kalerkantho


পুনঃ ময়নাতদন্তে লাশ তোলা হচ্ছে কাল, নানা প্রশ্ন

বিক্ষোভ অব্যাহত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পুনঃ ময়নাতদন্তে লাশ তোলা হচ্ছে কাল, নানা প্রশ্ন

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী নিহত সোহাগী জাহান তনুর মৃতদেহ পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য আগামীকাল বুধবার কবর থেকে উত্তোলন করবে পুলিশ। এ ছাড়া তাঁর মৃতদেহ ও পরনের পোশাকের ডিএনও পরীক্ষারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, তনু হত্যাকাণ্ডে কোনো নারী জড়িত থাকতে পারে। তাঁদের দাবি, হত্যার আগে তনুর চুল ছেঁড়া বা কাটা দেখে তাঁরা এ সন্দেহ করছেন। এ ছাড়া দুর্বৃত্তরা তনুকে কোনো বাসায় হত্যা করে লাশ সেনানিবাসের পাহাড় হাউজ এলাকায় ফেলে রাখতে পারে।

এর আগে সেনানিবাসের বাসা থেকে পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতিতে তনুর ব্যবহৃত ডায়েরি, ছবির অ্যালবাম, ওষুধপত্র ও কাপড়চোপড় নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল সোমবার এ সব জিনিসপত্র মামলার আলামত হিসেবে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল কুমিল্লার পুলিশ সুপারকে প্রকৃত ঘটনা খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, তনু হত্যা মামলায় সরকার কোনো নাটক দেখতে চায় না। তবে হত্যাকাণ্ডের ৯ দিন পরও মামলায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় গতকালও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসে সোহাগী জাহান তনুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সেদিন রাত ১০টার দিকে সেনানিবাসের পাহাড় হাউজ এলাকার ঝোপ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ : ডিএনএ টেস্ট ও ফের ময়নাতদন্তের সিদ্ধান্ত : তনু হত্যা মামলার তদন্তে নিয়োজিত জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সূত্র জানায়, তনুর মরদেহ পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য আগামী ৩০ মার্চ কবর থেকে তোলা হবে। ডিবির পরিদর্শক এ কে এম মনজুর হোসেনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল কুমিল্লার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম জয়নাব বেগম মরদেহ পুনঃ ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন। এ ছাড়া মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষাসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ও নিশ্চিত হতে চান তদন্ত কর্মকর্তারা। এর মধ্যেই গতকাল হত্যাকাণ্ডের সময় তনুর পরনের সালোয়ার-কামিজের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য তা ঢাকা সিআইডির ক্রাইম সিন বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের ওসি এ কে এম মনজুর হোসেন বলেন, ‘তনুর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য আমরা সম্ভাব্য ৩০ মার্চ নির্ধারণ করেছি। এ জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের আবেদন করা হয়েছে। সিআইডির ক্রাইম সিনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এ সময় উপস্থিত থাকবেন।

নারীর জড়িত থাকার সন্দেহ : তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিহত তনুর লাশ যে স্থানে এবং যেভাবে পড়ে ছিল তাতে তদন্ত কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন তনু ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন কি না, নাকি তনুকে হত্যার পর লাশ পাহাড় হাউসের রাস্তার কালভার্টের পাশের জঙ্গলে এনে ফেলা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা এখনো এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন। জানা গেছে, নিহত তনুর লাশ যেভাবে পড়ে ছিল এবং যেভাবে একের পর এক তাঁর জুতা, ‘কাঁটা’ চুল ও মোবাইল ফোন পড়ে ছিল, তাতে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। যদিও প্রথম জানা গিয়েছিল তনুর চুল ছেঁড়া হয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, ঘটনাস্থলে কনডমের একটি খালি প্যাকেটও তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন। এ ছাড়া গত রবিবার গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত গার্ডসহ ১৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।

ফোন জব্দ : এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা নিহত তনুর ব্যবহৃত চারটি মোবাইল ফোনের (একটি মায়ের) সবকটির কললিস্ট সংগ্রহ করেছেন। তনুকে সর্বশেষ যে ফোন করেছে সে তাঁর ফেইসবুক বন্ধু। তবে ঘটনার সময় ওই বন্ধু সেনানিবাস এলাকায় ছিল না বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, ঘটনার সময় নিহত সোহাগী জাহান তনুর কাছে দুটি ফোন ছিল।

‘আটক’ যুবক বাসায় ফিরেছে : জানা গেছে, তনুকে উত্ত্যক্ত করত পিয়ার নামের যে যুবক, সে বাসায় ফিরেছে। ইতিমধ্যে র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিবি পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর পিয়ার এখন তার বাসাতেই রয়েছে। তবে পিয়ারের ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল ফোনের কললিস্ট সংগ্রহের অপেক্ষায় আছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

জিনিসপত্র ‘জব্দ’ ও স্বীকারোক্তি আদায়ে চাপ : তনুকে দাফনের জন্য গ্রামের বাড়িতে থাকা অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতিতে একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রতিবেশীর কাছে রাখা চাবি নিয়ে দরজা খুলে জিনিসপত্র নিয়ে যায়। গত শনিবার রাতে র‌্যাব সদস্যরা তাদের গ্রাম থেকে তুলে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদের পর ভোরে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর দেখেন প্রতিবেশীদের কাছে রাখা চাবি নেই। তখন তাঁরা জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার তথ্য জানতে পারেন।  

পরিবারের অভিযোগ, র‌্যাব সদস্যরা তাদের গ্রামের বাড়ি থেকে তুলে এনে গেস্টহাউসে থাকতে বাধ্য করে। কারণ তখন চাবি পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া এ সময় র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেরাই তনুকে মেরেছ, তোমরা স্বীকার করো। ’

সূত্র মতে, জিজ্ঞাসাবাদের পর রবিবার ভোরে র‌্যাব সদস্যরা পরিবারের সদস্যদের সেনানিবাসের বাড়িতে দিয়ে যান। তখন তনুর মা প্রতিবেশী দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রীর কাছে চাবি চাইতে গেলে জানতে পারেন চাবি তাঁদের কাছে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিয়ে গেছেন। চাবি না থাকায় তাঁদের কুমিল্লা সেনানিবাসের গেস্ট হাউসে অবস্থান করতে হয়। পরে চাবি ফেরত পাওয়ার পর ঘরে ঢুকতে পারেন।  

নাটক দেখতে চান না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : গতকাল কুমিল্লা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থিত হয়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা তনু হত্যার বিচারের দাবি জানায়। এ সময় পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেনের কাছে একটি ফোন আসে। পরে পুলিশ সুপার জানান, তাঁকে এই মাত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ফোন করেন। ফোনে মন্ত্রী বলেছেন, তনু হত্যার বিষয়ে সরকার কোনো নাটক দেখতে চান না। প্রকৃত অপরাধী ধরা পড়ুক।

প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অব্যাহত : সেনানিবাসে সোহাগী জাহান তনুকে হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের কলা ভবনের সামনে শহীদ মিনারে (তনু মঞ্চ) কলেজ থিয়েটারের সদস্যরা বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। আড়াই ঘণ্টাব্যাপী শিক্ষার্থীরা তনু মঞ্চে অবস্থান করে স্লোগান দিয়ে হত্যাকারীদের বিচার দাবি করে। এ ছাড়া তনু হত্যার প্রতিবাদে ও দোষীদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান করেছে কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা।

একই দাবিতে কুমিল্লার চান্দিনা ও মুরাদনগরে সোমবার বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। চান্দিনায় মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। সকালে মুরাদনগর উপজেলা সদরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও পেশাজীবী সংগঠনের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে মুরাদনগর কাজী নোমান আহমেদ ডিগ্রি কলেজ, ডিআর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, নুরুন্নাহার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ভুবনঘর-নহল আলহাজ আবদুল বাতেন সরকার উচ্চ বিদ্যালয় ও সোনার বাংলা একাডেমি অ্যান্ড স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।

ঢাকায় প্রতিবাদ : এদিকে কলেজ ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণ ও হত্যাকারীদের ধরতে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। এই সময়ের মধ্য জড়িতদের গ্রেপ্তার না করা হলে ৩১ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা এবং ৪ এপ্রিল সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তারসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে লিখিত বক্তব্যে সাধারণ সম্পাদক এম জিলানী শুভ জানান, আজ মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে রাজু স্মারক ভাস্কর্যের পাদদেশে সর্বজনের প্রতিবাদ সমাবেশ এবং সন্ধ্যা ৬টায় মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।

হয়রানির উদ্বেগ আসকের : গতকাল মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মো. নূর খান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, তনু হত্যায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। উল্টো তাঁর মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের গ্রামের বাড়ি থেকে মধ্যরাতে তুলে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

মুন্সীগঞ্জে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, কুমিল্লায় তনু হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করছে এবং গোয়েন্দারাও কাজ করছে। তদন্ত কমিটিও হয়েছে। অন্য সব হত্যাকাণ্ডের মতো তনু হত্যাকাণ্ডেরও রহস্য উদ্ঘাটিত হবে। আলামত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। গতকাল সন্ধ্যায় মুন্সীগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জাবাবে তিনি এসব কথা বলেন।


মন্তব্য