kalerkantho

ভারতের বিদায়

ফাইনালে মুখোমুখি ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ড
♦ ভারত : ২০ ওভারে ১৯২/২
♦ ওয়েস্ট ইন্ডিজ : ১৯.৪ ওভারে ১৯৬/৩
♦ ফল : ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৭ উইকেটে জয়ী

মাসুদ পারভেজ   

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ভারতের বিদায়

৫১ বলে অপরাজিত ৮২ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচসেরা লেন্ডল সিমন্সকে কোলেই তুলে নিলেন তাঁর এক সতীর্থ; যদিও ক্রিস গেইলের ব্যর্থতার দিনে তাঁর অভাব ঘুচিয়ে দেওয়া বিস্ফোরণ দেখা গেছে আন্দ্রে রাসেলের ব্যাটেও। মাত্র ২০ বলে অপরাজিত ৪৩ রানের বিধ্বংসী ইনিংসই খেলেছেন তিনি। ছবি : এএফপি

মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন না হয় জুয়াই খেলেছিলেন। কিন্তু মহেন্দ্র সিং ধোনি একদমই তা খেলেননি।

১৯৯৩ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হিরো কাপের সেমিফাইনালের শেষ ওভারটি করানোর জন্য শচীন টেন্ডুলকারকে নিয়ে এসেছিলেন তখনকার ভারত অধিনায়ক। অথচ ব্যাট হাতে ভারতের বহু জয়ের নায়ক কলকাতার ইডেন গার্ডেনে হওয়া ওই ম্যাচে এর আগে এক ওভারও হাত ঘোরাননি। শেষ ওভারে ৬ রানের প্রয়োজনীয়তা যখন প্রোটিয়াদের, তখন অপরীক্ষিত বোলার টেন্ডুলকারের সাফল্য সম্ভাবনা নিয়ে অন্ধকারেই ছিলেন আজহারউদ্দিন।

কাল রাতের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ধোনি ঠিক এর উল্টো। তাঁর জানা ছিল যে শেষ ওভারের চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেও বাজিমাত করে দিতে পারেন বিরাট কোহলি। কারণ ১৪তম ওভারেই যে তাঁকে নিয়ে এসে সাফল্য পেয়েছেন। তাও আবার কোন সময়ে? যখন ১৯ রানেই ক্রিস গেইল আর মারলন স্যামুয়েলসকে হারানোর ধাক্কা সামলে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দৃপ্ত পদক্ষেপে জয়ের দিকে এগিয়ে নিচ্ছিল জনসন চার্লস আর লেন্ডল সিমন্সের তৃতীয় উইকেট জুটি। ততক্ষণে তাঁরা দুজনে মিলে ৯৭ রানের পার্টনারশিপও তো গড়ে ফেলেছেন। আর ওয়াংখেড়ের উইকেটও কাল এমন ব্যাটিং সহায়ক যে ২ ওভারে ২০ রান খরচ করে ফেলা রবিচন্দ্রন অশ্বিনকেও আবার আক্রমণে ফিরিয়ে আনার সাহস করতে পারছিলেন না ধোনি।

হয়তো ভাবলেন কোহলির স্লো মিডিয়াম পেসে কাজ হতে পারে। যেই ভাবা সেই কাজ। আর এসেই প্রথম বলে উইকেট কোহলির, চার্লসকে (৩৬ বলে ৫২) রোহিত শর্মার ক্যাচ বানিয়ে ফেরান। ওই ওভারে দেনও মোটে ৪ রান।  

তাই শেষ ওভারেও ধোনির ভরসা হয়ে উঠলেন কোহলি। ক্যারিবীয়দের ৬ বলে দরকার ৮ রানের আর ততক্ষণে আশীষ নেহরা, জসপ্রীত বুমরাহ ও হার্দিক পান্ডিয়ারা ৪ ওভারের কোটা শেষ করে ফেলার পর কোহলির হাতে বল উঠতেই ‘টেন্ডুলকার কীর্তি’র পুনরাবৃত্তির আশা। ২৩ বছর আগে শেষ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার ৬ রানের প্রয়োজনও মেটাতে না দেওয়া টেন্ডুলকার খরচ করেছিলেন মাত্র ৩ রান। ভারত ২ রানে জিতে উঠেছিল হিরো কাপের ফাইনালে। এত দিন পর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ৪৭ বলে অপরাজিত ৮৯ রানের ইনিংসে টেন্ডুলকারের সঙ্গে তাঁর তুলনাটা আরো উচ্চকিত করা কোহলি বল হাতেও হয়ে যেতে পারতেন নায়ক। কিন্তু ‘ফ্লপ’ গেইলের দিনে আরেক দানব আন্দ্রে রাসেল সেটি হতে দিলেন কই! শেষ ওভারের তৃতীয়-চতুর্থ বলে মারা বাউন্ডারি ও ছক্কায় মাথায় হাত কোহলির এবং একই সঙ্গে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় মুষড়ে পড়ে গোটা ভারতও। ২ বল বাকি থাকতেই ৭ উইকেটের জয়ে প্রথম দল হিসেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে শেষ ধাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

রবিবার ইডেন গার্ডেনের ফাইনালে তাদের সামনে ইংল্যান্ড। যদিও গোটা ভারত যেন ভারত-ইংল্যান্ড ফাইনালের স্বপ্ন জালই বুনে চলছিল। কোহলির ধুন্ধুমার ইনিংসের পর তো আরো। রোহিত শর্মা (৪৩) ও আজিঙ্কা রাহানে (৪০) মাত্র ৭.২ ওভারেই ৬২ রানের সূচনা এনে দেওয়ার পর যখন নেমেই কোহলি একের পর এক রান আউটের খাঁড়া থেকে বাঁচলেন, মনে হওয়া স্বাভাবিক ছিল যে দিনটি তাঁরই হতে চলেছে। ডোয়াইন ব্রাভোর করা ম্যাচের নবম ওভারে দুই বলে তিনবার রানআউট হতে হতেও বেঁচে যান তিনি! তৃতীয় বলে প্রথমে তাঁকে আন্ডার আর্ম থ্রো করেও রানআউট করতে পারেননি ক্যারিবীয় উইকেটরক্ষক দীনেশ রামদিন, এরপর বোলার ব্রাভোও। পরের বলেই আবার সুযোগ, এবার কোহলি ক্রিজ থেকে দূরে থাকার পরও রামদিন গ্লাভসেই বল জমাতে পারেননি। ওই সময় কোহলির রান কত জানেন? মাত্র ১!

অবশ্য পরে লেন্ডল সিমন্সের সঙ্গে কোহলির একটা ‘কাটাকুটি খেলা’ও হয়ে গেল! আন্দ্রে ফ্লেচারের ইনজুরিতে দূর ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে উড়ে এসেই সেমিফাইনালের মতো চরম স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচে ৫১ বলে অপরাজিত ৮২ রানের ম্যাচ উইনিং ইনিংস খেলা সিমন্সও তো তিন-তিনবার জীবন পেয়েছেন। প্রথমবার ১৮ রানে, বুমরাহর ক্যাচ হলেও বোলার অশ্বিনের ডেলিভারি ওভারস্টেপিংয়ে জন্য ‘নো’ হওয়ায় বেঁচে যান। একই কারণে ৫০ রানে অশ্বিনের ক্যাচ হয়েও উইকেটে থেকে যান, বোলার সেবার পান্ডিয়া। এরপর ৬৮ রানের সময় বুমরাহর বলে রবীন্দ্র জাদেজা ক্যাচ নিলেও তাঁর পা সীমানাসূচক বোর্ড ছুঁয়ে ফেলায় সেটি হয়ে যায় ছক্কাই।

সেই ছক্কায় জয়ের আরো কাছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ততক্ষণে রাসেলও চার-ছক্কার বৃষ্টিতে ক্যারিবীয় স্বপ্ন তরীকে নিয়ে গেছেন তীরের আরো কাছে। অথচ গেইলের (৫) ছায়া এতটাই বড় যে তাঁর মতো দানবীয় শক্তির ব্যাটিং জানা কেউ আলোচনায়ই আসেন না সেভাবে। ২০১২ সালের ফাইনাল জয়ের নায়ক স্যামুয়েলসও (৮) এদিন দ্রুত ফিরে যাওয়ায় ১৯৩ রানের লক্ষ্যে সে রকম ব্যাটিংই দরকার ছিল, যেটি গেইলই করে থাকেন। তাঁর কিছু করতে না পারার দিনে সেই অভাব ঘুচল রাসেলের ব্যাটে, গেইলের মতো যাঁর মিস হিটেও বল ছক্কার ঠিকানায় ছুটে যেতে পারে।  

তবে কোহলিকে মারা উইনিং ছক্কাটি ক্লিন হিটেই। যে হিট ধুয়ে মুছে নিয়ে গেছে ভারতের ফাইনাল স্বপ্নও! 


মন্তব্য