kalerkantho


হাজারীবাগ ট্যানারি

স্থানান্তরে গড়িমসি ব্যবসায়ীদের নানা অজুহাত

তৌফিক মারুফ   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



স্থানান্তরে গড়িমসি ব্যবসায়ীদের নানা অজুহাত

রাজধানীর হাজারীবাগে ট্যানারিতে কাঁচা চামড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ করার পরও গতকাল সেখানে চামড়াবাহী গাড়ি ঢুকেছে, কাজও চলেছে বরাবরের মতোই। ছবি : কালের কণ্ঠ

জুমার নামাজের আগেও দেয়ালের গা ফাঁকাই ছিল; কিন্তু নামাজের পরই দেখা গেল হাজারীবাগের সনাতনগড় এলাকার লুনা ট্যানারির দেয়ালের গায়ে সাঁটানো হয়েছে বড় আকারের ব্যানার। তাতে লেখা, ‘চামড়াশিল্পের সঙ্গে অস্থায়ীভাবে জড়িত সব শ্রমিক-কর্মচারী, কেমিক্যাল ব্যবসায়ী, লেদার টেকনোলজিস্ট, লেদার ম্যানুফ্যাকচারার্স, রপ্তানিকারকসহ সবার পুনর্বাসন ব্যতীত পরিবেশবান্ধব চামড়াশিল্প হতে পারে না।

’ ব্যানারের নিচের অংশে লেখা, ‘চামড়াশিল্প-সংশ্লিষ্ট সংগঠন সমন্বয় কমিটি’।

রাজধানীর জিগাতলা মনেশ্বর রোড হয়ে হাজারীবাগের ট্যানারি ঘাঁটির দিকে ঢুকতে ঢুকতে যথারীতি আগের মতোই উৎকট গন্ধের মাত্রাও বাড়তে থাকে সনাতনগড় এলাকা থেকেই। ভেতরের দিকে এগলি-ওগলির সব জায়গায় ট্যানারি কারখানা। গন্ধের সঙ্গেই ভেসে আসে কারখানার বিভিন্ন যন্ত্রের শব্দ। নর্দমা ধরে রঙিন তরল নির্গত হতেও দেখা গেল। তবে অন্য দিনের মতো গতকাল শুক্রবার হাজারীবাগের রাস্তায় দিনভর কাঁচা চামড়া বহনকারী ঠেলাগাড়ি, পিকআপ বা রিকশাভ্যান চোখে পড়েনি; যদিও প্রক্রিয়াজাত শুকনো চামড়া ওঠানো-নামানো করতে দেখা যায় অনেক জায়গায়। হাজারীবাগে কাঁচা চামড়া প্রবেশে সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রথম দিন গতকাল দেখা গেল এমন দৃশ্য। গত ২০ মার্চের আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। আর প্রথম দিনের পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্থানীয় অনেকের আশঙ্কা, এবারও নানা অজুহাতে ট্যানারিশিল্পের সঙ্গে যুক্ত লোকজন সরকারের উদ্যোগ ব্যর্থ করে দিতে সক্রিয় হয়েছে।

তবে গতকাল রাতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে অনেক অজুহাত দেওয়া হয়েছে, এখনো চেষ্টা চলছে, বহু সময় দেওয়া হয়েছে। এবার আর সরকারের ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা এবার কোনোভাবেই পিছু হটছি না। যতই ছলচাতুরী করা হোক, লাভ হবে না। ’ এ জন্য তিনি এলাকাবাসী ও গণমাধ্যমকে সরকারের পাশে থাকার আহ্বান জানান।

সনাতনগড়ের বাসিন্দা সুলতান আহম্মেদ জুমার নামাজ পড়ে বাসায় ফেরার পথে বললেন, ‘আগে ভাবতাম এই এলাকার মানুষ এখানে কিভাবে বসবাস করে? একপর্যায়ে একটি ডেভেলপার কম্পানির তালে পড়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই কম দামে ফ্ল্যাট পেয়ে দুই বছর আগে এখানকার বাসিন্দা হয়ে গেলাম। তখন শুনছিলাম, যেকোনো দিন এখান থেকে ট্যানারি চলে যাচ্ছে। কিন্তু সেই দিন যে আসলে কবে আসবে তা বুঝতে পারছি না। কেন এখানে ফ্ল্যাট নিয়েছি, তা নিয়ে এখন দিনরাত বউ-বাচ্চার কথা শুনতে হচ্ছে। দুর্গন্ধের মধ্যে এখানে বসবাস করাই মুশকিল। ’

তাঁর কথা টেনে নিয়ে পাশের আরেক মুসল্লি বললেন, ‘এই ট্যানারি নিয়া সরকার যে টানাটানির চক্করে পড়ছে তা এত সহজে শ্যাষ অইবার লাগছে না, দেখেন না আইজক্যা কেবল ব্যানার ফিট করবার লাগছে, সামনে আরো কত্ত কিছু অইবো দেখবার থাকেন। এইহানতে সহজে তারা যাইবার লাগছে না। তারা সাভারেও প্লট রাখব, আবার এইহানতেও থাকবার চাইব। ’

যেখানে ব্যানার সাঁটানো, ঠিক তার খানিকটা পাশেই চায়ের দোকানে পাওয়া যায় লুনা ট্যানারির সুপারভাইজার হাবিবুর রহমানকে। জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘একেকটি ট্যানারি কারখানা স্থানান্তর এত সহজ নয়। আরো অনেক সময় দিতে হবে। তা ছাড়া এই শ্রমিক-কর্মচারীদের কী হবে, সেটাও ঠিক করতে হবে। শত শত শ্রমিক তো চাকরি হারাবে। আবার ছোটখাটো অনেক কারখানা একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে। এখানকার সব ট্যানারি সাভারে প্লটও পায়নি। এসব বিষয়ের সুরাহা কী?’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ট্যানারির মালিক দিলেন রাজনৈতিক জটিলতার তথ্য। জানালেন, সাভারে যখন প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয় তখন সরকারে ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। ফলে তখন বেশির ভাগ প্লট পেয়েছেন বিএনপি-জামায়াতপন্থী ট্যানারি মালিকরা। তখন আওয়ামী লীগপন্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন। পরে বিভিন্ন কায়দায় কেউ কেউ চেষ্টা-তদবির করে কয়েকটি প্লট পেলেও হাজারীবাগের অনেকেই ব্যর্থ হন। ফলে এখন হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের প্রশ্নে স্থানীয় আওয়ামী লীগপন্থী ট্যানারি মালিকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ফলে স্থানান্তর প্রক্রিয়া সফল না করা বা ধীরগতিতে রাখতে ভেতরে ভেতরে তাঁরাই বেশি তৎপর। এ ক্ষেত্রে সাধারণ ট্যানারি মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে স্থানীয় অনেক বিএনপি-জামায়াতপন্থী মালিক-শ্রমিকও সাভারের ট্যানারি পল্লীতে নিজের প্লট ধরে রাখার পাশাপাশি হাজারীবাগেও বহাল থাকার স্বার্থে সুবিধাবঞ্চিত আওয়ামী লীগপন্থী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছেন। ফলে পরিবেশগত স্বার্থ বিপন্ন করে হলেও এখন রাজনীতির স্বার্থেই আরো সময় হাজারীবাগেই ট্যানারি টিকে থাকছে।

নিজেদের বঞ্চিত হওয়ার কথা স্বীকার করলেন হাজারীবাগ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইলিয়াছুর রহমান বাবুল। হাজারীবাগের আরব ট্যানারির এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি ও বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারি দল করি। ফলে সরকারের সিদ্ধান্ত আমাদের মানতেই হবে। আমরা মানবও, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বিএনপির আমলে সাভারের ট্যানারিতে প্লট দেওয়া হয়েছে। আমরা যাঁরা আওয়ামী লীগ করি তাঁদের বেশির ভাগই তখন এলাকায় থাকতে পারিনি বিএনপির অত্যাচারে। ফলে তখন আমরা সাভারের প্লটের জন্য আবেদন করারও সুযোগ পাইনি। আমি নিজেই এমন ভুক্তভোগী। পরে অনেক চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত আমার কপালে সাভারের ট্যানারিতে প্লট জোটেনি। তাহলে আমি আমার ট্যানারি কারখানা নিয়ে কোথায় যাব? আমার ব্যবসার কী হবে। এত যন্ত্রপাতি কোথায় স্থানান্তর করব। আমি ও আমার মতো যাঁরা আছেন তাঁরা তো অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছি। ব্যাংকও তো কোনো সহায়তা সহজে দিতে চায় না। সুতরাং আরো সময় দিতে হবে। ’

তবে শিল্পসচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘যাঁরা ভাড়াটিয়া হিসেবে হাজারীবাগে ট্যানারি গড়েছেন তাঁরা অনেকে প্লট পাননি, এ ছাড়া সবাই পেয়েছেন। রাজনৈতিক কারণে কেউ বঞ্চিত হননি। এসব অভিযোগ ঠিক নয়। গত আট বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আছে। এই সময়েও অনেক প্লট দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি না পেয়ে থাকেন তবে নিশ্চয় না পাওয়ার মতো কোনো আইনি যুক্তিযুক্ত কারণ থাকতে পারে। ’

সাভারে স্থানান্তর প্রসঙ্গে ট্যানারি মালিক ইলিয়াছুর রহমান বাবুল বলেন, ‘আগের সরকারও ট্যানারি স্থানান্তরে তেমন একটা সিরিয়াস ছিল না, আবার মালিকরাও বিষয়টিকে সিরিয়াসলি নেননি। ফলে যাঁরা সাভারে আগেভাগেই প্লট পেয়েছেন তাঁরা সেখানে স্থাপনা নির্মাণে মনোযোগ দেননি। এখন যেভাবে সরকার কঠোর অবস্থানে এসেছে তাতে মালিকদের টনক নড়েছে, তাঁরা এখন ধরেই নিয়েছেন এখানে আর থাকা যাবে না। পরিস্থিতি জটিল মনে হচ্ছে। হাজারীবাগে অনেকেই যেনতেনভাবে একেকটি ঘরে কারখানা বানিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। সাভারে তেমন সুযোগ নেই। সেখানে খুবই ব্যয়বহুল স্থাপনা নির্মাণ করতে হচ্ছে। ফলে একসঙ্গে সব দিক সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কেবল ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়েই সাভারের সব স্থাপনা সম্পন্ন করা যাবে না। সরকারকে এ দিকটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ’

সাভারের ট্যানারিশিল্পের প্রস্তুতি সম্পর্কে শিল্পসচিব বলেন, যা বাকি আছে শিল্প-কারখানাগুলো সেখানে গেলেই দ্রুত সময়ের মধ্যে তা শেষ হয়ে যাবে। সব সমস্যাই দ্রুত সমাধান করা যাবে।

সরকারের নির্দেশনার আওতায় গতকাল হাজারীবাগে প্রবেশের সব পথে বসানো হয় পুলিশ চেকপোস্ট। এর মধ্যেই সকালে কাঁচা চামড়াবাহী একটি পরিবহন হাজারীবাগে ঢোকার পর পুলিশ তা আটক করে। পরে অবশ্য ওই পরিবহনটি ছেড়ে দেওয়া হয়।

হাজারীবাগ থানার ওসি মীর আলিমুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, কাঁচা চামড়াবাহী কোনো পরিবহনই হাজারীবাগে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ঢুকতে গেলেই তা ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।


মন্তব্য