kalerkantho


পাঁচ বছর পর ভারমুক্ত ফখরুল

রিজভী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পাঁচ বছর পর ভারমুক্ত ফখরুল

প্রায় পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত থেকে অবশেষে ভারমুক্ত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বুধবার তাঁকে বিএনপির সপ্তম মহাসচিব করলেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে এত দিন দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদকে পদোন্নতি দিয়ে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করলেন তিনি। আর কোষাধ্যক্ষ পদে মিজানুর রহমান সিনহাই বহাল থাকলেন।

তবে অনেক জল্পনা-কল্পনার পর মহাসচিব হয়েও গতকাল দিনটি স্বস্তিতে কাটাতে পারেননি মির্জা ফখরুল। পল্টন থানার একটি নাশকতার মামলায় জামিন না দিয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়; যদিও বিকেলে জামিনে মুক্তি পান তিনি। কিন্তু এরই মধ্যে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর খবরে বিএনপির পক্ষ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। বিএনপির বাইরেও এ ঘটনার সমালোচনা হয় ব্যাপকভাবে। সব মিলিয়ে মহাসচিব হওয়ার দিনটিতে প্রায় আট ঘণ্টা জেলহাজতে থাকতে হয় ফখরুলকে।   

গত ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে উপস্থিত কাউন্সিলররা সব ধরনের কমিটি গঠনের দায়িত্ব খালেদা জিয়াকে দেন। এর ১১ দিন পর খালেদা জিয়ার নির্দেশে গতকাল দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে চেয়ারপারসনের মনোনয়নের কথা জানান রিজভী আহমেদ।

এর আগ পর্যন্ত কোনো ধরনের কমিটির ঘোষণা না আসায় বিএনপির পাশাপাশি এর শুভান্যুধায়ী ও সমর্থকদের মধ্যে বিরূপ সমালোচনা চলছিল। তবে গতকালের এ ঘোষণায় সেই সমালোচনা কিছুটা হলেও কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি নেতাকর্মীরা ধরে নিচ্ছে যেকোনো দিন ঘোষণা হবে দলের স্থায়ী কমিটি। গুরুত্বপূর্ণ ওই কমিটির পর ধাপে ধাপে নির্বাহী কমিটির অন্য সদস্যদেরও নাম জানানো হবে।

বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, ‘মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইজ দ্য ফাইনেস্ট পারসন। তাঁর ইমেজের তুলনা হয় না। অন্যদিকে রিজভীরও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা যথেষ্ট হয়েছে। পড়াশোনা ভালো। ফলে আমি বলব, যোগ্য দুজন নেতাকে যোগ্য জায়গায় পদায়ন করা হয়েছে। আমি তাঁদের অভিনন্দন জানাই। ’

সর্বশেষ কাউন্সিলে সংশোধিত গঠনতন্ত্রে বেশ কয়েকটি সম্পাদকীয় পদসহ মোট ৬১টি নতুন পদ সৃষ্টি সত্ত্বেও নির্বাহী কমিটির সদস্য সংখ্যা ৩৮৫ রাখার সিদ্ধান্ত আছে। তবে মোট সংখ্যার শতকরা ১০ ভাগ চেয়ারপারসন মনোনয়ন দিতে পারবেন।

এক-এগারোর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপির ভাবমূর্তি উদ্ধারে ‘ক্লিন ইমেজের’ অধিকারী মির্জা ফখরুলকে হঠাৎ করেই লাইমলাইটে আনতে বাধ্য হয় বিএনপির হাইকমান্ড। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বরের কাউন্সিলের পর তাঁকে করা হয় দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। যে পদে আগে ছিলেন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর গত প্রায় পাঁচ বছরে তিনি বহুবার কারাবরণ করেন। তবে একাধিকবার খালেদা জিয়া উদ্যোগ নিয়েও দলের একাংশের তীব্র বিরোধিতায় এত দিন তাঁকে পূর্ণ মহাসচিব করা যায়নি; যা নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে সমালোচনা ছিল।

অন্যদিকে সাবেক ছাত্রনেতা রুহুল কবীর রিজভীর দলে বড় ধরনের উত্থান ঘটে মূলত এক-এগারো পরবর্তী ইতিবাচক ভূমিকার কারণে। ২০০৯ সালের কাউন্সিলের পর তাঁকে দলের দপ্তরের পাশাপাশি যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। এরপর বেশ কয়েক বছরই দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দপ্তর সম্পাদক হিসেবে অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দায়িত্ব পালন করে তিনি খালেদা জিয়ার আস্থা অর্জন করেন। বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেন তিনিও। তারই পুরস্কারস্বরূপ এবার তাঁকে করা হলো সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব।

যদিও ফখরুল ও রিজভীর মধ্যে বৈরী সম্পর্ক বিদ্যমান বলে দলে আলোচনা আছে। কারণ রিজভীও মহাসচিব হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু চেয়ারপারসন কমিটি ঘোষণার পর এই বৈরিতা থাকবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ফখরুল এবং রিজভী দুজনকেই অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, দুজনেই দলের জন্য প্রয়োজনীয়। তা ছাড়া গত কয়েক বছরে তাঁরা দুজনেই কঠোর পরিশ্রম করে নেতাকর্মীদের মধ্যে অবস্থান তৈরি এবং চেয়ারপারসনের আস্থা অর্জন করেছেন।

রিজভীর ব্রিফিং

মহাসচিব পদে মির্জা ফখরুল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে রিজভী আহমেদ এবং কোষাধ্যক্ষ পদে মিজানুর রহমান সিনহাকে নিযুক্ত করার কথা গতকাল সকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ।

তিনি বলেন, ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। কাউন্সিলররা চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষমতা দিয়েছেন। সেই ক্ষমতাবলে বিএনপি চেয়ারপারসন এ তিনটি পদে তাঁদের নির্বাচিত করেছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, ‘আমি আপাতত এই তিনটি নাম ঘোষণা করলাম। পরে ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য পদে নেতৃবৃন্দের নাম ঘোষণা করা হবে। মূলত এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই কার্যক্রম শুরু করল বিএনপির নতুন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি। ’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিমউদ্দিন আলম, যুব বিষয়ক সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, সহস্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন, জাসাসের সভাপতি আব্দুল মালেক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ফখরুল ও রিজভীর  প্রতিক্রিয়া : প্রায় আট ঘণ্টা কারাভোগের পর রাত ৮টায় কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘মহাসচিব হিসেবে নিজের জীবনকে বাজি রেখে কাজ করতেও আমি পিছপা হব না। ’ তিনি বলেন, ‘চেয়ারপারসন এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান যে আস্থা রেখে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন তার জন্য আমি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। পাশাপাশি নেতাকর্মীদেরও আমি অভিনন্দন জানাই। কারণ তারাই এই দলকে ধরে রেখেছে। ’ দলকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দেশবাসীর দোয়াও চান ফখরুল। বিএনপি নেতাদের মধ্যে আবদুল্লাহ আল নোমান, আবদুস সালাম, নাজিমউদ্দিন আলম, এস এম জাহাঙ্গীর আলম, ফরহাদ হোসেন আজাদ, কামাল আনোয়ার আহমেদ, শামীমুর রহমান শামীম, রাজীব আহসান ও শায়রুল কবির খান কারাগারের সামনে উপস্থিত ছিলেন।

পৃথক এক প্রতিক্রিয়ায় রিজভী আহমেদও চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, ‘সরকার যত ষড়যন্ত্রই করুক নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তা পালন করে যাব। ’

খালেদার সঙ্গে ফখরুল-রিজভীর সাক্ষাৎ  : এদিকে গত রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় দেখা করেছেন দলের নবনির্বাচিত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর। তাঁরা চেয়ারপারসনকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দেশে গণতন্ত্র নেই। সেই গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনাই এখন চ্যালেঞ্জ। ’ এ জন্য তিনি নিরলস কাজ করে যাবেন। একই সঙ্গে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করবেন বলেও তিনি জানান।


মন্তব্য