kalerkantho


চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ নেতা খুন

সিসিটিভি ফুটেজে খুনি শনাক্ত, ৫ জন রিমান্ডে

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সিসিটিভি ফুটেজে খুনি শনাক্ত, ৫ জন রিমান্ডে

নাসিম হত্যাকাণ্ড সিসিটিভির ফুটেজ ১. গত সোমবার চট্টগ্রামে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা নাসিমকে মারার জন্য ছুরি বের করছে সোহান।

চট্টগ্রামের বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ছুরিকাঘাতে সংগঠনের নেতা এমবিএর ছাত্র নাসিম আহমেদ সোহেল নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে একজনের নাম জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দামপাড়া ক্যাম্পাস ভবনের দ্বিতীয় তলায় গত মঙ্গলবার দুপুরে ওই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যটি ধরা পড়েছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায়।

পুলিশ বলছে, অস্ত্র নিয়ে হামলাকারী এই তরুণ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সোহান। তবে সে কোন বর্ষের সেটা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাকে গ্রেপ্তারও করা যায়নি। তবে ভিডিও ফুটেজ দেখে আরো কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে পাঁচজনকে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল বুধবার আদালত তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, নীল শার্ট, সাদাটে প্যান্ট ও জুতা পরা এক তরুণসহ বেশ কয়েকজন সোহেলের ওপর হামলে পড়ে। আশপাশে আরো হামলাকারী ছিল। হামলার সময় চাকু কিংবা ক্ষুরজাতীয় কোনো অস্ত্র দিয়ে সোহেলকে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে নীল শার্ট পরা ওই তরুণ। পরে অস্ত্রটি লুকিয়ে ধীরে-সুস্থে শান্ত ভঙ্গিতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে সে। মাত্র ১৭ সেকেন্ডে ঘটনাটি ঘটে যায়।

ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী, তখন ঘড়ির কাঁটায় সময় ছিল ১টা ১ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির সময় ১টা ১ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে এক তরুণ প্রথমে সোহেলকে ঘুষি মারে। আর নীল শার্ট পরা তরুণ তাঁর ওপর হামলে পড়ে ৪৫ সেকেন্ডের দিকে। এর আগে এই তরুণ চাকু বা ক্ষুরটি পকেট থেকে বের করে খুলে নেয়। এরপর এলোপাতাড়ি আঘাত করতে শুরু করে ৪৭ সেকেন্ড থেকে। এক পর্যায়ে হামলাকারীদের একজনের হাতে (৫৬ সেকেন্ডে) নীল শার্ট পরা আক্রমণকারীর চাকু বা ক্ষুরের চোট লাগে। তখন ওই হামলাকারী সরে যায়। ১টা দুই মিনিট ৪ সেকেন্ড পর্যন্ত আঘাত করার পর অস্ত্রটি নিজের শরীরের সামনের দিকে লুকাতে লুকাতে শান্ত ভঙ্গিতে সরে যেতে দেখা যায় তরুণটিকে।

চকবাজার থানার ওসি আজিজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজ দেখে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা গেছে। নীল শার্ট পরা তরুণের নাম সোহান। তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত আছে। ’

ওসি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। সোহেলের বাবা আবু তাহের বাদী হয়ে ১৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় ২০-২৫ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।  

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আঘাতকারী নীল শার্ট পরা সোহানের এমন শান্ত ভঙ্গি দেখে তাঁরা বিস্মিত হয়েছেন। নগর পুলিশের একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থিরচিত্র দেখে বিস্মিত হয়েছি। এটি আকস্মিক ঘটনা নয়। পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। অন্য মারামারির মতো ঘটনা এটি নয়, এটি পরিকল্পিত। ’

সোহেল খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত পাঁচ শিক্ষার্থী হলো আশরাফুল ইসলাম আশরাফ, ওয়াহিদুজ্জামান নিশান, জিয়াউল হায়দার চৌধুরী, এস এম গোলাম মোস্তফা ও তামিউল আলম তামিম। তারা সবাই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। গতকাল দুপুরে পাঁচ শিক্ষার্থীকে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে সোপর্দ করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা চকবাজার থানার উপপরিদর্শক হুমায়ূন কবির।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) কাজী মুত্তাকী ইবনু মিনান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গতকাল বিকেলে মহানগর হাকিম ফরিদ আলম রিমান্ড আবেদন শুনে আসামিদের প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। ’

পুলিশ কর্মকর্তারা কালের কণ্ঠকে জানান, নগরের সাবেক ও বর্তমান দুই মেয়রকে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর ২৩তম ব্যাচের বিদায় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করা নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। শুরুতেই সোহানরা কয়েকজন মিলে বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই অনুষ্ঠানে হস্তক্ষেপ করেন নিহত সোহেলসহ ও তাঁর সহযোগীরা। পুলিশ কর্মকর্তারা জেনেছেন, সোহানসহ হামলাকারীরা নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী। আর নিহত সোহেল ও তাঁর সহযোগীরা নগর মেয়র আ জ ম নাছিরের অনুসারী।

পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে সোহেল চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। কিন্তু সেটি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি পুলিশের কাছে। এরই মধ্যে সোহেল ও তাঁর বন্ধুরা গিয়ে নগর মেয়র আ জ ম নাছিরকে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু নাছির সময়ের অভাবের কথা বলে দাওয়াত গ্রহণ করেননি। এ খবর জানার পর সোহানপক্ষ অনুষ্ঠানে সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীকে প্রধান অতিথি করার চেষ্টা করে। কিন্তু সোহেলরা ততক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেনকে প্রধান অতিথি করেন। এতে সোহানরা ক্ষিপ্ত হয়।

এদিকে গতকাল সকালে সোহেলের মরদেহ নগরের শেরশাহ কলোনি এলাকার কবরস্থানে দাফন করা হয়।

‘মহিউদ্দিন ও নাছিরকে দায়িত্ব নিতে হবে’ : সোহেল হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী খোঁজখবর নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও সাধারণ সভার উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি এ কথা জানান। মন্ত্রী বলেন, ‘গতকাল (মঙ্গলবার) প্রধানমন্ত্রীসহ আমরা মনোনয়ন বোর্ডের (ইউপি প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে) সভায় ছিলাম। চট্টগ্রামের এই খবর পেয়ে তিনি হঠাত্ করে বিষণ্ন হয়ে গেলেন। আমাকে বললেন খোঁজখবর নিতে। ’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওবায়দুল কাদের যখন প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন মঞ্চে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেয়র নাছির উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিলেও নাছির আসার কিছুক্ষণ আগে তিনি চলে যান।

ওবায়দুল কাদের বক্তব্যের শুরুতে বলেন, ‘একজন এ বি এম অন্যজন এ জি এম (আ জ ম)। দুজন পাশাপাশি থাকলে ভালো লাগত। পাশাপাশি থাকলে তাঁদের বলতাম—যত ভালো কাজেই করুন, ছোট ছোট অনেক ঘটনা বড় অর্জনকে ম্লান করে দেয়। গতকালের ঘটনা হয়েছে ছাত্ররাজনীতির নামে। একটি প্রাণ ঝরে গেল। দুজনকেই বলতাম—এ দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে। ’

সম্মেলনে উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি এজাজ ইউসুফী। এর আগে সম্মেলন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব ওমর ফারুক, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি কলিম সরওয়ার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শাবান মাহমুদ, সাংবাদিক নেতা আবদুল জলিল ভূঁইয়া প্রমুখ।

উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি : এই হত্যাকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. অনুপম সেনের ‘নীরব সম্মতি’ আছে—এমন অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। মহানগর ছাত্রলীগের আওতাধীন কলেজসমূহের ব্যানারে গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্যের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগ দাবি করা হয়। এ ছাড়া  হত্যাকারীদের তিন দিনের মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। অন্যথায় আগামী ৩ এপ্রিল থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সমাবেশ, ধর্মঘট ও উপাচার্যের কার্যালয় অবরোধ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও চট্টগ্রামের বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. অনুপম সেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য।

লালদীঘি মাঠে গায়েবানা জানাজায় মহিউদ্দিন : সোহেল হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল নগরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এসব বিক্ষোভ কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিল। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে কাফনের কাপড় পরে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসম্পাদক ইয়াছির আরাফাত।

এদিকে লালদীঘি মাঠে গতকাল বাদ জোহর গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরী অংশ নেন।


মন্তব্য