kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সময়ক্ষেপণের কৌশল

ছেলেকে পাওয়ার পর প্রাণভিক্ষার সিদ্ধান্ত নেবেন মীর কাসেম

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সময়ক্ষেপণের কৌশল

প্রাণভিক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে ‘নিখোঁজ’ ছেলেকে না পাওয়া পর্যন্ত সময় চেয়েছেন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী। গতকাল বুধবার দুপুরে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে স্ত্রী খন্দকার আয়েশা খাতুন সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

এই শর্ত দিয়ে মীর কাসেম সময়ক্ষেপণের চেষ্টা করছেন, যা আইনসিদ্ধ নয় বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কারা বিধি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনের জন্য অন্য বন্দিদের ক্ষেত্রে বা অন্যান্য রায়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত দিনের সময় দেওয়া হয়ে থাকে। সেই হিসেবে ধরে নেওয়া যায় মীর কাসেম আলীকে সর্বোচ্চ সাত দিনের সময় দেওয়া হতে পারে। বৃহস্পতিবার (আজ) সকালে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে আবার প্রাণভিক্ষার আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইবে। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ’

তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালত কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলে তা কার্যকর করবে সরকার। এ ক্ষেত্রে কারাবিধি প্রযোজ্য হবে না। ’ তিনি বলেন, ‘দণ্ডিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইতে পারবেন। সর্বশেষ রায়ের আদেশ কারাগারে পৌঁছানোর পর আসামিকে জিজ্ঞাসা করতে হবে তিনি প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না। এর উত্তর হতে হবে হ্যাঁ অথবা না। কোনো শর্ত প্রযোজ্য হবে না। কাজেই মীর কাসেম তাঁর ছেলের নিখোঁজ হওয়ার যে দোহাই দিয়েছেন, তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। ’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য শ ম রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবেন কি না, এটি দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে অন্য কাউকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য হলো কালক্ষেপণ করা। ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার পর মীর কাসেম রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন, ব্যাপারটি মোটেই যৌক্তিক নয়। আইনসিদ্ধও নয়। ’

শ ম রেজাউল বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকর করবে সরকার। আপিল বিভাগের শেষ রায় প্রকাশিত হয়েছে। এখন শুধু রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার অধিকার আছে মীর কাসেমের। তিনি ক্ষমা চাইবেন কি না সেটা স্পষ্ট করে বলতে হবে। কোনো শর্ত এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। ’

এদিকে গতকাল মাগুরার শ্রীপুরে এক জনসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, মীর কাসেম আলীর ফাঁসির দণ্ড যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া শেষে যথাসময়েই সম্পন্ন করা হবে।

কাশিমপুর কারাগার-২ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিলে কারাগারে বসে এক ব্যান্ডের রেডিও মাধ্যমে সে খবর জানতে পেরেছিলেন মীর কাসেম। গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাঁকে সেই রিভিউ খারিজের রায় এবং মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনায় কারা কর্তৃপক্ষ। এ সময় তিনি খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তখন তাঁকে বলা হয়, তিনি চাইলে সর্বশেষ সুযোগ হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন। এ সময় তিনি সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য সময় চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক।

জেলা সুপার জানান, গতকাল দুপুর ২টার দিকে দুই মেয়ে সুমাইয়া রাবেয়া ও তাহেরা তাসনিম, পুত্রবধূ শাহেদা তাহমিদা ও তাহমিনা আক্তার, ভাতিজা হাসান জামাল ও তিন শিশুকে নিয়ে একটি অ্যাম্বুল্যান্সে করে কাশিমপুর কারাগারে কাসেমের সঙ্গে দেখা করতে যান তাঁর স্ত্রী আয়েশা। প্রায় দুই ঘণ্টা পর বিকেল পৌনে ৪টার দিকে কারাগার থেকে বেরিয়ে যান তাঁরা। কারা ফটকে কাসেমপত্নী আয়েশা খাতুন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেমকে ২২ দিন আগে সাদা পোশাকের পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। সেই থেকে সে নিখোঁজ। ছেলে তার বাবার আইনজীবী প্যানেলের সদস্যও। পারিবারিক যেকোনো পরামর্শের জন্যই তাকে প্রয়োজন। ’

আয়েশা খাতুন বলেন, “ছেলেকে না পেলে মনের সন্তুষ্টিতে তাঁকে (কাসেম) শেষ বিদায় জানাতে পারব না। ’ সাক্ষাতে স্বামী আমাকে বলেছেন, ‘আমি অপেক্ষা করছি ছেলের জন্য। তাকে পাওয়া গেলে তার সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেব রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করব কি না। ’ আমরা সাক্ষাৎ শেষে বিষয়টি জেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে এসেছি। ”

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ছেলেকে যদি না পাওয়া যায়, তাহলে কী করবেন—এ প্রশ্নের জবাবে কাসেমপত্নী বলেন, ‘যতক্ষণ সময় আছে, ততক্ষণ অপেক্ষা করব। সময় শেষ হয়ে গেলে ভিন্ন কথা। ’ ছেলেকে ফিরে পেতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। এ সময় গাড়িতে থাকা দুই নাতিকে দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘শিশু দুটি তাদের বাবার জন্য কাঁদছে। বাবাকে ফিরে পেতে চাচ্ছে। ’

মীর কাসেমের ছেলে মীর আহমেদ বিন কাসেমকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকধারী কয়েক ব্যক্তি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে বলে গত ১০ আগস্ট পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু পুলিশ বলছে, তারা এ কাজ করেনি। এ বিষয়ে কিছু জানেও না।

সব বিচারিক প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তি হওয়ায় জামায়াতের অর্থ জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত মীর কাসেমের সামনে এখন কেবল ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগই বাকি। তিনি প্রাণভিক্ষার সুযোগ নিতে চাইলে তাঁর আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের পরই দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আর আবেদন না করলে অথবা আবেদন করেও রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা না পেলে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কারা কর্তৃপক্ষ দণ্ড কার্যকর করবে।

এর আগে পাঁচ যুদ্ধাপরাধীর রিভিউ খারিজ হওয়ার দুই দিনের মাথায় তাঁদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। সে সময় কারা বিধি অনুযায়ী তাঁদের রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনের জন্য সাত দিনের সময় দেওয়া হয়নি। দুই দিনের মধ্যেই তাঁদের কাছ থেকে প্রাণভিক্ষা চাওয়া-না চাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানা হয়। পরে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মীর কাসেমের ফাঁসি কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে নাকি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে হবে—তা এখনো নিশ্চিত করেনি কারা কর্তৃপক্ষ। তবে দুটি কারাগারেই ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কাশিমপুর কারাগার পরিদর্শনে আসেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন। রাত সোয়া ৮টার দিকে তিনি বেরিয়ে যাওয়ার সময় কারা ফটকে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রাণভিক্ষার সিদ্ধান্তের জন্য মীর কাসেমকে যৌক্তিক সময় দেওয়া হবে। ’ তিনি বলেন, আজ বৃহস্পতিবার সকালে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে আবার জানতে চাইবে তিনি প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন কি না। যদি আবেদন না করার কথা জানান তাহলে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই দণ্ড কার্যকর হবে। ’ কারাগারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন দেখলেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, ‘সন্তোষজনক। ’ 

কারাগারের একটি সূত্র জানিয়েছে, কাশিমপুরেই মীর কাসেমের দণ্ড কার্যকরের সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে এবং কারা কর্তৃপক্ষকে বেশ কিছু নির্দেশনা দিতেই কারা মহাপরিদর্শক কাশিমপুর পরিদর্শনে এসেছিলেন।

গতকাল ভোর থেকেই কারাগারের ভেতর, মূল ফটকের সামনে ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বেড়েছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতাও। দুপুর ২টার দিকে গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ কারাগার পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কোন কারাগারে কার্যকর হবে এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দেখতেই তিনি কারগার পরিদর্শন করেছেন।

একই কথা জানান কাশিমপুর কারাগার-২-এর জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক। তিনি বলেন, ফাঁসি কোথায় কার্যকর হবে সে বিষয়ে তিনিও কিছু জানেন না। এখনো এ বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত জানতে পারেননি। তবে নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতিও তাঁদের রয়েছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১২ সালের ১৭ জুন গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে কারাগারে আছেন মীর কাসেম। শুরুতে কারাগারে ডিভিশন পান তিনি। ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর এ মামলায় ট্রাইব্যুনাল ফাঁসির রায় দেওয়ার পর তাঁকে পাঠানো হয় কনডেম সেলে। ৬৩ বছর বয়সী এই যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি আটটিতে ৭২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছরের ৩০ নভেম্বর খালাস চেয়ে আপিল করেন মীর কাসেম। এ আপিলের ওপর শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিনকে হত্যার দায়ে ফাঁসির দণ্ড বহাল রেখে গত ৮ মার্চ রায় দেন। রায়ে অন্য ছয়টি অভিযোগে ৫৮ বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়। বাকি তিনটি (মৃত্যুদণ্ডের একটিসহ) অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। গত ৬ জুন আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। এরপর গত ১৯ জুন তিনি রিভিউ আবেদন করেন।   

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন : আদালত প্রতিবেদক, নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা ও গাজীপুর)


মন্তব্য