kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ছাত্রলীগে সংঘর্ষ, নেতা নিহত

উত্তাল চট্টগ্রাম, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ছাত্রলীগে সংঘর্ষ, নেতা নিহত

চট্টগ্রামে বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন সংগঠনটির নেতা এমবিএর ছাত্র নাসিম আহমেদ সোহেল (২৩)। কিছুদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। বিভাগের নবীনবরণ ও বিদায়ী অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের দামপাড়া ক্যাম্পাসে এ সংঘর্ষ হয়।

নিহত সোহেল বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ছাত্রলীগের (একাংশ) সভাপতি ও মহানগর ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন। তিনি কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার দয়াপুর এলাকার আবু তাহেরের ছেলে। নগরের শেরশাহ কলোনির বাসায় মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন তিনি। তাঁর বাবা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সোহেল সবার ছোট।

সংঘর্ষের পর বিক্ষোভ শুরু করে সোহেলের সহপাঠী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম নগরজুড়ে। দুপুর ২টার পর থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত নগরের অন্তত ১৩টি স্থানে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করা হয়। এ সময় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি ও হাতবোমার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রবর্তক মোড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস ছাড়াও রাস্তায় অর্ধশতাধিক গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. অনুপম সেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ওই সময় তিনি বলছিলেন, ‘ছাত্ররা দামপাড়া ক্যাম্পাসে আমাকে ও আমার সহকর্মীদের অবরুদ্ধ করে রেখেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে। ’

জানা গেছে, নিহত সোহেল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী। এ ঘটনার জন্য মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দায়ী করছে এই অংশটি। নাছির উদ্দিন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

স্থানীয় লোকজন জানান, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সেখানে ছাত্রদের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু পরে সেটা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে পড়ে। প্রায় দুই বছর ধরে মহিউদ্দিন চৌধুরী ও নাছির উদ্দিনের অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়ে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে গত কিছুদিন ধরে বিরোধ আরো চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের দামপাড়া ক্যাম্পাসে বিবিএর ৩১তম ব্যাচের নবীনবরণ ও ২৩তম ব্যাচের বিদায়ী অনুষ্ঠান ছিল। গতকাল মহড়ার সময় কথাকাটাকাটির জের ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে দুপুর ১টার দিকে ছাত্রলীগের একটি অংশ এসে হামলা চালায়। সে সময় ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের এমবিএর শিক্ষার্থী নাসিম আহমেদ সোহেল, ইমতিয়াজ হোসেন রাহাত, রূপম শীল বণিক ও শুভ।

তাঁদের প্রথমে বেসরকারি সিএসসিআর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে দুপুর আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা সোহেলকে মৃত ঘোষণা করেন। বাকিদের ভর্তি করা হয়।

চকবাজার থানার ওসি আজিজ আহমেদ বলেন, ‘সোহেলের শরীরের বিভিন্ন অংশে ধারালো অস্ত্রের কোপ দেখা গেছে। মাথার ঠিক মাঝখানে গভীর ক্ষত দেখেছি। এর ফলে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ’

পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় চারজনকে আটক করা হয়েছে। তবে তাদের পরিচয় জানায়নি পুলিশ।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিবিএ অনুষদের নবীনবরণ ও বিদায়ী অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে প্রধান অতিথি হিসেবে রাখার প্রস্তাব করা হলে ছাত্রলীগ নেতা নাসিম আহমেদ সোহেল মহিউদ্দিন চৌধুরীর পাশাপাশি আ জ ম নাছিরকেও অনুষ্ঠানে রাখার প্রস্তাব দেন। এ নিয়ে গতকাল দুই পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে সংঘর্ষ হয়।

এর আগে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে গিয়ে অধ্যক্ষের কাছে যান সোহেল। তিনি অধ্যক্ষ ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের কাছে কলেজের শাহ আলম বীর-উত্তম হল বরাদ্দের জন্য চিঠি দেন। এ সময় সোহেল অধ্যক্ষকে জানান, অনুষ্ঠানে আ জ ম নাছির উদ্দিন থাকবেন। অনুষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে আসার পর সোহেল দুপুর ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে হামলায় নিহত হন তিনি।

এ ঘটনার জের ধরে দুপুর ২টার পর প্রবর্তক মোড়ের চারপাশের সড়কগুলো অবরোধ করে শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এ সময় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবর্তক মোড়ে মূল ক্যাম্পাসে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। একই সময়ে নগরীর ওয়াসার মোড়, লালখানবাজার, ষোলোশহর ২ নম্বর গেট, আকবর শাহ মোড়, হালিশহর বড়পোল এলাকায় সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। ফলে পুরো নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সোহেলের মরদেহ নিয়ে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা প্রবর্তক মোড়ে মিছিল করে। বিকেল পৌনে ৫টায় গোলপাহাড় মোড়ে অন্তত ২০টি যানবাহন ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধ কর্মীরা। এ সময় ‘স্বপ্ন’ নামের সুপার শপের সামনে ১৫ জন পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকলেও তারা ছিল নির্বিকার। বিক্ষুব্ধরা গাড়ি ভাঙচুর শুরু করলে মেট্রো ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সেবা ডায়াগনস্টিক ও প্রিমিয়ার হাসপাতাল, সিএসসিআর হাসপাতাল, রয়েল হাসপাতাল, মেট্রোপলিটন হাসপাতালসহ আশপাশের অর্ধশতাধিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া নিউ মার্কেট, চেরাগী পাহাড়, প্রবর্তক মোড়, ওয়াসা, জিইসি, ২ নম্বর গেট, হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় ৩০-৪০টি যানবাহন ভাঙচুর হয়।

প্রবর্তক মোড়, গোলপাহাড়, নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় গোলাগুলির শব্দও শোনা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক দফায় কাঁদানে গ্যাস ও টিয়ার শেল ছুড়েছে।

প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে বিক্ষোভ-অবরোধের কারণে নগরীর অন্তত ১৫টি সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় অন্য সড়কগুলোতে তীব্র যানজট দেখা দেয়। বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধের ফার্মেসিসহ দোকানপাট বন্ধ ছিল। প্রবর্তক মোড়ে অবরোধের কারণে চট্টগ্রাম মেডিক্যালমুখী ছয়টি সড়ক বন্ধ থাকায় অ্যাম্বুল্যান্স ছাড়া অন্য কোনো গাড়ি চলাচল করতে দেয়নি বিক্ষুব্ধরা। এ কারণে রোগী ও তাদের স্বজনরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হয়।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সোহেলের মরদেহ ও আহত তিন ছাত্রলীগ কর্মীকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দেখতে যান সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন। এ সময় তিনি বিক্ষুব্ধ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সড়ক অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলে বিক্ষুব্ধরা তা ক্রমান্বয়ে তুলে নিলে সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়।

মেয়র সাংবাদিকদের বলেন, ‘ছাত্রলীগ নেতা সোহেলের খুনি ও আশ্রয়দাতাদের ছাড় দেওয়া হবে না। কিছুদিন ধরে একটি মহল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ঘোলাটে করার চেষ্টা করছিল। তারা রাজনীতির ব্যানার ব্যবহার করে এটা করে আসছিল। আজ তারা দিনদুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে হত্যাকাণ্ড ঘটাল। ’

মেয়র বলেন, ‘সম্প্রতি সোহেল আমার কাছে এসেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রোগ্রামে দাওয়াত করতে। কিন্তু আমার সময় হবে না বলে আমি না করে দিই। ’

সোহেল হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। গতকাল সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ‘আমি ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক এবং নগরবাসীকে এই পবিত্র বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে সমস্ত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। আমি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, প্রিয় ছাত্রছাত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে শান্ত, দায়িত্বপূর্ণ আচরণ প্রদর্শনের জন্য অনুরোধ করছি। ’

হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ। এক বিবৃতিতে নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি ‘হত্যাকারীদের ছাত্রলীগ নেতা’ না বানানোর জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান। এ ছাড়া সৃষ্ট ঘটনাকে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে রূপ না দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

এদিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের মর্গে সোহেলের মরদেহ ময়নাতদন্তের পর শেরশাহ কলোনির বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাত সাড়ে ৯টার পর শেরশাহ কলোনির মাহজারুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা হয়। জানাজায় আ জ ম নাছির উদ্দিনসহ মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সোহেলের বাবা আবু তাহের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় অঝোরে কাঁদছিলেন। কান্না চেপে রাখতে পারেননি উপস্থিত লোকজনও। ছেলে হারিয়ে নির্বাক মা। সেই সঙ্গে বড় ভাইবোনদের কান্না-আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আবু তাহের বলেন, ‘আমার ছেলেকে কারা মারছে, কেন মারছে আমি কিছুই জানি না। ’ বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।


মন্তব্য