kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


শুনানিতে ‘মূল হোতা’ কিম অং

কোটি ডলার ফেরত দেওয়ার আশ্বাস, দুই চীনাও জড়িত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কোটি ডলার ফেরত দেওয়ার আশ্বাস, দুই চীনাও জড়িত

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে মাত্র প্রায় এক কোটি ডলার ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন চীনা বংশোদ্ভূত ফিলিপাইনের ব্যবসায়ী কিম অং। গতকাল মঙ্গলবার দেশটির সিনেটের ব্লু রিবন কমিটির শুনানিতে তিনি এ আশ্বাস দেন। অর্থ চুরির মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাঁকে শুরু থেকেই সন্দেহ করে আসছিলেন তদন্তকারীরা।

এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই চীনা ব্যবসায়ীর নাম প্রকাশ করে কিম অং বলেছেন, ওই দুজনই বাংলাদেশের ডলারগুলো হাতিয়ে এনেছেন। তাঁরা হলেন পেইচিংয়ের শুহুয়া গাও এবং ম্যাকাওয়ের মিস্টার ডিং। এ দুজনের পাসপোর্টের অনুলিপি একটি বন্ধ খামে করে সিনেট কমিটির হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি।

সিনেট কমিটির শুনানিতে ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে সিনেট কমিটির তৎপরতাকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সিনেটের এ উদ্যোগে সন্তুষ্ট। আশা করছি, আমাদের সব অর্থ শিগগিরই ফেরত পাব। ’

ক্যাসিনো (জুয়া) ব্যবসায় জড়িত ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজার কম্পানি লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও মহাব্যবস্থাপক কিম অং। জাংকেট অপারেটর হিসেবে জুয়াড়িদের গ্যারান্টার ও তাদের থাকা, খাওয়া, ভ্রমণসহ নানা ধরনের সেবা প্রদান করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য মতে, পেইচিংয়ের গাও প্রায়ই ফিলিপাইনে আসা-যাওয়া করেন এবং আট বছর ধরে জাংকেট এজেন্ট (জুয়ার মক্কেল) এনে দেন। এই মহলে তাঁর বেশ পরিচিতি রয়েছে। ম্যাকাওয়ের ব্যবসায়ী ডিংয়ের সঙ্গে তাঁকে পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছেন গাও।

শুনানিতে অং বলেন, গাও একবার সোলাইরি রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোতে  এক সপ্তাহের মধ্যে ৪৫০ মিলিয়ন ফিলিপিনো পেসো (প্রায় এক কোটি ডলার) হেরে ওই অর্থ তাঁর কাছ থেকে ধার নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে এক বিলিয়ন পেসো তাঁর প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে গিয়েছিল জানিয়ে অং বলেন, এর মধ্যে ৪৫০ মিলিয়ন পেসো ধার পরিশোধ হিসেবে দিয়েছিলেন গাও। বাকি ৫৫০ মিলিয়ন চিপসে রূপান্তর করে তাঁর ক্যাসিনোয় খেলা হয়েছিল এবং পুরো টাকাটা হেরে গিয়েছিলেন তিনি। ধারের অর্থ হিসেবে যে ৪৫০ মিলিয়ন পেসো পেয়েছিলেন, সেটা এখন তিনি বাংলাদেশকে ফেরত দিতে রাজি আছেন।

কিম অং জানান, গাও তাঁর কাছ থেকে যখন অর্থ ধার করেছিলেন সে সময় রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) মাকাতি সিটির জুপিটার স্ট্রিট শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো তাঁকে ওই শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট খোলার অনুরোধ করেন। তখন গাওকে তাঁর কাছে পাঠান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরি হয়ে আরসিবিসির এ শাখা দিয়েই ফিলিপাইনে ঢুকেছিল।

অং বলেন, ২০১৫ সালের মে মাসের কোনো এক সময় মিডাস হোটেলে তাঁর অফিসে গাও ও তাঁর সঙ্গে দেগুইতোর সাক্ষাৎ হয়। সে সময় গাও একটি ডলার অ্যাকাউন্ট খুলতে চাইছিলেন। তবে দেগুইতো তখন বলেন, কোনো একটি কম্পানির অ্যাকাউন্টের জন্য তাঁদের পাঁচজনের অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। এর দুই থেকে তিন দিনের মাথায় পাঁচটি ডলার অ্যাকাউন্টের জন্য দেগুইতো তাঁকে ফোন করে আড়াই হাজার ডলার চান।

এরপর গত ৪ ফেব্রুয়ারি তাঁকে গাও জানান, গাও এবং ডিং ম্যাকাওয়ে তাঁদের ক্যাসিনো বন্ধ করে ম্যানিলায় বিনিয়োগ করতে চাইছেন। পরদিন ৫ ফেব্রুয়ারি সোলাইরি হোটেলে গাও ও ডিংয়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তখন তাঁরা দুজন তাঁকে বলেন, দেগুইতোকে ফোন করে ওই পাঁচ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ‘চেক’ করতে বলেন।

অং বলেন, কয়েক দফা ফোন করার পর দেগুইতো দুপুর ১টার দিকে ফোন করে তাঁদের জানান মোট ৮১ মিলিয়ন ডলার তাঁদের অ্যাকাউন্টে আসতে শুরু করেছে। এ সময় দেগুইতোকে ওই হোটেলে টাকা নিয়ে আসতে অনুরোধ করেন তিনি। দেগুইতোর অনুরোধে ওই দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফিলরেম সার্ভিস করপোরেশনের মিকাইল বাউতিস্তা ৮০ মিলিয়ন পেসো নিয়ে আসেন। পরে দেগুইতো আরো ২০ মিলিয়ন পেসো নিয়ে আসেন। এর পরও বাউতিস্তার বাড়ি থেকে তিনি ৩০০ মিলিয়ন পেসো এবং পাঁচ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ৯ ফেব্রুয়ারি ১০০ মিলিয়ন পেসো ও তিন মিলিয়ন ডলার, ১০ ফেব্রুয়ারি ১০০ মিলিয়ন পেসো ও দুই মিলিয়ন ডলার এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি বাকি ১০০ মিলিয়ন পেসো সংগ্রহ করেন বলে জানান তিনি।

আরসিবিসি ব্যাংকের যে পাঁচটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা হস্তান্তর হয়েছে, সেই অ্যাকাউন্টগুলো খোলার ক্ষেত্রে কাগজপত্র জালিয়াতির জন্য ম্যানেজার দেগুইতোকে দায়ী করেন কিম অং। চুরির ৮১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৬৩ মিলিয়ন ডলারের মতো মিডাস ও সোলাইরি ক্যাসিনোয় গেছে বলে জানান তিনি।

এর আগে সিনেট কমিটির শুনানিতে দেগুইতোর দেওয়া বক্তব্যের সূত্র ধরেই এই জালিয়াতিতে কিম অংয়ের নাম বেরিয়ে আসে। সিনেট কমিটিতে আসার আগে সাংবাদিকদের কাছে অং নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন।

১৫ বছর আগেও কিম অং একবার সিনেট ব্লু রিবন কমিটির শুনানির মুখোমুখি হয়েছিলেন। অবৈধ মাদক ব্যবসা ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ওই সময় ৩৯ বছর বয়সী অংকে ডাকা হয়েছিল। এক সিনেটরের সঙ্গে মাদক চোরাচালানিদের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করার অভিযোগ আনা হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি ১০ বছর বয়সে চীন থেকে ফিলিপাইনে চলে আসেন। কলেজের ছাত্র থাকাকালে লেখাপড়া বাদ দিয়ে স্থানীয় একটি সিগারেট কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধির কাজে যোগ দেন। পরে নিজেই একজন ব্যবসায়ী বনে যান এবং পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে।

কিম অংয়ের সঙ্গে মায়া সান্তোস দেগুইতোকেও গতকালের শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। তবে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি হাজিরা এড়িয়ে গেছেন। অর্থ চুরির ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ২২ মার্চ মায়া ও তাঁর সহকারী অ্যাঞ্জেলা তরেসকে বরখাস্ত করেছে আরসিবিসি কর্তৃপক্ষ।

এদিকে সিনেটের সদস্য জোয়ান পন্স জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরির সঙ্গে কারা কারা জড়িত এবং সেই অর্থ কোথায় রেখেছে, তা খুঁজে বের করে অর্থগুলো ফেরত দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ফিলিপাইন সরকার।

প্রসঙ্গত, গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টার পর ‘হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে’ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০১ মিলিয়ন ডলার বা ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার অর্থ চুরি যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে দুই কোটি ডলার যায় শ্রীলঙ্কায়, যা পরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আর ফিলিপাইনে যাওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে মাত্র ৬৮ হাজার ডলার এ পর্যন্ত ফেরত এসেছে বলে দাবি বাংলাদেশ ব্যাংকের। সূত্র : ইনকোয়ারার, এএফপি, এবিএস-সিবিএন।


মন্তব্য