে পারে, বিএনপি গতিশীল নয়।

সর্বশেষ গত ৪ আগস্ট স্থায়ী কমিটি ঘোষণার পরও বিএনপি গতিশীল হয়নি। বরং আগের কমিটির বেশির ভাগ নেতাই রয়ে গেছেন। এঁদের মধ্যে দু-একজন অসুস্থ এবং বয়সের ভারে ন্যুব্জ। অভিযোগ, গত এক দশকে অধিকাংশ সিনিয়র নেতা দলে তাঁদের অনিবার্যতা প্রমাণ করতে পারেননি। অথবা খালেদা জিয়াই তাঁদের কাজে লাগাননি।

নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া দুই নেতার মধ্যে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপদেষ্টা থেকে স্থায়ী কমিটিতে গেছেন। আর যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে ‘বিশেষ ভূমিকা’র কারণে নীতিনির্ধারক ওই কমিটিতে নেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে দলেই প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, নীতিনির্ধারণী ওই কমিটিতে ভূমিকা পালনের মতো প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারে খালেদা জিয়ার এপিএস ছিলেন তিনি। ওই সময়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী এখন স্থায়ী কমিটির সদস্য। তাঁদের সঙ্গে একই কাতারে সালাহ উদ্দিনের বসাকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না দলটির সিনিয়র নেতারা। অথচ ওই সরকারের মন্ত্রী সাদেক হোসেন খোকা ও আবদুল্লাহ আল নোমানকে স্থায়ী কমিটির বাইরে রাখা হয়েছে। বাইরে রাখা হয়েছে আরেক জাতীয় নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনকেও।

অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, এই তিনজনকে স্থায়ী কমিটিতে নেওয়া হলে বিএনপির লাভ হতো। তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা নেতাদের বিএনপিতে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ তোলেন জাফরুল্লাহ। তিনি বলেন, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদকে সদস্য করা হলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দলের অবস্থান স্পষ্ট হতো।

যদিও দলকে এগিয়ে নেওয়ার মতো প্রজ্ঞা বা কর্মকৌশল প্রণয়নের সক্ষমতা বিএনপির আগের কমিটির নেতাদের মধ্যেও ছিল কি না এ নিয়েও ইদানীং বিএনপিতে আলোচনা উঠতে শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, যোগ্য নেতার সংখ্যা বিএনপিতে কমে গেছে। আবার যে কয়েকজন আছেন, তাঁরাও কোণঠাসা। কিংবা তাঁরা ইচ্ছা করে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখছেন।

২০০১ সালের বিএনপি সরকারে কথিত ‘কিচেন কেবিনেটে’র মন্ত্রী ছিলেন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, প্রয়াত এলজিআরডি মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবং তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম দুজন মারা গেছেন। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন টিকে থাকলেও দলে তিনি এখন উপেক্ষিত। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদও একই কাতারে। আরেক নেতা এম তরিকুল ইসলাম প্রচণ্ড অসুস্থ।

তাঁদের বাইরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও নজরুল ইসলাম খানের মতো ইতিবাচক ভাবমূর্তির নেতাদেরও দুর্দিন চলছে। কমিটি গঠন থেকে শুরু করে কর্মকৌশল প্রণয়ন, কোনো কিছুতেই তাঁদের ভূমিকার কথা এখন আর শোনা যায় না। অপরদিকে মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতো নেতা দলে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং তাঁরা অবদানও রাখছেন। তদুপরি জাতীয় নেতার চরিত্র কিংবা দলকে এগিয়ে নেওয়ার মতো প্রজ্ঞা তাঁরা এখনো পুরোপুরি অর্জন করতে পেরেছেন কি না এ নিয়ে বিতর্ক আছে। পরবর্তী ধাপের জুনিয়র নেতাদের মধ্যে অনেকেরই ভাবমূর্তি সংকট রয়েছে। কিন্তু তাঁদের মধ্য থেকেই রিজভী আহমেদের মতো দু-একজনকে কাছে টেনে দল চালাচ্ছেন খালেদা জিয়া। এর ফলে রুষ্ট হয়ে সিনিয়র নেতারা দূরে সরে আছেন।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পথের অনুসারীদের এক মঞ্চে এনে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে ৭৬ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন তিনি। তবে দলটির ৩৮ বছরের ইতিহাসে ৩৪ বছরই এর নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন খালেদা জিয়া। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার ক্ষমতায় এসেছে। তবে এবারই প্রথম দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে আছে দলটি।

প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পাশে বিচারপতি সাত্তার, মওদুদ আহমদ, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, শাহ আজিজুর রহমান, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মির্জা গোলাম হাফিজ, আবদুল মোমেন খান, এম সাইফুর রহমান, কে এম ওবায়েদুর রহমান, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, শামসুল হুদা চৌধুরী, এনায়েতুল্লাহ খান, এস এ বারী এটি, ডা. আমিনা রহমান ও ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত ও তরিকুল ইসলামের মতো নেতা ছিলেন। ড. খন্দকার মোশাররফ ছিলেন জিয়াউর রহমানের সময়কালে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক।  

১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ ৯ নেতা ২১ দিন কাজ করে দলের গঠনতন্ত্র তৈরি করেন। অন্য নেতারা হলেন বিচারপতি সাত্তার, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, হাবিবুল্লাহ খান, আবদুল মোমেন খান, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, জামালউদ্দিন আহমেদ ও আবুল হাসনাত।     

১৯৮৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। এ সময় বদরুদ্দোজা চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান, ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদার, মেজর জে. (অব.) মজিদুল হক, এম সাইফুর রহমান, অলি আহমদ, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, শেখ রাজ্জাক আলী ও খোন্দকার দোলোয়ার হোসেনের মতো নেতারা তাঁর পাশে ছিলেন।

অনেকের মতে, বিভিন্ন পেশাজীবী বা টেকনোক্র্যাটের মধ্য থেকে রাজনীতিতে এলেও বিএনপির আগের এসব নেতার সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ ছিল এবং জনগণের কাছে তাঁরা গ্রহণযোগ্য ছিলেন। কিন্তু বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার কারণে একেক ইস্যুতে দলটির জন্য প্রয়োজনীয় একেক নেতাকে দল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

জিয়াউর রহমানের কবরে না যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ভুল বোঝাবুঝির সূত্র ধরে ২০০২ সালের ২১ জুন সংসদে ইমপিচমেন্ট আনার আগেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রামের দুটি আসনে মনোনয়ন চাওয়ায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয় অলি আহমদের। যে কারণে স্থায়ী কমিটির সিনিয়র নেতা হওয়া সত্ত্বেও সরকার গঠনের পর অলি আহমদকে মন্ত্রিসভার বাইরে রাখা হয়। ক্ষুব্ধ অলি আহমদের নেতৃত্বে ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর বিএনপির ৩১ জন সাবেক মন্ত্রী এমপি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার প্রয়াত মীর শওকত আলী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন মূলত ঢাকার লালবাগ থেকে মনোনয়ন না পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুকে।

সংসদের স্পিকার হিসেবে সফল ভূমিকার কারণে শেখ রাজ্জাক আলী বিএনপির জাতীয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু খুলনা-২ আসনে তৎকালীন ‘হাওয়া ভবনে’র ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত আলী আসগর লবিকে মনোনয়ন দেওয়ায় তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। এভাবেই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চৌধুরী তানভির আহমেদ সিদ্দিকীকে বিএনপি ছাড়তে হয়। এক-এগারো পরবর্তী ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ছাড়তে হয় মান্নান ভূঁইয়াসহ দলের বড় একটি অংশকে। অনেকের মতে, এভাবেই আস্তে আস্তে রাজনৈতিক নেতার সংখ্যা দলটিতে কমে যায়। যে শূন্যতা থেকে বি চৌধুরী ও অলি আহমদকে দলে ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন এখন আবার সামনে আসছে।

এ প্রসঙ্গে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আসলে সিনিয়র নেতাদের ধরে রাখার ব্যাপারে শেখ হাসিনা অনেক কৌশলী। পছন্দ না হলেও তিনি সবার সঙ্গে হেসে কথা বলেন। মনে হয় তিনি যেন নিরপেক্ষ; কাছের মানুষ। কিন্তু এ ব্যাপারে খালেদা জিয়া রিজার্ভ। এর কারণ হতে পারে তিনি সামরিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন। অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুজন দুই কালচারে বড় হয়েছেন। তাঁদের বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য সে কারণেই দৃশ্যমান। তাঁর মতে, জাতীয় নেতার ভাবমূর্তিসম্পন্ন বেশ কয়েকজন নেতা আওয়ামী লীগে এখনো আছেন। কিন্তু তাঁরা অবসর নিলে বা চলে গেলে ওই দলেও সংকট তৈরি হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন স্থবির থাকায় বিএনপির নেতৃত্বশূন্যতার বিষয়টি এখন দলের ভেতরে বাইরে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। বলা হচ্ছে, এক-এগারোর পর থেকে বিপাকে পড়া দলটির সংকট থেকে বেরিয়ে আসার মতো কোনো কর্মকৌশল যোগ্য নেতৃত্বের অভাবেই গ্রহণ করা যায়নি। উপরন্তু সর্বস্তরের নেতাদের মধ্যে অনৈক্য এখন দৃশমান হয়ে ওঠায় কাঠামোগতভাবে বিএনপি আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বিএনপির ভেতরে ও বাইরে আরো আলোচনা হলো, সিনিয়র নেতারা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য খালেদা জিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করেন না বলেই চেয়ারপারসন একক সিদ্ধান্তে দল চালান। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় এখন চেয়ারপারসনের ‘প্রজ্ঞা’ নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। ফলে অনেকেই এখন তাঁর কথা শুনছে না।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, একসময়ের সিনিয়র নেতারা চিরকাল একটি দলে থাকবেন এমন কোনো কথা নেই। অনেকে মারাও গেছেন। এতে মনে হতে পারে, বিএনপি এক ধরনের নেতৃত্বের সংকটে আছে। আসলে ব্যাপার হলো, যাঁরা এখনো আছেন, সরকারের বাধার কারণে তাঁরা দলে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছেন না। মওদুদ আহমদ বলেন, বিএনপিতে নেতৃত্বের সংকট আছে এটি অস্বীকার করা যাবে না। তবে এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে যে দলটি এখন তার ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতি পদে সরকার প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তিনি বলেন, ‘এই প্রতিবন্ধকতা বেশি দিন থাকবে বলে মনে করি না। সময় হলে বিএনপি আবার জেগে উঠবে। ’

কর্মসূচি : প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নতুন কমিটির নেতাদের নিয়ে শেরে বাংলানগরে জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানাবেন। বিকেল ৩টায় রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে রয়েছে আলোচনা সভা। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে ভোরে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, আলোকসজ্জা, ক্রোড়পত্র প্রকাশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথক বাণীতে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।

খালেদা জিয়া তাঁর বাণীতে বলেন, ‘দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের এই প্রিয় দল অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করেছে। ৯ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে দলটি থেকেছে আপসহীন ভূমিকায়। আজ দেশে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে। ৫ জানুয়ারির তামাশার নির্বাচনের পর গণতন্ত্র এখন মৃতপ্রায়। দেশবিরোধী নানা চুক্তি ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বর্তমান সরকার জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে চলেছে। জনগণের অধিকার আদায়ে, তাদের দুঃখকষ্ট লাঘবে এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের আন্দোলন জনগণের হারানো অধিকার ও তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য। ’


মন্তব্য