kalerkantho

সোমবার । ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ । ৩ মাঘ ১৪২৩। ১৭ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ঘুরেফিরে স্বজনদেরই জিজ্ঞাসাবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা   

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ঘুরেফিরে স্বজনদেরই জিজ্ঞাসাবাদ

গতকাল জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কুমিল্লা সিআইডি অফিস থেকে বেরোনোর সময় তনুর মা-বাবা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর হত্যা মামলা তদন্তে এসে গতকাল শনিবার আবারও দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তনুর পরিবারের সদস্যদের। এবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। গতকাল ঢাকা থেকে আসা সিআইডির একটি দল ও কুমিল্লার সিআইডি যৌথভাবে এই জিজ্ঞাসাবাদ চালায়। এর আগে তারা কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

এর আগে তনুর মা-বাবা, ভাইবোনকে গত ২৬ মার্চ রাত সাড়ে ১২টায় মুরাদগরের মির্জাপুর থেকে র‌্যাব, পরদিন রবিবার দুপুরে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে ডিবি নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। দুটি সংস্থার কার্যালয়ে নিয়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গতকালও বিকেল ৩টা থেকে কুমিল্লা পুলিশ ভবনে সিআইডি কার্যালয়ে সাত ঘণ্টা ধরে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ ছাড়া মামলাটি দায়েরের পর থেকে পুলিশ তনুর বাড়িতে গিয়ে তাঁর মা-বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ ছাড়া অন্যান্য সংস্থাও তদন্তের প্রয়োজনে তাঁদের নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

এদিকে একটি সূত্র জানায়, তনুর লাশের প্রথম ভিসেরা পরীক্ষায় বিষের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।  

সূত্র জানায়, সিআইডি ঢাকার সিনিয়র পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আকন্দের নেতৃত্বে সিআইডির দলটি গতকাল সকাল ৯টায় সেনানিবাসে যায় এবং দুপুর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে। সেখানে তারা তনুর লাশ উদ্ধারের স্থানসহ বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে।

পরে বিকেল ৩টার দিকে তারা তনুর বাবা এয়ার হোসেন, মা আনোয়ারা বেগম, ভাই আনোয়ার হোসেন রুবেল, নাজমুল হাসান, চাচাতো বোন নাইজু জাহানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সিআইডির কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার ড. মো. নাজমুল করিম খান এ তথ্য জানান।

সিআইডি দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা থেকে আসা সিআইডির দুজন সিনিয়র এসপি, কুমিল্লা সিআইডির সিনিয়র এসপি ড. নাজমুল করিম খান, কুমিল্লার সিনিয়র এএসপি জালাল উদ্দিন আহমেদ, এএসপি মোজাম্মেল হক, পরিদর্শক শাহনেওয়াজ, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীমসহ সিআইডির আরো কয়েকজন সদস্য।

জিজ্ঞাসাবাদের পর সিআইডি কর্মকর্তা আবদুল কাহ্হার আকন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ঘটনা জানার চেষ্টা করছি। তনুর পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। ’

তনুর বাবা এয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি আগে যা বলেছি, এখনো তাই বলছি। ’

নিহত তনুর বাবা এয়ার হোসেন এ প্রতিবেদককে জানান, যা কিছু হয়েছে তা তনু যেখানে প্রাইভেট পড়াত সেদিক থেকেই হয়েছে। সৈনিক ক্লাবের দিক থেকেই হয়েছে। ওখানে রাতে ক্যারমসহ বিভিন্ন খেলাধুলা হয়।

এদিকে তনু নিহত হওয়ার স্থানের যেসব জিনিস জব্দ করা হয়েছে, সেগুলো মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সাইফুল ইসলাম নিজে সংগ্রহ করেছেন, নাকি তাঁকে কেউ সংগ্রহ করে দিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদি কেউ সংগ্রহ করে দিয়ে থাকে তাহলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল তা ক্ষীণ হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে কারো গাফিলতি আছে কি না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছে।

এ ব্যাপারে এসআই সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কুমিল্লা সেনানিবাস কর্তৃপক্ষ এসব আলামত তাঁর কাছে হস্তান্তর করে। তিনি ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করেননি। জব্দকৃত আলামত তাঁর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে মাত্র।

তাঁকেও গতকাল সিআইডির তদন্তদল জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

পুরনো মানসিকতায় তদন্ত করে সুষ্ঠু বিচার সম্ভব নয়—প্রধান বিচারপতি : তনু হত্যার বিচার প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, তনু হত্যার ঘটনা একটি আধুনিক অপরাধ। পুরনো মানসিকতায় তদন্ত করে এর সুষ্ঠু বিচার সম্ভব নয়। বর্তমান সমাজব্যবস্থার সঙ্গে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের মিল নেই। এসব ঢেলে সাজাতে হবে। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন মিলনায়তনে দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

গোয়েন্দারা ফেল করেনি—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : আমাদের মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, তনু হত্যা মামলায় গোয়েন্দা বাহিনী কিংবা নিরাপত্তা বাহিনী ফেল করেনি। তদন্ত অনুযায়ী সঠিক কাজ করে খুব শিগগির এ বিষয়ে জানা যাবে। গতকাল দুপুরে মাদারীপুরের কুলপদ্বীতে আনসার ও গ্রামরক্ষা বাহিনীর এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

আজ ও কাল সারা দেশে ছাত্র ধর্মঘট : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, তনু হত্যার প্রতিবাদ এবং দোষীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে আজ রবিবার সারা দেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হবে। গত মঙ্গলবার শাহবাগ মোড়ে অবরোধ শেষে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে এই ধর্মঘটের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ধর্মঘটের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বাম ছাত্রসংগঠনের জোট প্রগতিশীল ছাত্রজোট, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য এবং ছাত্র ইউনিয়ন। এ ছাড়া আগামীকাল সোমবার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ছাত্র ধর্মঘট কর্মসূচি রয়েছে।

এদিকে তনুসহ দেশে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের প্রতিবাদে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাঠি মিছিল করেছে ছাত্র ইউনিয়ন। সংগঠনটির ‘প্রীতিলতা ব্রিগেড’-এর ব্যানারে এই মিছিল হয়। মিছিলটি রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হয়ে টিএসসি শাহবাগ ঘুরে আবার টিএসসিতে গিয়ে শেষ হয়। একই ব্যানারে আগামী ৮ এপ্রিল রাজু ভাস্কর্যে নারীদের নিজের আত্মরক্ষায় প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করবে ছাত্র ইউনিয়ন।

লাঠি মিছিল শেষে ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি লাকী আক্তার বলেন, ‘তনু হত্যার পর অনেক দিন অতিবাহিত হলেও এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। রাষ্ট্র ধর্ষকদের বিচার করবে না। এ জন্য নারীদের ঐকবদ্ধ হতে হবে। নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত হতে হবে। ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আগামী শুক্রবার নারীদের কারাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ’

উল্লেখ্য, গত ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় বাসার অদূরে একটি জঙ্গলে তনুর লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তনুর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সাবেক অফিস সহায়ক এয়ার হোসেন বাদী হয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। পুলিশ ও ডিবির পর মামলাটি এখন তদন্ত করছে সিআইডি। গত ৩০ মার্চ সিআইডি ঢাকার সিনিয়র পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আকন্দকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত সহায়ক কমিটি গঠন করা হয়।


মন্তব্য