kalerkantho


সমুদ্রসীমার আকাশপথে আন্তর্জাতিক রুটে নিয়ন্ত্রণ নেই বাংলাদেশের

ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়নে ঢিলেমি

আশরাফুল হক রাজীব   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়নে ঢিলেমি

আন্তর্জাতিক আদালতে দীর্ঘ সময় মামলা লড়ার পর বিস্তীর্ণ সমুদ্রসীমা পাওয়া গেলেও এই সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত ব্লু ইকোনমির বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ঢিলেমি হচ্ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন মেয়াদি পদক্ষেপই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ব্লু ইকোনমি সংক্রান্ত একটি জাতীয় কর্মশালা করার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে গেছে। সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তদারকির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে দায়িত্ব দিয়েছে। এ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি সময়ে সময়ে সভা করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে তাদের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার তাগাদা দেয়। গত ২১ মার্চের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ মন্ত্রণালয়ই তা জমা দেয়নি বলে জানা গেছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, আগামী ২ এপ্রিল সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সমন্বয়ে ব্লু ইকোনমি বিষয়ে কর্মশালার সিদ্ধান্ত হলেও তা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলা ও জিএসবি (জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ) এ কর্মশালার আয়োজন করবে। তবে তিনি দাবি করেন, ব্লু ইকোনমির বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নে কোনো ঢিলেমি নয়, বরং দ্রুত করা হচ্ছে।

গত ৭ মার্চ সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সমন্বয় কমিটির বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে, বিশেষ করে সমুদ্রসীমার ওপর দিয়ে আকাশপথে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক রুটের ওপর বাংলাদেশের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাংলাদেশের মেরিটাইম এরিয়ার ওপর দিয়ে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক রুট এল-৫০৭ কলকাতা বিমানবন্দর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অন্য আন্তর্জাতিক রুট পি-৬৪৬-এর ওপরও বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের ওশান কোস্টাল রাডার এবং এ-সংক্রান্ত সরঞ্জাম থাকলে ওশান এয়ার কন্ট্রোল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা যাবে। তখন এল-৫০৭ এবং পি-৬৪৬-সহ আরো পাঁচটি রুট সৃষ্টি করা যাবে। এসব রুট থেকে প্রতিবার একটি বিমান যাওয়া-আসা বাবদ ৪৫০ ডলার মাসুল আদায় করা যাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এম সানাউল হক গত ২৪ মার্চ কালের কণ্ঠকে জানান, ৪০ বছর ধরে বাংলাদেশের একটিমাত্র রাডার ছিল, যা দিয়ে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। উপকূলবর্তী এলাকা ওই রাডারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে আরো রাডার বসানো হচ্ছে। এর ফলে বিমান চলাচল সংক্রান্ত পাঁচটি নতুন রুট চালু করা সম্ভব হবে।

বৈঠকে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আরো জানান, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মধ্যে সি ক্রুজ বা কোস্টাল ট্যুরিজমের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৯৭ সালে অনুমোদিত হলেও এখনো পর্যন্ত এর কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমুদ্রের কোন কোন এলাকায় কী কী মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ রয়েছে সে বিষয়ে দ্রুত জরিপে এ মন্ত্রণালয়ের কোনো আধুনিক জাহাজ নেই। বেশির ভাগ জাহাজে একটি ইঞ্জিন থাকায় ফিশিং বোটগুলো ৩৫ কিলোমিটারের বাইরে যেতে পারে না। অথচ সমুদ্রের ৬৬৪ কিলোমিটার পর্যন্ত বাংলাদেশের এলাকা। প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কার জাহাজ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় তারা গভীর সমুদ্রের মাছ ধরতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশে লং লাইন দিয়ে মাছ ধরা হয় এবং সমুদ্রে অ্যাকুয়াকালচারের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বাড়ানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ থাকার পরও লং লাইন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় না। সমুদ্রে অ্যাকুয়াকালচার পদ্ধতির ব্যবহারও শুরু হয়নি। এ ছাড়া সমুদ্রে মৎস্যসম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দক্ষ জনবল গড়ে ওঠেনি।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিজস্ব জাহাজের পাশাপাশি ভাড়ায় জাহাজ সংগ্রহের পদক্ষেপ নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ। মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে মেরিন ফিশারিজ ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য জরিপ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এফভি মীনসন্ধানী নামের জরিপ জাহাজ ক্রয়প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। একটি জাহাজের মাধ্যমে ব্যাপক জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন সংস্থার পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। দেশের সমুদ্রসীমায় বিদেশি জাহাজ বা ট্রলারের অননুমোদিত ফিশিং এবং অনুপ্রবেশ রোধে মনিটরিং ও সার্ভেইল্যান্স কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক ফিশিং ট্রলারের রেজিস্ট্রেশন, সি-ওয়ার্দিনেস ও ফিশিং লাইসেন্স ইস্যুর আগে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর, নৌবাণিজ্য অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের প্রতিনিধি যৌথ জরিপ পরিচালনা করছে। যেসব জেলে মাছ ধরতে গিয়ে বিদেশের কারাগারে বন্দি আছে তাদের দেশে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্বল্প সময়ে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য প্রতিটি ট্রলারে ইফেক্টিভ কমিউনিকেশন ইকুইপমেন্ট স্থাপন করা হচ্ছে। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ আহরণের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মেরিন ফিশারিজ ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্প থেকে বিদেশে ১০ জন কর্মকর্তাকে এবং দেশে ৯৯০ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। জরিপ ও গবেষণা জাহাজের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের পরিচিতি ও পরিচালনার জন্য স্কিপার, ইঞ্জিনিয়ার, জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার, মেট ও ট্রল মাস্টারসহ পাঁচজন মালয়েশিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এস্টুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় ভোলার দক্ষিণে চর মাইনকা ও চর মনতাজে দুটি ক্রস ড্যামের নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। সন্দ্বীপ এলাকায় ক্রস ড্যাম নির্মাণ করা যাবে কি না এবং তা নির্মাণ করলে ভোলায় এর কোনো প্রভাব পড়বে কি না সে বিষয়ে গবেষণার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার তেল, গ্যাস ও মৎস্যসম্পদ আহরণ করতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য ১৬০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে মেরিন রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং, শ্যুটব্লাস্টিং অ্যান্ড মেরিন পেইন্টিং ও ইলেকট্রিক্যাল মেইনটেন্যান্স ফর মেরিন ভেসেল প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা হবে। চট্টগ্রামে নতুন একটি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি স্থাপনের প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের কলাতলী থেকে ইনানী পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ নির্মাণে প্রথম পর্যায়ের কাজ বাস্তবায়নের পর ইনানী থেকে সিলখালী পর্যন্ত কাজ বাস্তবায়ন চলছে। সিলখালী থেকে টেকনাফ অংশে প্রকল্পের শুধু ভূমি অধিগ্রহণ হয়েছে। সীতাকুণ্ড থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কম্পানি চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে ২০১৫ সালে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে গত অর্থবছরে সমুদ্রপথে ছয় হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। এ জন্য ৬০০ কোটি ডলার জাহাজ ভাড়া দিতে হয়েছে। অধিকাংশ জাহাজ বিদেশি মালিকানাধীন থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার বেশির ভাগই বিদেশে চলে যায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১০৫ মিলিয়ন ইউরোতে ইতালি থেকে চারটি জাহাজ কেনা হচ্ছে। দুটি প্যাট্রল ভেসেল ও দুটি ফাস্ট প্যাট্রল বোট কেনার জন্য চুক্তি হয়েছে। তিনটি ইনশোর প্যাট্রল ভেসেল, একটি ফ্লোটিং ক্রেন ও ছয়টি হাইস্পিড বোট নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কোস্ট গার্ডের তিনটি স্টেশনে প্রশাসনিক ভবন ও নাবিক নিবাস নির্মাণ প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সমন্বয় কমিটির বৈঠকে শুধু জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে নতুন সমুদ্রসীমা অর্জনের ফলে অফশোর এলাকায় নতুন বিডিং রাউন্ড আহ্বানের জন্য সময়োপযোগী করে মডেল পিএসসি ২০১৫-এর সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্র অঞ্চলে ১২, ১৬ ও ২১ নম্বর ব্লক থেকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য ইওআই আহ্বান করা হয়েছে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা হচ্ছে, মডেল অ্যাগ্রিমেন্ট অনুসরণে অফশোরে নন এক্সক্লুসিভ সার্ভে/মাল্টি ক্লায়েন্ট সিসমিক সার্ভে কার্যক্রম দুই বছরে সমাপ্ত করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে চলতি বছর মডেল পিএসসি চূড়ান্ত হলে পরবর্তী অফশোর বিডিং আহ্বান করার বিষয়টি রয়েছে। সমুদ্রের কোন কোন এলাকায় কী কী খনিজসম্পদ ও মূল্যবান অন্যান্য সম্পদ রয়েছে তা দ্রুত সার্ভে করার লক্ষ্যে নিজস্ব জাহাজ কেনার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে জিএসবি।


মন্তব্য