kalerkantho


খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

ফখরুল দুপুরে কারাগারে বিকেলে জামিনে মুক্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

যাত্রীবাহী বাসে বোমা ছুড়ে আগুন ধরিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাকার একটি আদালত এ নির্দেশ দেন। একই দিনে পৃথক দুটি মামলায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সকালে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে বিকেলে আবার জামিন দেওয়া হয়। মির্জা ফখরুলের জামিন নিয়ে চলে দিনভর নাটকীয়তা।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল গতকাল সকালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নাশকতার তিন মামলায় আত্মসমর্পণ করেন। একই সঙ্গে জামিনের আবেদন জানানো হয়। আদালত শুনানি শেষে এক মামলায় জামিন দেন। অন্য দুটি মামলায় জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর আবার জামিন পুনর্বিবেচনার আবেদন জানানো হলে বিকেলে তাঁর জামিন মঞ্জুর করা হয়।

কেন মির্জা ফখরুলের জামিন নামঞ্জুর করা হলো আবার কেনই বা তাঁকে জামিন দেওয়া হলো এ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। মির্জা ফখরুল গতকালই বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থাকা অবস্থায় বর্তমান সরকারের আমলে এর আগে কমপক্ষে সাতবার তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছে। গতকালের আত্মসমর্পণ নিয়ে আদালতে দিনভর ঘটতে থাকে নানা ঘটনা।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা : যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগে যাত্রাবাড়ী থানার একটি মামলার অপরাধ আমলে নিয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মো. কামরুল হোসেন মোল্লা। একই মামলায় বিএনপি-জামায়াত জোটের আরো ২৭ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে দাখিল করা অভিযোগপত্র আমলে নেওয়া সংক্রান্ত শুনানির জন্য এ মামলার দিন ধার্য ছিল। সব আসামির বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫/২৫(ঘ) ধারার অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় গতকাল। চার্জশিট দেওয়ার পর খালেদা জিয়াসহ ২৮ জন আদালতে আত্মসমর্পণ না করায় তাঁদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়। চার্জশিটে তাঁদের পলাতক দেখানো হয়েছিল।

খালেদা জিয়াসহ পলাতকদের গ্রেপ্তারের নির্দেশের পাশাপাশি আগামী ধার্য তারিখের মধ্যে তাঁদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলসংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ২৭ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন আদালত।

গত বছরের ২৩ জানুয়ারি রাতে যাত্রাবাড়ীর কাঠের পুল এলাকায় গ্লোরি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা ছোড়া হলে বাসের ২৯ যাত্রী দগ্ধ হয়। দগ্ধদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হলে ১ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নূর আলম (৬০) নামের এক বৃদ্ধ যাত্রী।

এ ঘটনায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫/২৫(ঘ) ধারায় নাশকতার অভিযোগে একটি মামলা করে পুলিশ। একই ঘটনায় খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে যাত্রাবাড়ী থানায় দণ্ডবিধির ১৪৩/৩২৬/৩০৭/৩৫৩/৪৩৫/৪২৭/১০৯/১১৪/৩৪ তৎসহ বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের ৩/৪/৫ ধারার মামলা দায়ের করা হয়।

গত বছরের ৬ মে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক (এসআই) বশির উদ্দিন হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে দায়ের করা মামলায় খালেদা জিয়াসহ ৩৮ জনকে আসামি করে দুটি পৃথক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। অন্যদিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা নাশকতার মামলায় একই বছরের ১৯ মে খালেদা জিয়া ও অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

এ মামলার এজাহারে উসকানিদাতা হিসেবে খালেদা জিয়ার নাম উল্লেখ ছিল। চার্জশিটে তাঁকে প্রধান আসামি করা হয়। বলা হয়, খালেদা জিয়া ও তাঁর দলের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য, বিবৃতির ভিডিও ক্লিপিং ও অডিও সিডি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, হরতাল-অবরোধের আগে-পরে বিভিন্ন তারিখে খালেদা জিয়া, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী, খন্দকার মাহবুব হোসেন, সালাহ উদ্দিন আহমেদ, মারুফ কামাল খানের দেওয়া বক্তব্য ও বিবৃতি উসকানি ও প্ররোচনামূলক ছিল।

চার্জশিটে ‘খালেদা জিয়ার নাশকতাসংক্রান্ত নির্দেশের একটি অডিও টেপে যা আছে’ শিরোনামে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে। তাতে জানা যায়, তিনি কেন্দ্রীয় নেতাদের মোবাইল ফোনে নাশকতা ঘটানোর নির্দেশ দেন। খালেদা জিয়ার কথোপকথনে জামায়াতের লোকজনকেও রাস্তায় নামানোর জন্য বলা হয়।

চার্জশিটে বলা হয়, গত বছরের ৫ জানুয়ারি খালেদা জিয়া দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের জন্য হরতাল-অবরোধের ডাক দিয়ে সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত দেশব্যাপী অচলাবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট সাধারণ জনগণকে জিম্মি করে রাজনীতির নামে পেট্রলবোমা, হাতবোমা, ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ও যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। টাকার বিনিময়ে বেকার, উচ্ছৃঙ্খল যুবক, গাড়ির হেলপার, দিনমজুর, ভবঘুরে, কিশোর ও টোকাইদের ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় যাত্রাবাড়ীতে গ্লোরি পরিবহনের একটি বাসে পেট্রলবোমা হামলা চালানো হয়। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আসামিরা গাড়িতে আগুন দিয়ে ‘রাজপথ ছাড়ি নাই, বেগম খালেদা জিয়া ভয় নাই...’ স্লোগান দিতে দিতে পালিয়ে যায়। চার্জশিটে বলা হয়, বাসে ওই দিন অগ্নিসংযোগের ফলে ৩১ যাত্রী দগ্ধ হয়। তাদের মধ্যে নূর আলম মারা যান।

আরো যাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা : পরোয়ানাপ্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য অন্যরা হলেন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, খালেদা জিয়ার প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান সোহেল, যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লা বুলু, বিএনপির ঢাকা মহানগরের সদস্যসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মীর শরাফত আলী সপু, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আজিজুল বারী হেলাল, আবদুল কাইয়ূম কমিশনার, আবদুল লতিফ কমিশনার, মীর আবু জাফর শামসুদ্দিন দিদার, যাত্রাবাড়ী এলাকার সাবেক এমপি সালাউদ্দিন আহমেদ, তাঁর ছেলে তানভির আহমেদ রবিন, ইসহাক সরকার, নবী উল্লাহ নবী, সেলিম ভূঁইয়া, দরবার শরিফের সোহেল, বাদল সরদার, আলমগীর হোসেন, রফিকুল ইসলাম মাসুম, মিলন, শহিদুল্লাহ খান ওরফে শহিদুল, পারভেজ ওরফে আল আমিন ওরফে সাকিব, সোহাগ, মো. লিটন ওরফে সাব্বির ও রাসেল ওরফে বোমা রাসেল প্রমুখ।   

সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পিপি তাপস কুমার পাল জানান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার, চেয়ারপারসনের তথ্য উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ, যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ, আমানউল্লাহ আমানসহ আটজন এ মামলায় জামিনে আছেন। দুজন আসামি কারাগারে আছেন।

ফখরুলের জামিন নিয়ে নাটক : জাতীয় নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে গত বছর জানুয়ারিতে ২০ দলীয় জোটের আন্দোলনের মধ্যে নাশকতার অভিযোগে মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে দায়ের করা তিন মামলায়  তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন হাইকোর্ট। রাষ্ট্রপক্ষ এই জামিন আদেশ স্থগিত করতে আপিল বিভাগে গেলে সর্বোচ্চ আদালত রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে জামিন দেন। গত বছরের ২৪ নভেম্বর হাইকোর্ট রুল নিষ্পত্তি করে মির্জা ফখরুলকে তিন মাসের জামিন দেন। স্থায়ী জামিন না হওয়ায় এরপর আপিলের অনুমতি চান ফখরুল।

প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ওই আবেদনের নিষ্পত্তি করে মির্জা ফখরুলকে ১৫ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেন। ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল তিনি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করেন এবং একই সঙ্গে জামিন চান। শুনানি শেষে দুপুর ১টার দিকে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম নবী তিন মামলার একটিতে জামিন দিলেও অন্য দুটি মামলায় আবেদন নাকচ করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এরপর মির্জা ফখরুলকে কারাগারে নেওয়ার প্রতিবাদে আইনজীবীসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা মিছিল করে। গতকালই আদালতে আসার আগে মির্জা ফখরুলকে দলের মহাসচিব ঘোষণা করা হয়। মির্জা ফখরুলকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশের পরই বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা তৎপর হন। মির্জা ফখরুলের শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আবার জামিন পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হয়। একই আদালত পুনর্বিবেচনার আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ করেন। পরে তাঁকে জামিন দেওয়া হয়।

কারাগার থেকে মুক্ত : মির্জা ফখরুলের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর পর পর দুপুর ২টার দিকে তাঁকে কোর্ট হাজতখানা থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। বিকেলে জামিন আদেশের পর তাঁর জামিননামা কারাগারে পাঠানো হয়। সন্ধ্যায় তাঁকে কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

রাজধানীতে বিক্ষোভ : দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি ও এর অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে দলের নয়াপল্টনের কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে নাইটিংগেল মোড় হয়ে পুনরায় কার্যালয়ে এসে শেষ হয়। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদের নেতৃত্বে মিছিলে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।


মন্তব্য