kalerkantho


মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা

বিশ্বের কাছে পাকিস্তানের নালিশ!

মেহেদী হাসান   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



বিশ্বের কাছে পাকিস্তানের নালিশ!

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ভয়াবহ গণহত্যার কথা স্বীকার করে আনুষ্ঠানিকভাবে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া দূরের কথা, উল্টো বাংলাদেশিদের সহায়তায় এগিয়ে আসা ভারতের বিরুদ্ধে বিশ্বের দরবারে নালিশ জানিয়েছে পাকিস্তান। গত জুন মাসে বাংলাদেশ সফরের সময় এ দেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা নিয়ে নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যকেই পুুঁজি করে সারা বিশ্বের কাছে ‘ভারতের স্বীকারোক্তি’ হিসেবে প্রচার করছে দেশটি।  

জানা গেছে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গত বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার প্রসঙ্গ ওঠে। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙায় ভারত সরকারের ভূমিকার কথা বলেছেন। পাকিস্তান কি এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলবে যাতে র (ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা) বেলুচিস্তান ও করাচিতে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজে উৎসাহিত না হয়?’

জবাবে পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘১৯৭১ সালের ঘটনাবলিতে ভারত রাষ্ট্রের ভূমিকা বিষয়ে বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে পাকিস্তান সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে আমরা ২০১৫ সালের ৯ জুন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আমাদের জোরালো অবস্থান তুলে ধরেছি এবং ভারতের নেতিবাচক ভূমিকার বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে বলে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। ’

পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরো বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানে হস্তক্ষেপের বিষয়ে ভারতের স্বীকারোক্তির বিষয়টি আমলে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ২০১৫ সালের ১১ জুন জাতীয় পরিষদে একটি প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছে। ’

স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার কথা বাংলাদেশ গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশি ও ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকাকে পাকিস্তান বরাবরই তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দাবি করে আসছে। তবে বিশ্ব সম্প্রদায় এ দেশে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন সম্পর্কে অবগত। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছিল প্রতিবেশী দেশ ভারতে। এমন পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়াটাই দেশটির জন্য যৌক্তিক ছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। সে সময় প্রাণ বাঁচাতে দেশছাড়া বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশিকে আশ্রয় ও সাহায্য দিয়েছিল ভারত। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণসহ সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভারত সহযোগিতা করেছে। পাকিস্তান নিজের নির্মমতাকে অস্বীকার করে বরাবরই ভারতের সহযোগিতাকেই তাদের দেশ ভাঙার জন্য দায়ী করে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত বছরের ৬ ও ৭ জুন ঢাকা সফর করেন। ওই সফরের শুরুতেই ছিল সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা। সফরের বিভিন্ন পর্বে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে বাংলাদেশিদের মুক্ত করতে ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভারতের ভূমিকা স্মরণ করা হয়েছে।

গত ৭ জুন নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় বঙ্গভবনে মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রাখা ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন। ওই অনুষ্ঠানে মোদি ১৯৭১ সালের ৬ জুন তৎকালীন ভারতের সংসদে বিরোধীদলীয় সদস্য হিসেবে বাজপেয়ির বক্তব্যের একটি অংশ তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাজপেয়ি বলেছিলেন, আমি মনে করি, দেরিতে হলেও আমরা সঠিক পথ বেছে নিয়েছি। ইতিহাস বদলের প্রক্রিয়া আমাদের চোখের সামনে শুরু হয়েছে এবং এই পার্লামেন্টে ভবিষ্যৎ উত্থাপিত হয়েছে। এই দেশ গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আমরা আত্মত্যাগরত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে শুধু কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধই করছি না, ইতিহাসের নতুন এক পথ খোঁজারও চেষ্টা করছি। আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা ও ভারতীয় জওয়ানরা একসঙ্গে যুদ্ধ করছে, রক্ত বিলিয়ে দিচ্ছে। এই রক্ত থেকে এমন সম্পর্কের সৃষ্টি হবে যা কোনো চাপে ভেঙে পড়বে না। কোনো কূটনীতিই এটি করতে পারবে না। বাংলাদেশের মুক্তি আসন্ন। ’

নরেন্দ্র মোদি ৭ জুন সন্ধ্যায় ঢাকা ছাড়ার আগে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঐতিহাসিক এক বক্তৃতায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন বাংলাদেশের কথা ভাবি, তখন গর্ব বোধ করি। কারণ আমাদের জওয়ানরাও এ দেশের জন্য রক্ত দিয়েছিল। ’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের রক্ত মিশে আছে উল্লেখ করে মোদি বলেছিলেন, ‘ওই যুদ্ধে ৯০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। তারা ভারতের হাতে ছিল। ভারতের সৈন্যরা তাদের ছেড়ে দিয়েছে। ’ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে শান্তিপ্রিয় ভারতের স্থায়ী সদস্য পদ পাওয়ার জন্য ওই একটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট বলে তিনি দাবি করেন।


মন্তব্য