kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ । ১১ মাঘ ১৪২৩। ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮।

রাষ্ট্রধর্ম বৈধ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রাষ্ট্রধর্ম বৈধ

ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে সংবিধান সংশোধনের (অষ্টম ও পঞ্চদশ সংশোধনী) বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দাখিল করা রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। ওই রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা আলাদা দুটি রুল খারিজ করে গতকাল সোমবার রায় দেন হাইকোর্টের তিন সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চ।

বিচারপতি নাঈমা হায়দারের নেতৃত্বাধীন এ বেঞ্চের অন্য দুই বিচারক হলেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল।

আবেদনকারীদের ওই রিট আবেদন করার এখতিয়ার নেই উল্লেখ করে সংক্ষিপ্ত আদেশে আদালত বলেন, রুল খারিজ। ফলে ঠিক কী কারণে রিট খারিজ করা হয়েছে তা বলতে পারছেন না আইনজীবীরা। তাঁরা বলছেন, বিস্তারিত জানা যাবে পূর্ণাঙ্গ রায় দেখে। এর আগে কোনো কিছু বলা ঠিক হবে না।

২৮ বছর আগে অষ্টম সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে এবং পাঁচ বছর আগে পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১১ সালের ৮ জুন এবং ১ ডিসেম্বর আলাদাভাবে দুটি রুল জারি করেছিলেন। ওই রুল খারিজ হওয়ায় বাংলাদেশের সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ থাকল।

সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রয়াত কামাল উদ্দিন হোসেনের নেতৃত্বে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে ১৫ বিশিষ্ট নাগরিক ১৯৮৮ সালে প্রথম রিট আবেদনটি দাখিল করেছিলেন। গতকাল আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। এ ছাড়া পক্ষভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন নিয়ে উপস্থিত ছিলেন সাবেক বিচারপতি টি এইচ খান, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ বি এম নুরুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম।

রায় ঘোষণার পর রিট আবেদনকারীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা রিট আবেদনের পক্ষে বিস্তারিত শুনানির জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেছিলাম। রাষ্ট্রপক্ষও সময়ের আবেদন করেছিল। কিন্তু আদালত রিট আবেদনের ওপর আগে জারি করা দুটি রুলই খারিজ করে দিয়েছেন। ঠিক কী কারণে রিট আবেদন খারিজ করা হয়েছে তা জানি না। তাই পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এ রায়ের কপি পাওয়ার পর তা দেখে আপিল করা হবে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ’

তবে রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সম্পর্কিত সংবিধানের সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করা রিট আবেদন হাইকোর্ট খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকল।

ওই রুলের ওপর শুনানির জন্য গতকাল দুপুর ২টা ১০ মিনিটে এজলাসে বসেন বিচারকরা। এর পরই অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা আদালতকে বলেন, অনেক দিন আগে ১৯৮৮ সালে রিট আবেদন করা হয়েছে। পরে ২০১১ সালে দুইবার রুল জারি হয়েছে। এসব কারণে প্রস্তুতির জন্য সময় দরকার। এ পর্যায়ে আদালত তাঁকে বসতে বলেন। তিনি বসার পর অ্যাডভোকেট এ বি এম নুরুল ইসলাম দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমরা এ মামলায় পক্ষভুক্ত হওয়ার আবেদন করছি। ’ এ কথা বলে তিনি আবেদনের কপি বিচারকদের উদ্দেশে বাড়িয়ে দেন। ওই সময় আদালত বলেন, ‘আপনারা বসেন। আগে রিট আবেদনকারীপক্ষের বক্তব্য শুনি। ’ এরপর ওই আইনজীবী তাঁর আসনে বসে পড়েন। তখন রিট আবেদনকারীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীকে শুনানি শুরু করতে বলেন আদালত। তিনি দাঁড়ানোর পরপরই আদালত বলেন, ‘এর আগে আপনাকে বলা হয়েছিল যে রিট আবেদনকারী একটি কমিটি। এই কমিটির অস্তিত্ব নেই। তাই এ কমিটির রিট করার এখতিয়ার বা অধিকার আছে কি না। এ বিষয়ে আপনি কি বলবেন আজ?’ জবাবে সুব্রত চৌধুরী বলেন, শুধুই একটি কমিটি নয়, আরো বিশিষ্ট ১৫ জন নাগরিক আছেন আবেদনকারী হিসেবে।

ওই সময় আদালত বলেন, ‘আমরা আপনাদের রিট আবেদন পড়ে এসেছি। যে বিশিষ্ট নাগরিকদের কথা বলছেন তাঁরা কমিটির পক্ষে এসেছেন। পৃথকভাবে কেউ আসেননি। ’

জবাবে সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু হোক। ওই শুনানিতে আদালতকে সন্তোষজনক জবাব দেব। ’ তখন আদালত বলেন, এই কমিটির এখতিয়ার নেই। এ পর্যায়ে আদালত রুল দুটি খারিজ করে রায় দেন। গতকাল আদালত সংক্ষিপ্ত আদেশে বলেন, রুল খারিজ।

হাইকোর্ট রায় দেওয়ার পর আইনজীবীরা আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতেই আদালতের বারান্দায় উপস্থিত হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতে থাকে।

এর আগে সকাল ১০টার কিছুক্ষণ পর হেফাজতের ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান হাশেমীর নেতৃত্বে সংগঠনটির কয়েকজন নেতা সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল

ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একটি স্মারকলিপি দেন। প্রধান বিচারপতি বরাবর দাখিল করা স্মারকলিপিতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখার দাবি জানানো হয়। এরপর তাঁরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।

এই রিট আবেদনের ওপর শুনানি ঘিরে গতকাল সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার বিপুলসংখ্যক সদস্য নিয়োজিত ছিলেন।

২৮ বছর আগে ১৯৮৮ সালের রিট আবেদনের সঙ্গে ২৩ বছর পর ২০১১ সালে দাখিল করা এক সম্পূরক আবেদনের ওপর শুনানি শেষে ওই বছরের ৮ জুন বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন। রুলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা সংবলিত সংবিধানের ওই সংশোধনী কেন অসাংবিধানিক ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। পরে একই বছরের ২৫ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম রেখেই সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে কিছুটা সংশোধনী আনা হয়। ওই সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে সে বছরই হাইকোর্টে সম্পূরক আবেদন করা হলে হাইকোর্ট ওই বছরের ১ ডিসেম্বর পৃথক রুল জারি করেন। উভয় রুলের ওপর শুনানির জন্য রিট আবদনকারীপক্ষ হাইকোর্টে একটি বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করার জন্য আবেদন করে গত বছর। প্রধান বিচারপতি রিট আবেদনটি নিষ্পত্তির জন্য তিন সদস্যের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেন। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি এ বেঞ্চে রুলের ওপর শুনানির জন্য কার্যতালিকাভুক্ত হয়।

ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে ১৯৮৮ সালের ৫ জুন সংবিধান সংশোধন করে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা হয়। একই বছরের ৯ জুন রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মধ্য দিয়ে এটা আইনে পরিণত হয়, যা সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী নামে পরিচিত। এই সংশোধনীতে সংবিধানের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের পরেই ২ক নম্বর অনুচ্ছেদ যোগ করা হয়। এতে বলা হয়, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাবে। ’ এ ছাড়া একই সংশোধনীতে সংবিধানের ১০০ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। এই অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে দেশের ছয়টি শহর চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, যশোর ও কুমিল্লায় হাইকোর্টের ছয়টি স্থায়ী বেঞ্চ বসানো হয়। কিন্তু আইনজীবীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে সে সময় সুপ্রিম কোর্ট আংশিকভাবে সংবিধানের ওই সংশোধনী বাতিল করেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত বিভাগীয় ও জেলা শহরে হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠনের বিষয়টি বাতিল করলেও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির সংশোধনী বহাল থেকে যায়। এরপর সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনের নেতৃত্বে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি ওই সংশোধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৮৮ সালে একটি রিট আবেদন দাখিল করে।

ওই কমিটির পক্ষে বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন, কবি সুফিয়া কামাল, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, বিচারপতি কে এম সোবহান, ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, ড. খান সারওয়ার মুরশিদ, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. মুশাররফ হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত, বদরুদ্দীন উমর, ফয়েজ আহমদ, ড. আনিসুজ্জামান ও ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর রিট আবেদনটি করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মারা গেছেন।

সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দেওয়ার পর সরকার ২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করে। কিন্তু ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ও ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ রেখেই সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করা হয়। এ ছাড়া সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপিকে চেয়ারম্যান করে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম রেখেই সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ পেশ করে। এ অবস্থায় ২৩ বছর আগের করা রিট আবেদনটি সচল করার জন্য সম্পূরক আবেদন দেওয়া হয়।

২০১১ সালের ২৫ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্মসংশ্লিষ্ট সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। এতে বলা হয়, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করবে। ’ ওই অবস্থায় রিট আবদনকারীপক্ষ আবারও সম্পূরক আবেদন করে। এরপর পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করা হয়।

ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সন্তুষ্টি : রিট আবেদনটি হাইকোর্ট খারিজ করে দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন, আওয়ামী ওলামা লীগ, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটিসহ ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দল ও সংগঠন। আলাদা প্রতিক্রিয়ায় ওই সব দলের নেতারা বলেন, রায়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। কামরাঙ্গীরচরে বিজয় মিছিল করেছে খেলাফত আন্দোলন। ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম এক বিবৃতিতে বলেন, এ রায়ে ইসলামী জনতার সেন্টিমেন্টের বিজয় হয়েছে।


মন্তব্য