kalerkantho


১০ টাকায় চাল বিক্রি করে গুদাম খালি করার ভাবনা

আশরাফুল হক রাজীব   

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



১০ টাকায় চাল বিক্রি করে গুদাম খালি করার ভাবনা

বিশাল মজুদ নিয়ে বসে আছে খাদ্য অধিদপ্তর। তিন মাস ধরে চেষ্টা করেও তারা গুদাম খালি করতে পারেনি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। গুদাম খালি করার জন্য ফেয়ার প্রাইস কার্ড চালুর চিন্তাও অনেক আগের। কিন্তু ১০ টাকা কেজি দরে ফেয়ার প্রাইস কার্ড চালুর অনুমোদন নিতেই মন্ত্রণালয় দুই মাস পার করেছে। এ-সংক্রান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে। পরে জানা যায়, তাদের অনুমোদন আগেই নেওয়া আছে। ফলে সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়। এখন অপেক্ষা খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির অনুমোদনের। আগামীকাল সোমবার এ বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে অনুমোদন মিললে প্রায় চার লাখ টন চাল কম দামে বাজারে ছাড়া হবে। এদিকে গুদাম খালি করতে না পারলে কৃষকের কাছ থেকে বোরো ধান-চাল কেনা যাবে না। অথচ কৃষক বাম্পার ফলন ফলিয়ে অপেক্ষা করে আছে সরকারি ধান-চাল কেনার সিদ্ধান্তের জন্য।

কম দামে চাল বিক্রির কর্মসূচি ফেয়ার প্রাইস কার্ড চালু করতে দীর্ঘ সময় লাগার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, ২৮ টাকা কেজি দরে কেনা চাল ১০ টাকায় বিক্রি করতে হলে কেজিতে প্রায় ১৮ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। এই ভর্তুকিতে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন লাগবে। এ কারণে দিন-রাত কাজ করে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির জন্য প্রস্তাব তৈরি করা হয়। প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন এ-সংক্রান্ত অনুমোদন আগেই নেওয়া আছে। নতুন করে অনুমোদন নেওয়ার দরকার নেই। তখন খাদ্য মন্ত্রণালয় অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে দেওয়া প্রস্তাব ফিরিয়ে নেয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, ২০১২ সালে ফেয়ার প্রাইস কার্ড চালু করা হয়েছিল। এক বছর চালানোর পর এ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। কাজেই স্থগিত কর্মসূচি ফের চালু করতে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। এটা খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়েছে। খাদ্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয় খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটিতে। সেখানে ফেয়ার প্রাইস কার্ড চালুর বিষয়ে আলোচনা হবে। কারণ গুদাম খালি করার জন্য ইতিমধ্যে উপজেলা পর্যায়ে ওএমএস চালু করা হয়েছে। আজ (রবিবার) থেকে ইউনিয়ন পর্যায়েও ওএমএস চালু হওয়ার কথা। সেখানে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি হচ্ছে। আটা বিক্রি হচ্ছে ১৭ টাকা কেজি দরে। এই ওএমএসে গুদাম কতটা খালি হচ্ছে তার ওপরও ফেয়ার প্রাইস কার্ড চালুর বিষয়টি নির্ভর করছে।

খাদ্যসচিব এ এম বদরুদ্দোজা বলেছেন, ‘আগে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে কী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বা কেন দেওয়া হয়েছিল সেটা নিয়ে আমরা ভাবছি না। কাজ করতে গেলে এমনটা হতেই পারে। কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল কিনতে হলে গুদাম খালি করতে হবে। আমরা সেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। ’

বর্তমানে সরকারি গুদামে খাদ্যশস্য আছে ১৩ লাখ ৩২ হাজার লাখ টন। এর মধ্যে ৯ লাখ ৮৯ হাজার টন চাল। অবশিষ্ট তিন লাখ ৪৩ হাজার টন গম। গত বছর এই সময় সরকারের গুদামে খাদ্যশস্য ছিল ১০ লাখ ৭১ হাজার টন। চলতি বছর এত বেশি মজুদ হওয়ার কারণ হলো, সংসদ সদস্যরা টিআর কর্মসূচিতে চাল বা গমের বরাদ্দ নিতে চান না। তাঁরা চাল বা গমের বদলে নগদ অর্থ চান। টিআর কর্মসূচিতে প্রাপ্ত চাল-গম বাজারে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয় সংসদ সদস্যদের। কিন্তু বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যথাযথ দাম পাচ্ছেন না। সরকার ২২ টাকা কেজি দরে চাল বরাদ্দ দিলেও বাজারে এই চাল বিক্রি করতে হয় ১৫ টাকা কেজি দরে। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা হয়। আর এ সমস্যার কারণেই সংসদ সদস্যরা টিআর কর্মসূচিতে চাল-গম নিতে চান না। তাদের চাহিদার কারণে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচিকে কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) করা হয়েছে। এসব কারণে গুদামে চাল ও গমের পাহাড় জমেছে। মজুদ বাড়ার আরো একটি বড় কারণ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে গত বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় এক লাখ টন গম বেশি কেনা হয়েছিল। অভিযোগ আছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সুযোগ করে দিতেই এই অতিরিক্ত গম কেনা। তারা কম দামে গম কিনে বেশি দরে সরকারি গুদামে সরবরাহ করে। সরকারি গুদামে তো মজুদ আছেই, বেসরকারি খাতেও প্রচুর চাল রয়েছে। গত বছর ভারত পুরনো মজুদের চাল কম দামে বাজারে ছেড়ে দেয়। সেই চালে বাংলাদেশের বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। পরে সরকার ভারতীয় চাল আমদানি ঠেকাতে শুল্ক আরোপ করলেও ততদিনে ভারতীয় চাল বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।

এবারও বাম্পার বোরো ফলন : চলতি বছর ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে বোরো রোপণ করা হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের মতে এবার দুই কোটি টন চাল উৎপাদন হবে। অনেক বোরো জমির ধান পেকে উঠেছে। এ সপ্তাহেই কাটা শুরু হবে। তবে পুরোদমে কাটা শুরু হবে আরো ১৫ দিন পর। বিদ্যুৎ সংকট না থাকায় এবার বোরো জমিতে নিরবচ্ছিন্ন সেচ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। পানির মতো সার আর কীটনাশকেও কোনো সংকট নেই। এবার পোকামাকড়ের আক্রমণ নেই। শিলাবৃষ্টিও খুব একটা হয়নি। এ অবস্থায় আবারও বাম্পার ফলনের আশা করছে কৃষকরা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, যেভাবেই হোক গুদাম খালি করে কৃষকের কাছ থেকে ধান ও চাল কিনতে হবে। এটা না হলে কৃষক ন্যায্য দাম পাবে না। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

আগামী সোমবার অনুষ্ঠেয় খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় চলতি মৌসুমের বোরো চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হবে। একই বৈঠকে গমের সংগ্রহ মূল্যও নির্ধারণ করা হবে। তবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বোরোর সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হলেও আগামী ১ মের আগে সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে পারবে না খাদ্য অধিদপ্তর। কারণ গুদামের চাল ও গম খালি না করলে নতুন চাল রাখার জায়গা নেই। এ কারণে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় ফেয়ার প্রাইস কার্ডের মাধ্যমে কত দরে চাল বিক্রি করা হবে তাও নির্ধারণ করা হবে। এ বিষয়ে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট (এফপিএমইউ) একটি প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে বলে জানা গেছে। তারা ১০ টাকা, ১২ টাকা বা ১৫ টাকা কেজি দরে ফেয়ার প্রাইস কার্ডে চাল বিক্রির প্রস্তাব দেবে বলে জানা গেছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১০ টাকা কেজি দরে ফেয়ার প্রাইস কার্ডে চাল বিক্রি করলে বর্তমান সরকারের একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে। কারণ ২০০৮ সালে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অনেকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যদিও বিষয়টি ওই সময় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে ছিল না। পরে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়াতে না পারায় বিরোধী রাজনৈতিক শিবির ক্ষমতাসীন দলকে বারবার কটাক্ষ করেছে। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হলেও ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির একটি ঝুঁকিও রয়েছে। তখন মিলাররা খোলাবাজার থেকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল কিনে বেশি দামে সরকারি গুদামে সরবরাহ করবে। সরকার একদিকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করলেও নতুন বোরো চাল কিনবে কমপক্ষে ৩২ টাকা কেজি দরে। চালের বাজারের সিন্ডিকেট ১০ টাকায় কিনে সেই চালই আবার ৩২ টাকায় বিক্রির সুযোগ খুঁজবে।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফয়েজ আহমদ কালের কণ্ঠকে জানান, ঠিক একই সময়ে কম দামে চাল বিক্রি ও বেশি দামে চাল কেনা হয় না। বিক্রি শেষ হলেই সাধারণত কেনা শুরু হয়। তবে কম টাকায় কিনে বেশি টাকায় খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে বিক্রির সুযোগ নেই। কারণ কম দামে যে চাল বিক্রি করা হবে তা পুরনো। এ চাল দেখলেই বোঝা যাবে। পুরনো চালের রং বদলে লালচে হয়ে যায়। আর নতুন চাল থাকে ঝকঝকে। তা ছাড়া চালের আর্দ্রতাও একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই কম দামে চাল কিনে বেশি দামে খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে বিক্রির সুযোগ নেই।


মন্তব্য