kalerkantho


আজ ফাইনাল

ওয়েস্ট ইন্ডিজ না ইংল্যান্ড

মাসুদ পারভেজ   

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ওয়েস্ট ইন্ডিজ না ইংল্যান্ড

এক দলের মারদাঙ্গা ব্যাটিং নিয়ে সবাই সরব ছিলেন বলে আলোচনাটা এত দিন ওঠেইনি যে নীরবে আরেক দলও কোনো অংশে কম যায়নি। কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আজকের ফাইনালের আগে তুল্যমূল্য বিচারে দেখা যাচ্ছে বেশিই গেছে বরং।

এই আসরে বাউন্ডারি আর ছক্কা থেকে আসা ইংল্যান্ডের রান যেখানে ৫১৬, সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আরো ৫৬ কম!

কাজেই মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালের পর ড্রেসিংরুমে কিংবা কলকাতার হোটেলে ড্যারেন সামি, ক্রিস গেইল ও ডোয়াইন ব্রাভোদের আগাম ‘চ্যাম্পিয়ন ড্যান্স’ কিছুতেই আজ ক্যারিবীয়দের চূড়ান্ত সাফল্যের নিশ্চয়তা হয়ে থাকছে না। যাবতীয় ভবিষ্যদ্বাণী আর অনুমান

মিথ্যে প্রমাণ করে ফাইনালে উঠে আসা ইংল্যান্ডও তো দুর্দান্ত ক্রিকেটে বিমোহিত করে দেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রেখে দিচ্ছে। দুয়েমিলে জমজমাট ক্রিকেটের সম্ভাবনায় আবার দুই দলকেই হাতছানি দিয়ে ডাকছে অনন্য এক অর্জনও।

দুই দলের সামনেই প্রথম দল হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সুযোগ। ২০১০ সালে এই ফরম্যাটে বিশ্বকাপজয়ী ইংল্যান্ডের অধিনায়ক পল কলিংউড উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত আছেন এবারের দলের সঙ্গেও। তিনি সংস্কার থেকে এউইন মরগানদের বুঝিয়েছেন যে তাঁরাই চ্যাম্পিয়ন হবেন! কারণ ছয় বছর আগের আসরের মতো এবারও তো ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরেই শুরু হয়েছে ইংলিশদের বিশ্বকাপ! কিন্তু ফাইনালে তো সেই ক্রিস গেইলের সামনেই পড়তে হচ্ছে, যাঁর ৪৭ বলের সেঞ্চুরিতে উড়ে গিয়েই মুম্বাইতে অভিযান শুরু হয়েছিল মরগানদের।

সেই মুম্বাইতেই সেমিফাইনাল থেকে ভারতকে বিদায় করার দিন দেখা গেছে দ্রুতগামী ‘ক্যারিবীয় ক্যারাভান’ শুধুই গেইল নামের চাকায় চলে না। একই রকম নৃশংসতায় প্রতিপক্ষের বোলারদের পিষ্ট করতে জানা আরো অনেক চাকাও তো আছে ড্যারেন সামির দলে। লেন্ডল সিমন্সের মতো কেউ কেউ আরেকজনের ইনজুরিতে দূর ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে উড়ে এসেই প্রতিপক্ষের বিপর্যয়ের কারণ হতে জানেন।

আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে অবিকল ‘গেইল’ হয়ে উঠতে জানেন আন্দ্রে রাসেলের মতো শক্তিমান আরেক ব্যাটসম্যানও। বেধড়ক বল পেটানোয় দক্ষ ব্রাভো, কার্লোস ব্রাথওয়েট কিংবা সামিদের তো সেদিন মুম্বাইতে নামতেই হয়নি।

অথচ ক্যারিবীয়দের সেদিনের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ের ভয়াবহতা ‘হাইলাইটস’ দেখে বুঝতে হয়েছে মরগানদের! বিস্ময়কর শোনালেও এটিই সত্যি। কারণ নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে আগেই ফাইনালে উঠে থাকা ইংল্যান্ড দল দ্বিতীয় সেমিফাইনালের সিংহভাগ সময়ই পার করেছে আকাশে। দিল্লি থেকে উড়াল যান তাঁদের নিয়ে আসছিল ফাইনালের শহর কলকাতায়। নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার ধসে হতাহতের ঘটনায় এমনিতেই শোকাচ্ছন্ন শহর আজ বিষণ্নতা ঝেড়ে ফেলে চনমনেও হয়ে উঠত যদি ফাইনালে মহেন্দ্র সিং ধোনিরা থাকতেন। কিন্তু তাঁদের বিদায়ে নিস্তরঙ্গ ফাইনালকে মারকাটারি ব্যাটিংয়ে প্রাণ দেওয়ার সামর্থ্য মরগানের দলেরও কম নেই। এর স্বপক্ষে প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখিত পরিসংখ্যান তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে দক্ষিণ আফ্রিকার ২৩০ রান তাড়া করার দুঃসাহসিক অভিযানের সাফল্যও। এ কারণেই মরগানের দলের ‘ভয়ডরহীন’ এক ভাবমূর্তিও দাঁড়িয়ে গেছে।

নিশ্চিতভাবেই আজকের ম্যাচেও তারা বুক চিতিয়েই লড়বে। পাল্টা হুঙ্কারে প্রতিপক্ষকে ভড়কে দিতে জানা ইংলিশদের পক্ষে অতীত ইতিহাসই যা একটু ভয় ধরানোর মতো। বিশেষ করে এটি যখন বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং সেখানে প্রতিপক্ষ আবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তার ওপর ফাইনালের ভেন্যু যখন আবার সেই ইডেন গার্ডেনস। ইংলিশদের একাধিক স্বপ্নভঙ্গের বেদনার সঙ্গে যোগসূত্র আছে দুটোরই। লর্ডসে ১৯৭৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে ক্যারিবীয়দের সামনে পড়েই বিসর্জনে গিয়েছিল ইংলিশদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বাসনা। আট বছর পর সেই দুঃখ ভোলার মঞ্চে পৌঁছেও আরেকবার হতাশায় বিলীন হতে হয়েছিল তাদের। আর ১৯৮৭-তে অস্ট্রেলিয়ার কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালের হার এই ইডেন গার্ডেনসেই। যেখানে দলের ভালো অবস্থায় রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনার জন্য তখনকার ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক গ্যাটিংও ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছেন খুব! আজ আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল সেই ইডেনেই এবং সেখানে আছে ৩৭ বছর আগে তাদের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজও।

টেস্ট ক্রিকেটে ক্যারিবীয়দের সোনালি দিন অস্তাচলে গিয়েছে বহুদিন হয়। কিন্তু ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাটে তাদের খেলায় এখন গনগনে সূর্যের তেজ। ২০১২ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়া দলটি ২০১৪-তেও পৌঁছেছিল শেষ চারে। এরপর এবার আবার ফাইনালে ওঠায় সামির নিজ দলকে ‘দারুণ ধারাবাহিক’ অ্যাখ্যা দেওয়া নিয়ে কারোরই আপত্তি নেই নিঃসন্দেহে। ভীষণ আমুদে স্বভাবের এই ক্রিকেটারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের নেপথ্যে আবার নানা ক্ষোভ-বিক্ষোভও লুকিয়ে আছে। সামিদের এই বিশ্বকাপ খেলাও নিশ্চিত ছিল না। বেতন-ভাতা নিয়ে বোর্ডের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন তাঁরা। সেই সঙ্গে টুর্নামেন্ট-পূর্ব আলোচনায় তাঁদের সেভাবে পাত্তা না দেওয়া নিয়েও অসন্তোষ লুকাননি সামি। এসবই তাঁদের দল হিসেবে ঝলসে ওঠার ক্ষেত্রে আরো ‘একতাবদ্ধ’ করেছে বলে দাবি ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়কের।

মারদাঙ্গা ব্যাটিংয়ের পরিসংখ্যানে ইংলিশদের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও অন্য এক ‘একতা’র জোর সম্ভবত ক্যারিবীয়দেরই বেশি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০১০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা একজনই শুধু আছেন এবারের ইংল্যান্ড দলে। তিনি অধিনায়ক মরগান। আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০১২-র ফাইনাল খেলা ক্যারিবীয় দলের কারা এবার আছেন, একটু দেখে নেওয়া যাক। গেইল, ব্রাভো, সামি, রাসেল, মারলন স্যামুয়েলস, দীনেশ রামদিন, স্যামুয়েল বদ্রি এবং এমনকি জনসন চার্লসও। ২০২০ সালে পরের আসরে এঁদের সিংহভাগই থাকছেন না বলে ট্রফি দিয়ে তাঁদের বিদায় রাঙানোর লক্ষ্যও আছে ক্যারিবীয়দের। যে বিদায়ে বিষাদের রং ছড়িয়ে দিতে কম তৈরি হয়ে নেই অন্য চেহারায় দেখা দেওয়া এই ইংল্যান্ডও।


মন্তব্য