kalerkantho


মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি

বিচার বিভাগের সবাই ফেরেশতা নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



বিচার বিভাগের সবাই ফেরেশতা নয়

ফাইল ছবি

বিচার বিভাগ আলাদা দ্বীপ নয়। সব জায়গায় অনিয়ম থাকবে আর বিচার বিভাগের সব ফেরেশতা হয়ে যাবে, এটা হয় না। এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম; বিচার বিভাগেও কিছু অনিয়ম আছে। তবে সেটা ৫-১০ শতাংশের বেশি নয়। এ অনিয়ম রোধে আইন প্রণয়ন ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন মিলনায়তনে দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।

বিচার বিভাগ নিয়ে অবমাননাকর সমালোচনা না করার আহ্বান জানিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচারব্যবস্থা জনগণের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। যদি বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়, তাহলে তাদের আর যাওয়ার জায়গা থাকে না। তিনি বলেন, ‘বিচারব্যবস্থার ত্রুটি আছে, আসুন আমরা সেই ত্রুটি তুলে ধরি। আজকে যে বিচারব্যবস্থা আছে, তা যদি আমরা ধ্বংস করে ফেলি, কিছুই থাকবে না আমাদের। ’

অনুষ্ঠানে আইন কমিশনের সদস্য ড. এম শাহ আলমের দুটি বই ‘বাংলাদেশে আইনের সংস্কার ও আইন কমিশন’ এবং ‘সিলেক্টেড রাইটিংস অন ইন্টারন্যাশনাল ল : কনস্টিটিউশনাল ল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন ড. আবদুল্লাহ আল ফারুক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন ড. সরকার আলী আক্কাস।

আইন প্রণয়নে জাতীয় সংসদ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে মন্তব্য করে প্রধান বিচারপতি বলেন, আইন প্রণেতাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আইন বিষয়ে চর্চা না করা। এ কারণে আইন প্রণয়নে দুর্বলতা থেকে যায়। আইন ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ফলে জনগণ ভোগান্তিতে পড়ে। তিনি বলেন, দেশের বেশির ভাগ আইন অনেক পুরনো, সেগুলো প্রায় অচল। এগুলোর কার্যকারিতা অনেক কম। এগুলোর ব্যাপক সংস্কার করা না হলে বিচার বিভাগ মুখ থুবড়ে পড়বে।

প্রধান বিচারপতি উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে নতুন পরিপত্র, নির্দেশনা জারি করা হচ্ছে। এগুলোর বেশির ভাগের বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়। অকার্যকর আইনের কারণে বিচার বিভাগের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এগুলোর কারণে অনেক সময় বিচারপ্রার্থীরা বৈষম্যের শিকার হয়।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনু হত্যার বিচার প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, তনু হত্যার ঘটনা একটি আধুনিক অপরাধ। পুরনো মানসিকতায় তদন্ত করে এর সুষ্ঠু বিচার সম্ভব নয়। বর্তমান সমাজব্যবস্থার সঙ্গে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের মিল নেই। এসব ঢেলে সাজাতে হবে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচারব্যবস্থার তিনটি প্রতিবন্ধকতা—এক. বিচারব্যবস্থার বাণিজ্যিক হয়ে যাওয়া, দুই. প্রচলিত আইনগুলোর অচল হয়ে পড়া এবং তিন. অধিকার-সচেতন ব্যক্তিদের দায়িত্ব ভুলে যাওয়া।

সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘বিচারব্যবস্থার মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য জনমত গঠন করতে হবে। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে; চিন্তাচেতনার পরিবর্তন করতে হবে। মুখে রুল অব ল, ইনডিপেনডেন্ট জুডিশিয়ারির কথা বলব অথচ নিজে পরিবর্তিত হব না, তাহলে কোনোমতেই এখানে কিছু করা যাবে না। ’

লেখক ড. শাহ আলম বলেন, ইংল্যান্ড ও ভারতের আইন কমিশন সুপারিশ করলে তার ৮০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়। এ দেশে প্রক্রিয়াগত ও আমলাতান্ত্রিক বাধার কারণে আইন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না।

সভাপতির বক্তৃতায় ড. মিজানুর রহমান বলেন, বিচারব্যবস্থাকে হতে হবে দরিদ্রবান্ধব, জনবান্ধব। এ জন্য আইন ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।


মন্তব্য