kalerkantho


ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল

সাতক্ষীরার এসপি ও পাঁচ ওসিকে ইসিতে তলব

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সাতক্ষীরার এসপি ও পাঁচ ওসিকে ইসিতে তলব

নির্বাচনী অনিয়ম ঠেকাতে ব্যর্থতার দায়ে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরী মঞ্জুরুল কবিরসহ পাঁচ থানার ওসিকে আগামীকাল বুধবার সকালে ঢাকায় তলব করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সকাল ১১টায় ইসি সচিবালয়ে উপস্থিত হয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ (সিইসি) অন্যান্য কমিশনার ও ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের সামনে ভোটের আগের রাতে ১৪টি কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মারার ঘটনার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে তাঁদের।

গতকাল সোমবার রাতে ইসি সচিবালয়ের উপসচিব মো. সামসুল আলমের সই করা চিঠিতে সাতক্ষীরার এসপি এবং সদর, তালা, কলারোয়া, শ্যামনগর ও দেবহাটা থানার ওসিদের ইসি কার্যালয়ে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে। উপসচিব মো, সামসুল আলম কালের কণ্ঠকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

সাতক্ষীরার ওই ১৪ কেন্দ্রে যে প্রার্থীদের পক্ষে ব্যালটে সিল মারা হচ্ছিল, সেই প্রার্থীদের প্রধান আসামি করে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালা-২০১০-এর ৭০ ও ৭৭ বিধি অনুযায়ী মামলা করতে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসারদের গত মঙ্গলবার নির্দেশ

দিয়েছে ইসি। থানার ওসিদেরও ওই মামলা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ওই প্রার্থীদের গ্রেপ্তার করতে বলা হয়। এ ছাড়া যেসব কেন্দ্রে ভোট লুট প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সেই ১১টি কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন-১৯৯১-এর ধারা ৫-এর (৩) উপধারা অনুসারে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ ভোটের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, রাতে কোনো ভোটকেন্দ্রে জোর করে প্রবেশ করে ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনা ঘটলে ওই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের এর দায় নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট থনার ওসিকেও এ জন্য জবাবদিহি করতে হবে। সিইসির এ নির্দেশনা অনুসারেই সাতক্ষীরায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে ভোট লুটে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসির নির্দেশনা স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা মানছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ইসি যাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে তাদের সঙ্গেই গত ২৫ মার্চ সাতক্ষীরার এসপি ও অন্য পুলিশ কর্মকর্তারা সভা করে মিষ্টি বিতরণ করেন।

ইসির দৃষ্টিতে ১১ কেন্দ্রে যা ঘটেছিল : ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচনে নানা অনিয়মের অভিযোগে বিভিন্ন জেলায় ৬৫ কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হলেও সাতক্ষীরার এসব কেন্দ্রে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসাররা পুলিশের সহায়তা চেয়েও পাননি। সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এসব কেন্দ্রের বিষয়ে ইসির কাছে আসা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালার কুমিরা ইউপির ভাগবহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোর ৪টার দিকে ৭০-৮০ জনের একটি দল প্রবেশ করে সিল মারা শুরু করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ আটটি গুলি ছোড়ে। অভয়তলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটের আগের রাত ৩টার দিকে তালা ভেঙে কেন্দ্রে ঢুকে সিল মেরে বাক্সভর্তি করে রাখা হয়। দাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটের আগের রাত আড়াইটায় ৬০০ থেকে ৭০০ ব্যালটে সিল মেরে বাক্সভর্তি করা হয়।

কলারোয়ার কুশোডাঙ্গা ইউপির কলাটুপি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে একই সময়ে পুলিশের পোশাক পরে স্থানীয় প্রিসাইডিং অফিসারকে অস্ত্র ঠেকিয়ে ৮০০ ব্যালটে নৌকা প্রতীকে সিল ও ৩০০ ব্যালটে তালা মার্কায় সিল মেরে রেখে চলে যায় দুর্বৃত্তরা। শাকদহ দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোটের আগের রাত ৪টার দিকে কেন্দ্রে ঢুকে চেয়ারম্যান পদের ৬০০ এবং মেম্বার পদের ৩০০ ব্যালট ছিনিয়ে নেওয়া হয় পুলিশের সামনেই। দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা এ সময় নীরব ভূমিকা পালন করেন। ইসিতে অভিযোগ এসেছে, খোরদের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ লুত্ফুর রহমান ও চেয়ারম্যান প্রার্থী আসলামুল হক মিলে এসব কাজ করেছেন। অথচ অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য লুত্ফুর রহমানকে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কেরালকাতা ইউপির বলিয়ানপুর কেন্দ্রে ভোটের দিন সকাল সাড়ে ১০টায় প্রিসাইডিং অফিসারদের জিম্মি করে ব্যালট ছিনিয়ে নেওয়ার সময় পুলিশ সদস্যরা ফাঁকা গুলি ছোড়েন।

সদরের আলীপুর ইউপির আলীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটের আগের রাতে এক হাজার ২০০ ব্যালটের প্রতিটিতে তিনটি করে সিল মেরে রাখা হয়। একই সময়ে মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এক হাজার ৫০০ ব্যালটে সিল মেরে রাখা হয়। ভাড়ুখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষে ঢুকে দুই হাজার ১০০ ব্যালট পেপারে সিল মেরে রাখা হয়। আগের রাতে গাংনিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষে ঢুকে তিন হাজার ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়।

শ্যামনগরের কৈখালী ইউপির কৈখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে রাতে পুলিশের পোশাকধারীরা অস্ত্রের মুখে প্রিসাইডিং অফিসারকে আটকে ব্যালট পেপারে সিল মারে। কৈখালী মহাজেরিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পুলিশের পোশাক পরে অস্ত্রের মুখে প্রিসাইডিং অফিসারের কাছ থেকে এক হাজার ৩০০ ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। শৈলাখালী এমইউ দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোটের আগের রাতে প্রিসাইডিং অফিসারকে আটকে রেখে ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়।

দেবহাটার পারুলিয়া ইউপিতে কেজুরবাড়ীয়া কেন্দ্রে ভোটের আগের রাতে দুর্বৃত্তরা প্রবেশ করে ৩৫০ ব্যালট পেপার সিলসহ নিয়ে যায়। এ সময় মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের সহায়তা চেয়েও পাওয়া যায়নি।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, পুলিশের খুলনা রেঞ্জের অ্যাডিশনাল ডিআইজি ইকরামুল হাবিব গতকাল দুপুরে সাতক্ষীরায় ভোট লুটের ঘটনায় স্থগিত হয়ে যাওয়া ভোটকেন্দ্রগুলোর কয়েকটি পরিদর্শন করেছেন। তিনি খুলনা থেকে সাতক্ষীরায় এসে সদর উপজেলার চারটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর মোদ্দাচ্ছের হোসেন ও সদর থানার ওসি এমদাদ শেখ।


মন্তব্য