kalerkantho


এক ডজন চুক্তি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে

আবুল কাশেম   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



এক ডজন চুক্তি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার হচ্ছে। এর উল্লেখযোগ্যই যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়েছে। এ অবস্থার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থপাচার প্রতিরোধ বিষয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ।

অর্থপাচার প্রতিরোধ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরো ১২টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষরের প্রস্তাব রয়েছে বাংলাদেশের। এর মধ্যে বিমান এবং সাইবার নিরাপত্তা বা তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়ও রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার এবং ‘বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠার জন্যও এমওইউ স্বাক্ষরের বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এসব চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হকের সভাপতিত্বে আগামী ৬ এপ্রিল আন্তমন্ত্রণালয় সভা ডেকেছে মন্ত্রণালয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুক্তরাষ্ট্র অনুবিভাগের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস মোট ১৩টি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের একটি প্রস্তাব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এসব চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক ডাকা হয়েছে।

এসব চুক্তির আওতায় কোন ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত হবে, তা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, পররাষ্ট্রসচিব ৪ এপ্রিল দেশে ফিরবেন। এর পরই আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে চুক্তিগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো প্রস্তাবে দুই দেশের মধ্যে ভূমিকম্প ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা, দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, দুই দেশের বিভিন্ন শহরের মধ্যে ট্রাফিক ও আবর্জনা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষণাপত্র বিনিময়, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন সার্ভিস প্রশিক্ষণ কেন্দ্রদ্বয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, নব্বইয়ের দশক থেকে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি, উভয় সরকারের সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উষ্ণ ছিল। তবে ড. ইউনূস, জিএসপি ও রাজনৈতিক নানা বিষয়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে এক ধরনের টানাপড়েন চলছে। তবে এর মধ্যেও টিকফা স্বাক্ষরিত হয়েছে, সিকিউরিটি ডায়ালগও চলছে।

‘আমার মনে হচ্ছে, বর্তমান সরকারের সঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ এখন বাড়ছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থপাচার প্রতিরোধ, বিমান ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে চুক্তি করার তাৎপর্য রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা পেতে হলে এক ধরনের সমঝোতা চুক্তির দরকার হয়। দুই দেশের সরকারের মধ্যে বোঝাপড়ার ঘাটতি দূর করতে এ ধরনের চুক্তি সহায়ক ভূমিকা রাখে। ’ বলেন দেলোয়ার।

অধ্যাপক দেলোয়ার আরো বলেন, বর্তমান সরকারের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হচ্ছে। এসব সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বাংলাদেশ লাভবান হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও কিছু ‘সফট’ বা নরম ইস্যুতে বোঝাপড়া করে আরো বড় বিষয়ে লাভবান হতে চাচ্ছে। বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর, বড় অবকাঠামো নির্মাণে চীন, জাপান ও ভারত কাজ পাচ্ছে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র পাচ্ছে না। কারণ দেশটির সঙ্গে সরকারের বোঝাপড়ায় ঘাটতি রয়েছে। মিয়ানমার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা সফল করতে বাংলাদেশকেও পাশে দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমারকে নিয়ে এ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন মেরুকরণ হবে। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী। এতে বাংলাদেশকে পাশে পেলে এ অঞ্চলের দুই বৃহৎ শক্তি চীন ও ভারতকে একই সঙ্গে চাপে রাখতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।

বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির ঘটনা তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফায়ারআই কম্পানিকে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঘটনা তদন্তে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে। অর্থ ফেরত পেতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে ফেডারেল রিজার্ভ, ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস ও বিশ্বব্যাংককে। প্রয়োজনে মামলা দায়ের করতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থপাচার প্রতিরোধ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তা চুরি হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে কিছুটা সহায়ক হতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন কর্মকর্তা। আর সাইবার নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সাইবার অপরাধ তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পাওয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি।

গত ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অর্থপাচারবিরোধী সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে সর্বোচ্চ অর্থপাচার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ২১তম। ওই বছর বাংলাদেশ থেকে ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ৭৭ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।  

অস্ট্রেলিয়ার পর যুক্তরাজ্য নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে যাত্রীবাহী বিমানে কার্গো বহন নিষিদ্ধ করেছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তদারকির কাজ ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের একটি কম্পানিকে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের যাত্রীবাহী বিমানের নিরাপত্তা নিয়েও বিভিন্ন সময় অভিযোগ তুলেছে কোনো কোনো দেশ। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিমান নিরাপত্তা বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তাব দিয়েছে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস।

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সম্পর্কে ভাটা পড়ে। ওই অবস্থার মধ্যে ২০১৩ সালের এপ্রিলে সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর একই বছরের জুনে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। জিএসপি পুনর্বহালের আশায় ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর ওয়াশিংটনে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম (টিকফা) চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশের সর্বশেষ কোনো চুক্তি। ঢাকা ও ওয়াশিংটনে এই ফোরামের দুটি বৈঠক হলেও জিএসপি পুনর্বহালের আশ্বাস না মেলায় এ চুক্তি অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা একাধিকবার বলেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।

টিকফা স্বাক্ষরের পরও বাংলাদেশের জিএসপি পুনর্বহাল হয়নি। পুনর্বহালের জন্য দেশটির দেওয়া ১৬ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, মূলত রাজনৈতিক কারণেই জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল করা হচ্ছে না। জিএসপি পুনর্বহালের জন্য দেশটির শর্ত কেয়ামত পর্যন্তও পূরণ করা সম্ভব হবে না।


মন্তব্য