kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বিএনপিতেই ‘নতুন ধারার রাজনীতি’র চর্চা নেই!

এনাম আবেদীন   

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিএনপিতেই ‘নতুন ধারার রাজনীতি’র চর্চা নেই!

১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত জাতীয় কাউন্সিলে নতুন ধারার রাজনীতি ও সরকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কিন্তু এরপর গত ১০ দিনে যা ঘটেছে তাতে খোদ দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেই শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। অনেকেই বলছে আশাবাদী হওয়ার মতো কিছুই ঘটছে না, ফলে তারা হতাশ। বলা হচ্ছে, নতুন ধারার রাজনীতির চর্চা সবার আগে দলের মধ্যেই শুরু হওয়া উচিত। কমিটি নিয়ে বিএনপিতে এক ধরনের গুমোট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কমিটি ঘোষণায় দেরি হওয়ায় দলের ক্ষতি হচ্ছে বলে অনেকের মূল্যায়ন।

কারণ প্রথমত, মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটি ঘোষণা করা হলে দলের ভেতরে-বাইরে ইতিবাচক বার্তা যেত। এতে দলের অভ্যন্তরে চক্রান্ত কম হতো। নেতাকর্মীরাও চাপমুক্ত হতো।

এ ছাড়া কাউন্সিলের দিন মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটি ঘোষিত হলে খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ শিরোনামে দেওয়া ইতিবাচক বক্তৃতাই আলোচনায় থাকত রাজনৈতিক অঙ্গনে। কিন্তু তা না হওয়ায় উল্টো এখন সম্ভাব্য কমিটি নিয়ে আগ্রহ ও উৎকণ্ঠাই সবার মধ্যে বেশি। অনেকের মতে, রাজনীতিতে এটিও বিএনপির কৌশলগত ভুল।

দ্বিতীয়ত, ১০ দিন অতিক্রান্ত হলেও কমিটি নিয়ে এ পর্যন্ত খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র কোনো নেতার সঙ্গে আলোচনা করেননি। আবার স্থায়ী কমিটির শূন্য পদ পূরণসহ গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে পদায়নের ব্যাপারে তিনি নিজেও সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন। ফলে সিনিয়র নেতাদের পাশাপাশি অন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে কমিটি নিয়ে এক ধরনের উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে, যা তারা ভালোভাবে নিচ্ছে না। এতে দলে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয়ত, পদ-পদবি নিয়ে তদবির হতে পারে এমন সম্ভাবনা থাকায় খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ে যাচ্ছেন খুবই কম। চার-পাঁচ দিন পর রবিবার গুলশান কার্যালয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে একমাত্র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন।

চতুর্থত, কাউন্সিলের পর থেকে বেশি সময় বাসায় থাকায় নেতাকর্মীরা ধরে নিয়েছে, সেখানে বসে কমিটি গঠনের কাজ করছেন খালেদা জিয়া। তাঁর বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস এ ক্ষেত্রে তাঁকে সহায়তা করছেন বলে অনেকে ধরে নিচ্ছেন। কিন্তু শিমুলের পক্ষে-বিপক্ষে লোক থাকায় নেতারা এর সঙ্গে কমিটির হিসাব মেলাতে শুরু করেছেন।

পঞ্চমত, বাসায় বসে কমিটি গঠনের কাজ করলে নিশ্চয়ই খালেদা জিয়া দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করছেন বলে ধরে নিচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। ফলে এ ক্ষেত্রেও তারেকের সঙ্গে ‘ভালো সম্পর্ক খারাপ সম্পর্কে’র সূত্র ধরে পদ-পদবির হিসাব মেলাচ্ছেন নেতারা।

সবচেয়ে বড় কথা—দলের সিনিয়র নেতারা এ রকম এক পরিস্থিতিতে ‘অসম্মানিত’ বোধ করছেন। তাঁদের ডাকা হচ্ছে না, পরামর্শও নেওয়া হচ্ছে না। ব্যক্তি মালিকানাধীন (প্রপ্রাইটারশিপ) প্রতিষ্ঠানের মতো ঘরে বসে কমিটির খসড়া তৈরির ঘটনাকে দলের কেউই ভালোভাবে নিচ্ছে না। দলের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে, কাউন্সিলররা দায়িত্ব দেওয়ায় সব ধরনের কমিটি গঠনের এখতিয়ার একমাত্র খালেদা জিয়ারই। এ ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলা বা আলাপ-আলোচনা করলে কিছুটা হলেও দলের গণমুখী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হতো। কিন্তু চেয়ারপারসন একেবারে নীরব হয়ে যাওয়ায় নানা গুজব ডালপালা মেলছে। নেতাদের অনেকে বিরক্ত ও হতাশ হয়ে বলছেন, ‘যাঁর দল তিনি যা খুশি করুন’ এ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই।     

বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, ‘কমিটি গঠন কিছুটা দেরি হওয়ায় দলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ পদ-পদবি নিয়ে দলে প্রতিযোগিতা আছে। তার পরও চিন্তাভাবনা করে ও গোছানো একটি কমিটির জন্য বিএনপির সবাইকে আমি ধৈর্য ধরতে বলব। ’ তিনি বলেন, কাউন্সিলের দিন অন্তত স্থায়ী কমিটি ঘোষিত হলে ভালো হতো। তবে চেয়ারপারসনকেও অনেক কিছু ভাবতে হচ্ছে। একজনকে বড় পদ দেওয়া হলে আরেকজন গোসা করেন, এটি বিবেচনায় নিয়েই তাঁকে কাজ করতে হচ্ছে।

গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ওপরও চাটুকাররা ভর করেছে। তাই ওনাকে সবকিছুর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার তো প্রশাসন-পুলিশ সবকিছু আছে। তিনি যা খুশি তাই করতে পারেন। কিন্তু খালেদা জিয়াকে নড়াচড়া করতে হবে নেতাকর্মীদের ওপর ভর করে। তিনি বলেন, যা হওয়ার হয়েছে, এখন সময় নষ্ট না করে অনতিবিলম্বে দলের সব পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে খালেদা জিয়ার কমিটি ঘোষণা করা উচিত। কিছুতেই তাঁর একলা চলা ঠিক হবে না। সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গেও তাঁর কথা বলা উচিত।

এক প্রশ্নের জবাবে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, মির্জা ফখরুল মহাসচিব হিসেবে বিএনপির মধ্যে এখন বেস্ট ক্যান্ডিডেট। কিন্তু তাঁরও নির্বাচন আলোচনার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তা না হলে মনে হবে তিনি দয়ায় মহাসচিব হয়েছেন। আর দয়ায় মহাসচিব হলে তিনি দলের জন্য ভালো কিছু করতে পারবেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক সদরুল আমিনের মতে, কাউন্সিলের পর ১০ দিন চলে যাওয়ায় কমিটি নিয়ে বিএনপিতে উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। তাই সবচেয়ে ভালো হতো, কাউন্সিলের দিনই মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটি ঘোষণা করা হলে। তাঁর মতে, কমিটি ঘোষণায় যত দেরি হবে দলে বিভ্রান্তি ও গ্রুপিংও তত বাড়বে। এতে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি হবে। যত দ্রুত সম্ভব বিএনপির হাইকমান্ডের তাই কমিটি ঘোষণা করা উচিত—যোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এই অধ্যাপক।

স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মতে, ‘স্থায়ী কমিটি খুব শিগগির ঘোষণা করা হবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে সম্পাদক ও ভাইস চেয়ারম্যান পদসহ নতুন অনেক পদ সৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরি হওয়ায় নির্বাহী কমিটি ঘোষণায় কিছুটা দেরি হতে পারে। ’ তিনি বলেন, ‘মহাসচিব পদ নিয়েও সম্ভবত চেয়ারপারসন এক ধরনের চূড়ান্ত নিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন। ফলে এটিও খুব শিগগিরই ঘোষণা করা হবে বলে আমার ধারণা। ’   

ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপির মতো বড় একটি দলে পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকায় চেয়ারপারসনকে সবদিক দেখেশুনে অগ্রসর হতে হচ্ছে। ফলে সময় একটু বেশি লাগায় নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু কমিটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। বিএনপি পূর্ণ উদ্যমে ঘুরে দাঁড়াবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী আরেক সদস্য বলেন, মনে হচ্ছে তিনি (চেয়ারপারসন) এখনো নেতা ‘সার্চ’ করছেন। তাই কমিটি গঠনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে। তবে এতে দলের অবশ্যই ক্ষতি হচ্ছে, যোগ করেন তিনি।

উল্লেখ্য, ভিশন ২০৩০ শিরোনামে দেওয়া বক্তৃতায় খালেদা জিয়া অন্য অনেক প্রসঙ্গের সঙ্গে সুনীতি, সুশাসন ও সু-সরকারের কথা বলেছেন। এর মধ্যে সু-সরকার ও সুশাসন বাস্তবায়নের বিষয়টি বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু ‘সুনীতি’র বাস্তবায়ন দলীয় ইতিবাচক রাজনীতির মধ্য দিয়েও অনেকাংশে স্পষ্ট করা সম্ভব বলে দলটির শুভাকাঙ্ক্ষীদের পাশাপাশি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও মনে করেন। তাঁদের মতে, ‘সুনীতি’ বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যও প্রযোজ্য।  

কাউন্সিলে দেওয়া বক্তৃতায় খালেদা জিয়া আরো বলেন, ‘আমাদের এই কাউন্সিল থেকে জাতীয় জীবনের জমাটবাঁধা অন্ধকার দূর করে আলোর আভাস আনতে হবে। জাতি আজ বিশৃঙ্খল, বিভক্ত। এই জাতিকে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সর্বস্তরে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। সঞ্চারিত করতে হবে নতুন আশাবাদ। জনগণকে দিতে হবে নতুন দিশা। এ কাউন্সিল থেকে আসতে হবে সেই পথনির্দেশনা। ’

বস্তুত কাউন্সিলে দেওয়া বক্তৃতায় নতুন ধারার রাজনীতির অঙ্গীকার থাকলেও দলের নেতাকর্মীদের জন্য পথনির্দেশনা এখনো স্পষ্ট হয়নি। বরং তারা চেয়ে আছে এখন কমিটির দিকে।

কাউন্সিলে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো—২০ দলীয় জোটের বাইরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একমাত্র বিকল্প ধারার সভাপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপির আমন্ত্রণে সারা দিয়েছেন। সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার দলগুলো আমন্ত্রণ পেলেও ওই কাউন্সিলে যোগ দেয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, একই দিন তাঁর দলের কর্মসূচি থাকায় তিনি কাউন্সিলে যেতে পারেননি।

বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, বিএনপির কাউন্সিলের দিন আমি সিলেটে ছিলাম। ঢাকায় থাকলেও যেতাম কি না সন্দেহ আছে।

কারণ সম্পর্কে কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছি। একটি দলের কাউন্সিলে যাওয়ার বিষয়টি এক ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু ওই দলে রাজনীতি কোথায়? কাউন্সিলে বিএনপির একজন নির্বাচিত নেতার নামও ঘোষণা হলো না। এটি গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। ’

কাদের সিদ্দিকী মতে, যে অর্থে বিএনপি চেয়ারপারসনকে আস্থায় নিয়ে কাউন্সিলররা দায়িত্ব দিয়েছেন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, ওই অর্থ বা যুক্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলতে পারেন, তাঁর পিতা বা আওয়ামী লীগ এই দেশ স্বাধীন করেছে। সুতরাং এই দেশের জনগণেরও তাঁর ওপর আস্থা রয়েছে। আর তারাই তাঁকে দেশ চালানোর অনুমতি দিয়েছে। তাহলে তো আর নির্বাচনের প্রয়োজন হয় না!


মন্তব্য