kalerkantho


বর্জনের পথে বিএনপি!

আজ-কালের মধ্যে সিদ্ধান্ত

শফিক সাফি   

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



বর্জনের পথে বিএনপি!

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রথম দুই ধাপে সহিংসতা ও ভোট দখলের পরিস্থিতি দেখে তৃতীয় ধাপ থেকে নির্বাচন বর্জন করার কথা ভাবছে বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। জানা গেছে, আজ রবিবার বা আগামীকাল সোমবারের মধ্যে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের এবং পরে জোটের বৈঠক ডেকে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। দলীয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

তৃণমূল পর্যায়ের তথ্য ও খবরের ভিত্তিতে ইউপি নির্বাচন বর্জন করার পক্ষে এরই মধ্যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা। ওই নেতাদের মতে, দলকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি নেতাকর্মীদের পলাতক অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল হিসেবে ইউপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে উল্টো নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মামলা হামলা করে নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে। ফলে এ নির্বাচনে থাকার কোনো যৌক্তিকতা দেখছেন না তাঁরা।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচন নিয়ে যে পরিস্থিতি সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) করেছে, তার পরও আমরা নির্বাচনে থাকব কি না তা চিন্তা করে দেখতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘ধানের শীষ মূলত আমাদের জাতীয় নির্বাচনের প্রতীক। এ প্রতীককে আমরা অবমাননা করতে পারি না। দেখা যাচ্ছে, তারা (সরকার ও ইসি) সুচিন্তিতভাবেই তৃণমূল পর্যায়ের এই নির্বাচনব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ফলে আমাদেরও নতুন করে চিন্তা করতে হবে। ’

নির্বাচন-সংক্রান্ত দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়িত বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা ইউপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার ও ইসি দেশের স্বার্থ চিন্তা না করে দলীয় স্বার্থ চিন্তা করছে। সারা দেশ দখলের অংশ হিসেবে ইউপি নির্বাচনও দখলে নেমেছে সরকার। ফলে দলীয় ফোরামের বৈঠক ডেকে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার চিন্তা করছি। কত দিন আর আমরা সাক্ষীগোপাল হয়ে থাকব?’

দলের সহপ্রচার সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘এত দিন তো আমরা সাক্ষীগোপাল হয়েই নির্বাচনে ছিলাম। কিন্তু দেখা গেল সরকার ও ইসি প্রায় সুচিন্তিতভাবেই গত দুটি নির্বাচনে ১০ শতাংশের বেশি আমাদের জয়ী হতে দেয়নি। এটি কিসের আলামত, তা সহজেই অনুমেয়। ’ তিনি বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের পর্যালোচনা শেষ করেছেন তাঁরা। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দলীয় প্রধানের কাছে জমা দেওয়া হবে। সে অনুযায়ী শিগগিরই নির্বাচনে থাকা না থাকার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

গত ২২ ও ৩১ মার্চ দুই ধাপে অনুষ্ঠিত এক হাজার ৩৫৬টি ইউপির নির্বাচনে বিএনপি মাত্র ৯৮টিতে জিতেছে। ২০০ ইউপিতে তারা প্রার্থীই দিতে পারেনি। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে। আবার এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই উল্টো বিএনপির প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হচ্ছে হাজার হাজার মামলা।

বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা যায়, ওই সব মামলায় দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ওই সব মামলা মোকাবিলা করার বিষয়ে দলের সিনিয়র আইনজীবী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

বিএনপির কয়েকজন নেতা এরই মধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নির্বাচন বর্জন করার পক্ষে মত দিয়েছেন। গত শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এক ‘নাগরিক সমাবেশে’ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘এ অথর্ব নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমাদের দলীয় প্রতীককে অসম্মান করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপের নির্বাচনগুলোকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। ’ গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে জাগপা ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘কোথায় ব্যালট আর কোথায় জনগণ? চলমান ইউপিতে যে তথাকথিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেখানে ব্যালটের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ ব্যালটের মাধ্যমে সেখানে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার কোনো সুযোগ জনগণের হাতে নেই। ’

গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ধাপে ৬৩৯ ইউনিয়নে ভোটগ্রহণের পর ইসি সচিবালয়ে গিয়ে সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করে মোহাম্মদ শাহজাহান হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘দুই ধাপের পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছি আমরা। কী ব্যবস্থা নেয়, তা দেখব। তৃতীয় ধাপেও যদি এ রকম সন্ত্রাসী, দখলের ভোট হয়, সুষ্ঠু ভোট আয়োজনে ইসি ব্যর্থ হয়; পরবর্তী তিন ধাপে ভোটে থাকব কি থাকব না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের। ’

শুরুতে বিএনপি নীতিগতভাবে ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলা হয়, মাঠপর্যায়ে দলকে সংগঠিত করা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা এ নির্বাচনে অংশ নেবে। এ ছাড়া দলের নেতারা আরেকটি বিষয়ে চিন্তিত ছিলেন। তাঁদের কাছে তথ্য ছিল, দলের বহিষ্কৃত নেতা নাজমুল হুদাকে সামনে এনে ধানের শীষ প্রতীক দিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে সরকার অংশ নেওয়াতে পারে। এমন কিছু যাতে না হতে পারে সে জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ বেছে নেয় বিএনপি।


মন্তব্য